
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে উইসকনসিনের পরবর্তী গভর্নর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ডেভিড ক্রাউলি। এর মধ্য দিয়ে অঙ্গরাজ্যটির ১৭৮ বছরের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ গভর্নর হতে যাচ্ছেন তিনি।
বুধবার (৪ নভেম্বর) এই তথ্য প্রকাশ করেছে মার্কিন বার্তাসংস্থা অ্যাসোসিয়েট প্রেস (এপি)।
প্রকাশিত বেসরকারি ফলাফলে মিলওয়াকি কাউন্টির নির্বাহী কর্মকর্তা ক্রাউলি, রিপাবলিকান দলের মার্কিন প্রতিনিধি টম টিফানিকে (মিনোকোয়ার বাসিন্দা) পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ডেভিড ক্রাউলি।
ক্রাউলির রানিং মেট (সহ-প্রার্থী) সারাহ গডলেভস্কিও মঙ্গলবার উইসকনসিনের লেফটেন্যান্ট গভর্নর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। তারা দুজনেই জানুয়ারি মাসে দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।
নিজের শহর মিলওয়াকির ‘ল্যান্ডমার্ক ক্রেডিট ইউনিয়ন লাইভ’ নামক একটি সঙ্গীত অনুষ্ঠানে দেওয়া বিজয় ভাষণে পুরো উইসকনসিন অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধিত্ব করার প্রতিশ্রুতি দেন ক্রাউলি।
তিনি বলেন, আমি সবার গভর্নর হতে চাই—এমনকি তাদেরও, যারা আমাকে ভোট দেননি। আমি আপনাদের জানাতে চাই যে, আমি আপনাদের কথা শুনব, আপনাদের জন্য কাজ করব এবং আমার সাধ্যমতো আপনাদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করব।
পুরো ভাষণে ক্রাউলি ঐক্যের ওপর জোর দেন এবং বলেন, আসুন আমরা এমন একটি অঙ্গরাজ্য গড়ে তুলি, যেখানে নির্বাচন আমাদের আরও ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে, তিক্ততা সৃষ্টি করবে না। যেখানে আমরা প্রশ্ন করব না যে একটি ধারণা কোথা থেকে এসেছে, বরং প্রশ্ন করব—এই ধারণা আমাদের কোথায় নিয়ে যাবে। যারা একসঙ্গে কাজ করে, তারাই জয়ী হয়—ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান নয়, বরং সাধারণ মানুষ। আমি শিখেছি যে, অর্থ ও ক্ষমতার চেয়ে সাধারণ মানুষের শক্তি সবসময়ই বড়।
ক্রাউলির এই জয়ের পাশাপাশি ডেমোক্র্যাটরা অঙ্গরাজ্যের আইনসভার উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণও নিতে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। ২০১০ সালের পর এই প্রথম ডেমোক্র্যাটরা রাজ্য সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পেতে চলেছে।
এই গ্রীষ্মেই ক্রাউলির জয়লাভের বিষয়টি অসম্ভব বলে মনে হয়েছিল, কারণ তিনি একবার গভর্নর নির্বাচনের দৌড় থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন, যদিও পরে আবার ফিরে আসেন।
তার এই অবস্থানে পৌঁছানোর যাত্রাটি অত্যন্ত চমকপ্রদ। মিলওয়াকির অন্যতম সমস্যাসংকুল এলাকায় অত্যন্ত কঠিন শৈশব কাটিয়েছেন তিনি। নির্বাচনী প্রচারণার সময় তিনি প্রায়ই তার বাবা-মায়ের আসক্তির সঙ্গে লড়াই এবং শৈশবে বারবার বাড়ি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করতেন—যা তাকে রাজনৈতিক কাজে অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি তার কর্মজীবন শুরু করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক সিনেটর রাস ফেইনগোল্ডের ২০১০ সালের পুনঃনির্বাচনী প্রচারণায় কাজ করার মাধ্যমে। এরপর ২০১৬ সালে স্টেট অ্যাসেম্বলিতে নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি কাউন্টি ও রাজ্য সরকারের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন।
২০২০ সালে তিনি মিলওয়াকি কাউন্টির সর্বকনিষ্ঠ এবং প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ‘কাউন্টি এক্সিকিউটিভ’ (কাউন্টি প্রধান) হন ডেভিড ক্রাউলি। দায়িত্ব পালনকালে তিনি পুনরায় পড়াশোনা শুরু করেন এবং তার পরিবারের প্রথম সদস্য হিসেবে কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
