
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের দক্ষিণাঞ্চলে ভয়াবহ ভাঙনের মুখে পড়েছে প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল। একের পর এক বাড়িঘর সাগরে ধসে পড়ছে, ভেঙে যাচ্ছে হাঁটার পথ, আর ঢেউয়ের পানিতে প্লাবিত হচ্ছে বসতবাড়ি। আবহাওয়া শান্ত থাকলেও রেকর্ড উচ্চতার জোয়ার ও শক্তিশালী ঢেউয়ের কারণে উপকূলীয় এলাকায় দেখা দিয়েছে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি। এর মধ্যে এল নিনোর সবচেয়ে তীব্র প্রভাব আসতে এখনও কয়েক মাস বাকি।
গত ৯ অক্টোবর রাত সাড়ে ৩টার দিকে লং বিচ শহরে নিজের চোখের সামনে এমন বিপর্যয় দেখেন শন কার্টিস। তার দুই তলাবিশিষ্ট সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন আবাসিক ভবনের সামনের হাঁটার পথ ও প্রায় ২৫ ফুট চওড়া বালুর সৈকত সাগরে বিলীন হয়ে যায়। চারদিক থেকে নোনা পানি ঢুকতে থাকে। একপর্যায়ে ভবনটি কাত হয়ে সাগরের দিকে হেলে পড়ে।
নয় বছর ধরে ওই ভবনে বসবাস করছিলেন কার্টিস। তিনি জানান, ঘুম ভেঙে উঠে দেখেন দরজার কাঠামো ও জানালা বেঁকে গেছে। এরপর বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়তে দেখেন। ঢেউয়ের পানি ভবনের দ্বিতীয় তলা পর্যন্ত উঠে যায়। আশপাশের বাসিন্দারাও ছাদ বেয়ে পানি পড়তে দেখেন।
কার্টিস বলেন, পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল যে জীবন বাঁচাতে দ্রুত বেরিয়ে যেতে হয় তাকে ও তার সহবাসীকে। তাদের কাছে তখনই স্পষ্ট হয়ে যায়, ভবনটি আর রক্ষা করা সম্ভব নয়।
একের পর এক বাড়ি সাগরে বিলীন
গত ৯ থেকে ১১ অক্টোবরের মধ্যে লং বিচ উপদ্বীপে এক ডজনের বেশি বাড়ি সাগরে ধসে পড়েছে। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় র্যাচেলের অবশিষ্ট প্রভাবে উপকূলে প্রায় ১৭ ফুট উঁচু ঢেউ আছড়ে পড়ে। ঝুঁকির কারণে ১৩টি বাড়ি থাকা আটটি স্থাপনায় প্রবেশ অনিরাপদ ঘোষণা করা হয়েছে।
এছাড়া উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় হাঁটার পথ ভেঙে পড়েছে এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলীয় মহাসড়কের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লেগুনা বিচ এলাকায় সড়কের কয়েকটি অংশে ফাটল দেখা দেওয়ায় একটি অংশ এখনও বন্ধ রয়েছে। নিউপোর্ট বিচের কয়েকটি এলাকা প্লাবিত হয়েছে। লং বিচে একসময় প্রশস্ত বালুর সৈকত ও মজবুত হাঁটার পথ যেসব বাড়িকে সুরক্ষা দিত, সেসব বাড়ির বাসিন্দাদেরও সরিয়ে নিতে হয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, লস অ্যাঞ্জেলেসের উপকূলীয় বন্যা গবেষণাগারের গবেষক টিমু গ্যালিয়েন বলেন, ভবিষ্যতে কী ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, বর্তমান বিপর্যয় তার সামান্য আভাস মাত্র।
কেন বাড়ছে উপকূলের ঝুঁকি?
বিজ্ঞানী ও সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। এর সঙ্গে জোয়ার ও ঝড়ের ঢেউ যুক্ত হলে উপকূলীয় বন্যা এবং ভূমিক্ষয়ের ঝুঁকি আরও বাড়ে।
এবার এসব পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শক্তিশালী এল নিনোর আশঙ্কা। এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত পরিবর্তন, যা প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার ধরনে পরিবর্তন ঘটায়। এর প্রভাবে বিভিন্ন অঞ্চলে বৃষ্টিপাত, ঝড় ও সমুদ্রের ঢেউয়ের তীব্রতা বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় মহাসাগরীয় ও বায়ুমণ্ডলীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, পানির নিচে শত শত মাইল পথ পাড়ি দেওয়া কেলভিন তরঙ্গও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়াতে পারে। একা এসব তরঙ্গ সাধারণত উপকূলীয় বন্যার কারণ হয় না। কিন্তু সাত ফুটের বেশি উচ্চতার জোয়ার ও ঝড়ের ঢেউয়ের সঙ্গে যুক্ত হলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
জলবায়ুবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল সোয়েইন বলেন, ঢেউ ও জোয়ারের উচ্চতা সামান্য কমলেও উপকূলীয় এলাকায় এখনও বন্যা চলছে। আগামী কয়েক মাস পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং আরও খারাপ হতে পারে। তার মতে, নভেম্বর ও ডিসেম্বর থেকে উত্তর ক্যালিফোর্নিয়াতেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে।
ঝড়ের পর ঝড়, বাড়ছে ক্ষয়ক্ষতি
গত শ্রমিক দিবসের ছুটির সময় হারিকেন মেরির অবশিষ্ট প্রভাবের কারণে দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে হারিকেন পোলোর অবশিষ্ট প্রভাব এবং এরপর গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ঝড় র্যাচেলের কারণে পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, চলতি বছরের বাকি সময়ে আরও কয়েক দফা উচ্চ জোয়ার দেখা দিতে পারে। এর সঙ্গে ঝড়ের ঢেউ যুক্ত হলে উপকূলীয় এলাকায় নতুন করে বন্যা ও ভূমিক্ষয় হতে পারে। আগামী বছরের শুরুর দিকে এল নিনোর প্রভাব সবচেয়ে তীব্র হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
লং বিচের মেয়র রেক্স রিচার্ডসন বলেন, শহরের অবকাঠামো এমন পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য তৈরি করা হয়নি। জোয়ারের উচ্চতা কম থাকলে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতের কাজ চলবে।
এর আগে ঝড়ের কারণে হাঁটার পথের দেয়ালে তৈরি হওয়া গর্ত কাঠের তক্তা ও বালুভর্তি বস্তা দিয়ে মেরামতের চেষ্টা করেছিল শহরের কর্মীরা। কিন্তু সেগুলোও টেকেনি।
সাগরপাড়ের স্বপ্নের জীবন কি শেষ হতে চলেছে?
