
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষে (সিভিল এভিয়েশন) সরকারি প্রকল্পের নামে শত শত কোটি টাকা আত্মসাৎ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলা ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে দুই প্রকৌশলী আমিনুল হাসিব ও মইদুর রহমান মওদুদের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি একনেক সভায় প্রধানমন্ত্রীর কড়া নির্দেশনার পর নড়েচড়ে বসেছে মন্ত্রণালয়।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) মহাপরিচালক (যুগ্মসচিব) ড. মো. মনজুরুল ইসলামকে প্রধান করে গঠন করা তদন্ত কমিটির অপর দুই সদস্য হলেন বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির পরিচালক (উপসচিব) মোহাম্মদ সালাহ্ উদ্দিন এবং পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের পরিচালক (উপসচিব) নিশাত জাহান। কমিটিকে আগামী চার কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
যেভাবে অর্থ আত্মসাৎ
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের পর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরের উন্নয়নকাজে শত শত কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ দুদকে আসে। এসব অভিযোগ অনুসন্ধান করে প্রায় ৯০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৪টি মামলা করে কমিশন। এর মধ্যে দুটি মামলায় আসামি করা হয় বেবিচকের প্রকৌশলী আমিনুল হাসিব ও মইদুর রহমান মওদুদকে।

দুদকের নথি থেকে জানা গেছে, যশোর, সৈয়দপুর ও রাজশাহী (শাহ মখদুম) বিমানবন্দরের রানওয়ে সংস্কারের একটি প্রকল্পের (ডিপিপি) ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধির অনুমোদন দেয় সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি (সিসিজিপি)। তবে শর্ত ছিল, প্রকল্পের ডিপিপি সংশোধন করতে হবে। কিন্তু প্রকল্প পরিচালক (পিডি) আমিনুল হাসিব অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে গত তিন বছরেও সেই শর্ত পালন করেননি। এটি সিসিজিপির আদেশের সরাসরি লঙ্ঘন এবং প্রকল্প পরিচালক হিসেবে তিনি এর দায় এড়াতে পারেন না।
মামলার এজাহারে বলা হয়, আসামিরা যোগসাজশে প্রকল্পে অনিয়ম-দুর্নীতি করে কাজ শেষ না করে বিল তুলে নিয়েছেন।
পদোন্নতি পেতে কারসাজির অভিযোগ
অভিযোগ উঠেছে, এই দুই কর্মকর্তা দুর্নীতির শত শত কোটি টাকা দিয়ে সবকিছু ম্যানেজ করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। চলতি বছরের মার্চ মাসে অর্থের বিনিময়ে দুদকের কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে হাত করে তারা একটি ভুয়া চিঠি তৈরি করান। চলতি বছরের ১১ মার্চ দেওয়া সেই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, প্রকৌশলী আমিনুল হাসিব ও মওদুদ আহমেদের বিরুদ্ধে দুদকের কোনো মামলা নেই। সেই ভুয়া চিঠির সুযোগ নিয়ে আমিনুল হাসিব সম্প্রতি পদোন্নতি পেয়ে বেবিচকের সিভিল সার্কেল প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হন। অপরদিকে মওদুদ ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী প্রকৌশলী।
দুর্নীতির দায়ে ২০১৯ সালেও চাকরি থেকে বরখাস্ত হয়েছিলেন আমিনুল হাসিব। এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, তিনি সরকারি কোনো ছুটি বা অনুমতি (জিও) ছাড়াই চলতি বছরের জানুয়ারিতে গোপনে অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা ও কানাডা ভ্রমণ করেন। অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানকালে তার পাসপোর্ট হারিয়ে গেলে নিজ দপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সহায়তায় তিনি দেশে ফিরে আসেন।
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ ও দেশত্যাগের আশঙ্কা
দুদক ও মন্ত্রণালয়ের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকার পরও সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষ এতদিন তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। দুর্নীতি দমন কমিশনের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় থেকে ২৩ আগস্ট (২০২৬) তারিখে চেয়ারম্যান বরাবর চিঠি পাঠানো হলেও এখনও কেন এই দুই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি, সে বিষয়টি জানতে গত ১০ সেপ্টেম্বর আবারও অতি জরুরিভিত্তিতে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এদিকে পরিস্থিতি প্রতিকূলে বুঝতে পেরে দুর্নীতিগ্রস্ত এই দুই কর্মকর্তা যেকোনো মুহূর্তে গোপনে দেশত্যাগ করতে পারেন বলেও আশঙ্কা রয়েছে বলে জানানো হয়।
আরটিভি/এমএইচজে