তবে এ বছর গভর্নর পদে তার প্রার্থিতা খুব একটা গতি পায়নি, যার ফলে জুলাইয়ের শুরুর দিকে তিনি নির্বাচনী দৌড় থেকে সরে দাঁড়ান। দশ দিন পর, লেফটেন্যান্ট গভর্নর সারা রদ্রিগেজ তার প্রচারণা শেষ করার ঘোষণা দিলে, ক্রাউলি পুনরায় নির্বাচনে ফিরে আসেন—এবার তিনি বিদায়ী গভর্নর টনি এভারসের সমর্থন লাভ করেন। এটি ছিল মূলধারার ডেমোক্র্যাটদের একটি সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ, যার লক্ষ্য ছিল ম্যাডিসনের প্রতিনিধি ফ্রান্সেসকা হং-এর বিপরীতে একটি বিকল্প দাঁড় করানো। হং একজন ‘ডেমোক্র্যাটিক সোশালিস্ট’ (গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী) এবং তিনি বেশ কয়েক মাস ধরেই নির্বাচনী দৌড়ে এগিয়ে ছিলেন।
হং-এর বিরুদ্ধে ক্রাউলির জয়—যা ছিল এক শতাংশেরও কম ব্যবধানে—গভীর রাতে এক বড় চমক হিসেবে আসে। তিনি নিজেকে একজন অভিজ্ঞ ও লড়াইয়ে পোড় খাওয়া প্রার্থী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। অনেক ডেমোক্র্যাটিক ভোটারের মতে, নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে জয়ী হওয়ার ক্ষেত্রে তিনিই বেশি উপযুক্ত।
উইসকনসিনের ডেমোক্র্যাটরা এই নির্বাচনী চক্রকে ঘিরে বড় ধরনের প্রত্যাশা পোষণ করেছিলেন। তাদের ধারণা ছিল, ট্রাম্পের প্রতি জনসমর্থন কমে যাওয়া, উচ্চমূল্যস্ফীতি নিয়ে ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ এবং ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার মতো বিষয়গুলো মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে একটি বড় বিজয় বা ‘ব্লু ওয়েভ’ (নীল ঢেউ) বয়ে আনবে।
কিন্তু ক্রাউলির জন্য এই জয় নিশ্চিত ছিল না। সেপ্টেম্বরের একটি জনমত জরিপে দেখা যায়, টিফানির সঙ্গে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেশ হাড্ডাহাড্ডি হয়ে উঠেছে। এ সময় রিপাবলিকানরা ক্রাউলির বিরুদ্ধে একের পর এক নেতিবাচক বিজ্ঞাপন প্রচার করতে থাকে, অন্যদিকে টিফানি নিজেকে ট্রাম্পের কাছ থেকে কিছুটা দূরে সরিয়ে নেন—যদিও ট্রাম্প তাকে সমর্থন দিয়েছিলেন।
উইসকনসিনের সবচেয়ে জনবহুল ও বৈচিত্র্যময় কাউন্টিতে ক্রাউলির কাজের রেকর্ডকে কেন্দ্র করে টিফানি তার প্রচারণায় মিলওয়াকির অপরাধের হার ও করের বিষয়টিকে সামনে নিয়ে আসেন। তার বিজ্ঞাপনে সতর্ক করা হয় যে, ক্রাউলি জয়ী হলে মিলওয়াকির মতো শহুরে সমস্যাগুলো পুরো অঙ্গরাজ্যজুড়ে ছড়িয়ে পড়বে। কাউন্টি এক্সিকিউটিভ হিসেবে ক্রোলির অন্যতম প্রধান অর্জন ছিল রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে একটি সমঝোতা, যার মাধ্যমে মিলওয়াকি শহর ও কাউন্টিকে রাজস্ব বাড়ানোর লক্ষ্যে বিক্রয় কর (সেলস ট্যাক্স) বৃদ্ধির অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। ভোটাররা যখন জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছিলেন, তখন এই বিষয়টি ক্রাউলিকে আক্রমণ করার একটি সহজ সুযোগ করে দেয়।
এর জবাবে ক্রাউলি ও তার সমর্থকরা প্রতিটি পর্যায়ে টিফানিকে ট্রাম্পের সঙ্গে যুক্ত করে প্রচার চালান। এমনকি তাদের একমাত্র বিতর্কেও ক্রোলি বারবার রাষ্ট্রপতির সঙ্গে টিফানির সম্পর্কের বিষয়টি তুলে ধরেন। টিফানির বিজ্ঞাপনে তাকে সবার সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করা একজন প্রার্থী হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও, রাজ্য ও ফেডারেল—উভয় পর্যায়েই তাঁর দীর্ঘদিনের রক্ষণশীল ভোট দেওয়ার রেকর্ড রয়েছে।
এই পরাজয়ের মধ্য দিয়ে উত্তর উইসকনসিনের এই কংগ্রেস সদস্যের টানা জয়ের ধারার অবসান ঘটল; ১৬ বছর আগে রাজ্য অ্যাসেম্বলিতে নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে প্রতিটি নির্বাচনেই জয়ী হয়ে আসছিলেন তিনি। উল্লেখ্য, এটিই ছিল তার প্রথম কোনো অঙ্গরাজ্যব্যাপী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘটনা।
আরটিভি/এসএইচএম




