দিনের পর দিন নিজের ঘরে চুপচাপ বসে থাকা, পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে না চাওয়া কিংবা মনে হওয়া সবাই তাকে নিয়ে কথা বলছে— এমন আচরণ অনেকেই মানসিক চাপের লক্ষণ ভেবে এড়িয়ে যান। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এগুলো সিজোফ্রেনিয়ার মতো গুরুতর মানসিক রোগের লক্ষণও হতে পারে। সময়মতো চিকিৎসা শুরু হলে বেশিরভাগ রোগীই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
সিজোফ্রেনিয়া একটি দীর্ঘমেয়াদি মানসিক রোগ। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি চিন্তা, আবেগ, আচরণ এবং বাস্তবতা বোঝার ক্ষমতায় সমস্যায় পড়েন। অনেক সময় বাস্তব ও কল্পনার পার্থক্য করতে পারেন না। ফলে এমন কিছু দেখা, শোনা বা বিশ্বাস করতে শুরু করেন, যার বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরুষ ও নারী উভয়েই এই রোগে আক্রান্ত হতে পারেন। তবে পুরুষদের ক্ষেত্রে সাধারণত ২০ থেকে ২২ বছর বয়সে এবং নারীদের ক্ষেত্রে ২৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে রোগটি প্রথম প্রকাশ পায়।
সিজোফ্রেনিয়ার সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণগুলোর একটি হলো বিভ্রম। এতে রোগী দৃঢ়ভাবে এমন কিছু বিশ্বাস করেন, যার বাস্তবে কোনো ভিত্তি নেই। যেমন, কেউ তাকে অনুসরণ করছে, ক্ষতি করতে চাইছে বা খাবারে বিষ মিশিয়ে দিচ্ছে বলে মনে হতে পারে।
আরেকটি সাধারণ লক্ষণ হলো অবাস্তব শব্দ শোনা বা এমন কিছু দেখা, যা অন্যরা দেখতে বা শুনতে পান না। অনেক রোগী অদৃশ্য মানুষের সঙ্গে কথা বলেন বা অদ্ভুত গন্ধ ও স্পর্শ অনুভব করেন।
এছাড়া চিন্তাভাবনা ও কথাবার্তা এলোমেলো হয়ে যাওয়া, এক বিষয় থেকে অন্য বিষয়ে চলে যাওয়া, মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা, সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা হওয়া, স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে যাওয়া এবং দৈনন্দিন কাজের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলার মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে।
অনেকের ক্ষেত্রে আবেগ প্রকাশ কমে যায়। পরিবার ও বন্ধুদের থেকে দূরে সরে যাওয়া, নিজের পরিচ্ছন্নতার প্রতি অনীহা, খুব কম কথা বলা এবং জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলা এই রোগের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
বিশেষজ্ঞরা জানান, সিজোফ্রেনিয়ার নির্দিষ্ট কোনো একক কারণ এখনো জানা যায়নি। তবে বংশগত প্রভাব, মস্তিষ্কের কিছু রাসায়নিক উপাদানের ভারসাম্যহীনতা, শৈশবের মানসিক আঘাত, দীর্ঘদিনের পারিবারিক অশান্তি, অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং নেতিবাচক সামাজিক পরিবেশ এই রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
রোগ নির্ণয়ের জন্য কোনো একক পরীক্ষা নেই। চিকিৎসক রোগীর উপসর্গ, আচরণ এবং পারিবারিক ইতিহাস মূল্যায়ন করেন। প্রয়োজনে রক্ত পরীক্ষা বা মস্তিষ্কের পরীক্ষা করা হতে পারে, যাতে অন্য কোনো শারীরিক কারণ আছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়। সাধারণত অন্তত ছয় মাস ধরে উপসর্গ থাকলে এবং তা দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করলে সিজোফ্রেনিয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সিজোফ্রেনিয়ার পুরোপুরি নিরাময় না হলেও নিয়মিত চিকিৎসার মাধ্যমে রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। ওষুধের পাশাপাশি পরামর্শভিত্তিক চিকিৎসা রোগীকে বাস্তবতা বুঝতে, সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলতে এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনে সহায়তা করে। গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে।
চিকিৎসকদের পরামর্শ, সিজোফ্রেনিয়াকে অবহেলা না করে শুরুতেই চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। কারণ যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু হবে, স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার সম্ভাবনাও তত বেশি থাকবে।
আরটিভি/জেএমএ