লং বিচ উপদ্বীপের বাসিন্দা ডানা মেরি লাজ্জারেশ্চি চার বছর আগে সেখানে ভাড়া বাসায় ওঠেন। প্রতিবেশীদের সঙ্গে সুসম্পর্ক, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সমুদ্রের সৌন্দর্য তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল। কিন্তু বাড়ির ছাদে ঢেউয়ের পানি আছড়ে পড়তে দেখে এখন সেখানে কত দিন থাকা সম্ভব, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন তিনি।
তিনি বলেন, এখন আর সেখানে বাড়ি কেনার কথা ভাববেন না। তবে জায়গাটির প্রতি তার ভালোবাসা এখনও রয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় এলাকায় বসবাসের ঝুঁকি নতুন নয়। ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি এবং ১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকের এল নিনোর সময়ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলীয় মহাসড়কে বন্যা ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। তবে বর্তমান ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপ্তি ঐতিহাসিকভাবে উল্লেখযোগ্য।
উপকূলীয় বন্যা গবেষক গ্যালিয়েন বলেন, সুন্দর উপকূলীয় এলাকায় বসবাসের আকর্ষণ থাকলেও বাড়ির মালিক, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও প্রশাসনকে ঝুঁকি কতটা গ্রহণযোগ্য, তা ভেবে দেখতে হবে। প্রকৌশলগত ব্যবস্থার মাধ্যমে এসব স্থাপনা কতটা সুরক্ষিত রাখা সম্ভব, সেটিও বড় প্রশ্ন।
বাড়ি ধসে পড়ার প্রায় দুই সপ্তাহ আগে বাড়ির মালিককে বাসা ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন কার্টিস। মেরি ও পোলোর প্রভাবে প্রায় সাত ফুট উঁচু ঢেউ তার ভবনের সামনের হাঁটার পথের ক্ষতি করেছিল। সামনে এল নিনোর প্রভাব বাড়লে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে বলে আশঙ্কা করেছিলেন তিনি।
ভবনটি ধসে পড়তে শুরু করলে কার্টিস ও তার সহবাসী যতটা সম্ভব জিনিসপত্র পেছনের দিকে সরিয়ে নেন। তাদের ধারণা ছিল, ভবনের পেছনের গ্যারেজটি তুলনামূলক নিরাপদ। পরে নিজের শোবার ঘরের জানালা দিয়ে কুকুর লাক্সকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে আসেন কার্টিস। রাস্তার বিপরীত পাশে চলে যাওয়ায় তারা এবার বড় ধরনের ক্ষতি থেকে রক্ষা পান।
কয়েক দিন পর বন্ধুরা তাকে আকাশ থেকে ধারণ করা দৃশ্য দেখান। সেখানে তার প্রিয় সোফাটিকে সাগরে ভাসতে দেখা যায়। কার্টিস বলেন, সেটি কেবল একটি সোফা হলেও প্রতিবেশীদের জন্য তাঁর খুব খারাপ লাগছে।
তার পাশের তিনতলা বাড়িটির মালিক পরিবারটি ছুটিতে যাওয়ায় বিপর্যয়ের সময় বাড়িতে ছিল না। ঝড়ের পর বাড়িটির ভিত্তি থেকে ছাদ পর্যন্ত বড় ফাটল দেখা দেয়। এতে ভবনটি দুই ভাগে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কার্টিসের ভবন ভেঙে ফেলার প্রস্তুতি চলছে। বাসিন্দাদের নিজেদের জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ার জন্য মাত্র দুই ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়। অন্যদিকে, কার্টিস কয়েক দিন ধরে একই পোশাক পরে আছেন। বাড়ি হারানোর পর বাড়ির মালিক, শহর কর্তৃপক্ষ, পরিবার ও বিমা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে করতে দিন-তারিখও গুলিয়ে ফেলেছেন তিনি।
তবু লং বিচ উপদ্বীপ ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা ভাবছেন না কার্টিস। তিনি বলেন, এলাকা ছাড়বেন না; তবে উপদ্বীপের অন্য পাশে চলে যাবেন।
সূত্র: এনবিসি নিউজ
আরটিভি/জেএমএ


