
যুক্তরাষ্ট্রে হ্যালোইন উৎসব ঘিরে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে একের পর এক বন্দুক হামলা ঘটনায় অন্তত ২৪ জন নিহত এবং ৯৪ জন আহত হয়েছেন।
জানা গেছে, ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাস, ডেলাওয়্যারসহ বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের নাইটক্লাব, বিনোদন এলাকা, হ্যালোইন সামগ্রীর দোকান এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে এসব ঘটনা ঘটে। সবচেয়ে বেশি হতাহতের একটি ঘটনা ঘটেছে টেক্সাসের ডালাস শহরে। সেখানে প্রায় ৭৫ মিনিটের ব্যবধানে তিনটি পৃথক গুলিবর্ষণে চারজন নিহত ও ১৫ জন আহত হন। তবে সব হামলা হ্যালোইনকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছিল কিংবা ঘটনাগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত, এমনটা প্রমাণ হয়নি।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) থেকে বোববার (১ নভেম্বর) এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় বন্দুক সহিংসতার একাধিক ঘটনা ঘটে। নিউইয়র্ক টাইমস, এনবিসি এবং অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের তথ্যের ভিত্তিতে দক্ষিণ কোরিয়ার সংবাদমাধ্যম এসব ঘটনায় অন্তত ২৪ জনের মৃত্যু ও ৯৪ জনের আহত হওয়ার সংখ্যা জানিয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাগুলোর একটি ঘটেছে টেক্সাসের ডালাস শহরের ডিপ এলাম এলাকায়। শনিবার রাত পেরিয়ে রোববার (১ নভেম্বর) ভোরে সেখানে তিনটি পৃথক স্থানে গুলির ঘটনা ঘটে। ডালাস পুলিশ বিভাগের আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ঘটনা ঘটে রাত ১২টা ২০ মিনিটে এলম স্ট্রিটের ২৬০০ ব্লকে। দ্বিতীয় ঘটনা ঘটে রাত ১টা ৫ মিনিটে মেইন স্ট্রিটের ২৬০০ ব্লকে। তৃতীয় গুলিবর্ষণ হয় রাত ১টা ৩৫ মিনিটে সাউথ ক্রাউডাস স্ট্রিটের ২০০ ব্লকে।
ডালাস পুলিশ জানিয়েছে, তিনটি ঘটনায় মোট ১৯ জন গুলিবিদ্ধ হন। তাদের মধ্যে চারজন মারা যান এবং ১৫ জন আহত হন। আহতদের কয়েকজনকে জরুরি চিকিৎসাকর্মীরা হাসপাতালে নিয়ে যান। অন্যরা নিজেরাই চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে পৌঁছান। কোনো পুলিশ কর্মকর্তা আহত হননি। প্রাথমিকভাবে তিনটি ঘটনার মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। তবে সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা এবং গুলিবর্ষণের উদ্দেশ্য নিয়ে তদন্ত চলছে।
ডালাসের ডিপ এলাম শহরটির পরিচিত বিনোদন এলাকা। সেখানে বার, রেস্তোরাঁ, সংগীত পরিবেশনার স্থান এবং নাইটক্লাব রয়েছে। হ্যালোইন উপলক্ষে শনিবার রাতেও বিপুলসংখ্যক মানুষ ওই এলাকায় জড়ো হয়েছিলেন। গুলির ঘটনার পর পুলিশ অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করে এবং কয়েকটি রাস্তা বন্ধ করে দেয়। তদন্তকারীরা আশপাশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহের পাশাপাশি প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলছেন।
ডালাসের পুলিশপ্রধান ড্যানিয়েল কোমো জানিয়েছেন, হ্যালোইন উপলক্ষে আগেই অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। ফলে গুলির খবর পাওয়ার পর কাছাকাছি থাকা কর্মকর্তারা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সক্ষম হন। একজন আহত ব্যক্তির জীবন রক্ষায় পুলিশ সদস্যদের জরুরি চিকিৎসা দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি। পুলিশপ্রধান বলেছেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে তদন্ত অব্যাহত থাকবে। তবে তদন্তের জন্য আটক বা জিজ্ঞাসাবাদ করা ব্যক্তিরা সবাই অপরাধে জড়িত, এমন নয়।
এদিকে ক্যালিফোর্নিয়ার ফেয়ারফিল্ড শহরের সোলানো টাউন সেন্টার শপিং মলে অবস্থিত স্পিরিট হ্যালোইন দোকানে শুক্রবার রাতে গুলিবর্ষণের ঘটনায় একজন নিহত এবং ছয়জন আহত হন। নিহত ব্যক্তি ৩১ বছর বয়সী এক অন্তঃসত্ত্বা নারী বলে পরবর্তী প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। পুলিশ ঘটনাটিকে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে চালানো হামলা হিসেবে তদন্ত করছে। তবে হামলার পূর্ণ উদ্দেশ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত এখনো চলমান।
