পেটের ডান পাশে হঠাৎ তীব্র ব্যথা শুরু হলে অনেকেই প্রথমে গ্যাসের সমস্যা বলে মনে করেন। কিন্তু ব্যথা কমতে না চাইলে এর পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে পিত্তথলিতে পাথর। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি পরিপাকতন্ত্রের একটি খুবই সাধারণ সমস্যা। অনেকের ক্ষেত্রে বছরের পর বছর কোনো লক্ষণ দেখা না দিলেও, কারও কারও ক্ষেত্রে এটি তীব্র ব্যথা, সংক্রমণ, জন্ডিস এবং অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহের মতো জটিলতা তৈরি করতে পারে।
চিকিৎসকদের ভাষ্য, যকৃতের নিচে থাকা ছোট থলির মতো অঙ্গ হলো পিত্তথলি। এর কাজ যকৃত থেকে তৈরি হওয়া পিত্তরস জমা রাখা। পিত্তরসে থাকা কোলেস্টেরল, পিত্ত লবণ ও বিলিরুবিনের ভারসাম্য নষ্ট হলে ছোট ছোট স্ফটিক তৈরি হয়। সময়ের সঙ্গে সেগুলো বড় হয়ে পাথরে পরিণত হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পিত্তথলির পাথর মূলত তিন ধরনের। সবচেয়ে বেশি দেখা যায় কোলেস্টেরলের পাথর, যা প্রায় ৮০ শতাংশ ক্ষেত্রে হয়ে থাকে। এ ছাড়া বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে গেলে পিগমেন্ট পাথর এবং বিভিন্ন উপাদানের মিশ্রণে মিশ্র পাথর তৈরি হতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, নারী, ৪০ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তি, অতিরিক্ত ওজনের মানুষ এবং গর্ভধারণের সক্ষমতা রয়েছে এমন নারীদের এই রোগের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। এ ছাড়া স্থূলতা, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, গর্ভাবস্থা, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা, দ্রুত ওজন কমানো, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার, কম আঁশযুক্ত খাদ্য, যকৃতের রোগ এবং পারিবারিক ইতিহাস থাকলেও ঝুঁকি বাড়ে।
পিত্তথলিতে পাথর থাকলেও অনেকের কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। তবে উপসর্গ দেখা দিলে পেটের উপরের ডান পাশে তীব্র ব্যথা, সেই ব্যথা কাঁধ বা পিঠে ছড়িয়ে পড়া, চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়ার পর ব্যথা বাড়া, বমি, বদহজম, পেট ফাঁপা এবং গ্যাসের সমস্যা হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, জ্বর, কাঁপুনি, জন্ডিস, চোখ হলুদ হয়ে যাওয়া, গাঢ় রঙের প্রস্রাব, ফ্যাকাশে মল, তীব্র পেটব্যথা বা একটানা বমি হলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। এসব জটিলতার লক্ষণ হতে পারে।
পিত্তথলির পাথর নির্ণয়ে সবচেয়ে সহজ ও নির্ভুল পরীক্ষা হলো আলট্রাসাউন্ড। প্রয়োজন হলে রক্ত পরীক্ষা, সিটি স্ক্যান, এমআরসিপি বা ইআরসিপিও করা হতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, যাদের পাথর থাকলেও কোনো উপসর্গ নেই, তাদের বেশিরভাগেরই চিকিৎসার প্রয়োজন হয় না। তবে নিয়মিত চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে থাকতে হয়। কিন্তু বারবার ব্যথা বা জটিলতা দেখা দিলে অস্ত্রোপচারই সবচেয়ে কার্যকর চিকিৎসা।
বর্তমানে ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে পিত্তথলি অপসারণের আধুনিক অস্ত্রোপচারই সবচেয়ে বেশি করা হয়। এতে ব্যথা কম হয়, রক্তপাত কম হয়, দ্রুত সুস্থ হওয়া যায় এবং সাধারণত এক থেকে দুই দিনের মধ্যেই হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফেরা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা জানান, পিত্তথলি অপসারণের পরও যকৃত স্বাভাবিকভাবে পিত্তরস তৈরি করতে থাকে। তাই অধিকাংশ মানুষ পরে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।
চিকিৎসায় দেরি হলে পিত্তথলির প্রদাহ, পুঁজ, পিত্তনালিতে সংক্রমণ, জন্ডিস, অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ, এমনকি বিরল ক্ষেত্রে পিত্তথলির ক্যানসারের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
এই সমস্যা পুরোপুরি প্রতিরোধ করা না গেলেও ঝুঁকি কমানো সম্ভব। চিকিৎসকদের পরামর্শ, স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখা, নিয়মিত ব্যায়াম করা, আঁশসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া, অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত ও ভাজাপোড়া খাবার কম খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং মধুমেহ থাকলে তা নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, পিত্তথলির পাথর নিয়ে প্রচলিত অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। যাঁদের কোনো উপসর্গ নেই, তাদের সবার অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয় না। আবার ঘরোয়া উপায়ে বা ভেষজ চিকিৎসায় পাথর গলিয়ে ফেলার দাবিরও কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
তাদের পরামর্শ, পেটের ডান পাশে বারবার ব্যথা হলে নিজে থেকে ওষুধ না খেয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো উচিত। সময়মতো রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা নিলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই সমস্যা সফলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
আরটিভি/জেএমএ