ক্যালিফোর্নিয়ার ঘটনার পাশাপাশি মিশিগানের ম্যাডিসন হাইটসেও একটি স্পিরিট হ্যালোইন দোকানের কাছে গুলির ঘটনায় ২১ বছর বয়সী এক যুবক নিহত হন। দুটি ঘটনাই হ্যালোইন সামগ্রীর দোকানের সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও একই অপরাধী চক্র বা পরিকল্পনার অংশ বলে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ফলে দোকানের নামের মিল থেকে ঘটনাগুলোর মধ্যে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করা যাবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামা অঙ্গরাজ্যের বার্মিংহাম শহরেও গুলির ঘটনায় হতাহতের খবর পাওয়া গেছে। লিজিয়ন ফিল্ড স্টেডিয়ামে ম্যাজিক সিটি ক্ল্যাসিক ফুটবল ম্যাচের পর আশপাশের এলাকায় পৃথক দুটি গুলির ঘটনা ঘটে। এতে একজন নিহত এবং আটজন আহত হন। ম্যাচটি দেখতে প্রায় ৭০ হাজার দর্শক উপস্থিত ছিলেন। তবে স্টেডিয়ামের ভেতরে খেলা চলাকালে গুলিবর্ষণ হয়েছিল, এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
ডেলাওয়্যার অঙ্গরাজ্যের নিউয়ার্ক শহরে ইউনিভার্সিটি অব ডেলাওয়্যারের কাছেও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। সেখানে ছয়জন গুলিবিদ্ধ হন। অন্যদিকে ইলিনয়ের ব্লুমিংটনে ইলিনয় ওয়েসলিয়ান ইউনিভার্সিটির কাছে গুলির ঘটনায় ১৯ বছর বয়সী এক তরুণী নিহত এবং আরও একজন গুরুতর আহত হন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আশপাশে এসব ঘটনা ঘটলেও হামলার উদ্দেশ্য এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় নিয়ে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
আরকানসাস অঙ্গরাজ্যের ফায়েটভিলেও গুলিবর্ষণে ছয়জন আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, একটি বিরোধের পর সেখানে গুলির ঘটনা ঘটে। তবে বিরোধের সুনির্দিষ্ট কারণ এবং জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত চলছিল। এসব ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে সংঘটিত পৃথক অপরাধ। কোনো একটি কেন্দ্রীয় পরিকল্পনার মাধ্যমে সব হামলা সংঘটিত হয়েছে, এমন তথ্য পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রে হ্যালোইন উপলক্ষে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক মানুষ বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্র, পার্টি, রাস্তাঘাট এবং জনসমাগমপূর্ণ স্থানে জড়ো হন। বিশেষ করে গভীর রাত পর্যন্ত চলা অনুষ্ঠানে জনসমাগম ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তবে এবারের গুলিবর্ষণগুলোর ক্ষেত্রে মদ্যপান, মাদক গ্রহণ কিংবা উৎসবের ভিড়ই সরাসরি সহিংসতার কারণ ছিল, তা নিশ্চিতভাবে প্রমাণিত হয়নি।
অপরাধবিজ্ঞানী জেমস অ্যালান ফক্সের একটি পূর্ববর্তী বিশ্লেষণে হ্যালোইনসহ নির্দিষ্ট ছুটির দিনে সহিংসতার প্রবণতা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। ২০০৫ থেকে ২০০৯ সালের বোস্টনের অপরাধসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণে ৩১ অক্টোবরকে সহিংসতার ঝুঁকিপূর্ণ দিনগুলোর একটি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। ওই বিশ্লেষণে ৪ জুলাই ও ১ জানুয়ারির পর ৩১ অক্টোবরের অবস্থান ছিল। তবে এটি একটি নির্দিষ্ট শহরের পুরোনো তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা গবেষণা।
হ্যালোইন উপলক্ষে ছোট শিশু ও কিশোরেরা সন্ধ্যায় বাড়ির বাইরে বের হয়, বিভিন্ন বাসায় গিয়ে মিষ্টি সংগ্রহ করে এবং পারিবারিক অনুষ্ঠানে অংশ নেয়। এ সময় যানবাহন চলাচল, ভিড় এবং অপরিচিত স্থানে যাতায়াতের কারণে নিরাপত্তার বাড়তি প্রয়োজন হতে পারে। তবে শিশুদের জন্য সব ধরনের ঝুঁকি একই নয়। বন্দুক সহিংসতা, সড়ক দুর্ঘটনা এবং অন্য অপরাধের পরিসংখ্যান আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী বাংলাদেশিসহ অভিবাসী পরিবারগুলোর জন্যও এসব ঘটনা উদ্বেগের বিষয়। বিশেষ করে যারা হ্যালোইন বা অন্যান্য বড় উৎসব উপলক্ষে জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় যান, তাদের স্থানীয় পুলিশ ও আয়োজকদের নিরাপত্তাসংক্রান্ত নির্দেশনা অনুসরণ করা প্রয়োজন। কোনো এলাকায় গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটলে গুজবের পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট পুলিশ বিভাগের নিশ্চিত তথ্যের ওপর নির্ভর করা গুরুত্বপূর্ণ।
হ্যালোইন সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে সংঘটিত বন্দুক সহিংসতায় বহু মানুষ হতাহত হয়েছেন। সংকলিত একটি হিসাবে অন্তত ২৪ জন নিহত ও ৯৪ জন আহত হওয়ার কথা বলা হলেও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের মোট হিসাবে পার্থক্য রয়েছে। ডালাসের তিনটি ঘটনায় চারজন নিহত ও ১৫ জন আহত হওয়ার তথ্য পুলিশ নিশ্চিত করেছে। অন্য ঘটনাগুলোতেও তদন্ত চলছে। এসব সহিংসতার কারণ, সন্দেহভাজনদের পরিচয় এবং হতাহতের চূড়ান্ত সংখ্যা সম্পর্কে পরবর্তী সরকারি তথ্য গুরুত্বপূর্ণ হবে।
আরটিভি/ এসকেডি




