২০১৭ সালের নভেম্বর। অর্থাৎ এখন থেকে ৯ বছর আগে মাদ্রিদের উপকণ্ঠে লাস রোজাসের ‘সিউদাদ দেল ফুটবল’–এ চলছে এক কোচিং কোর্সের ক্লাস। সামনের সারিতে বসা একজন আর্জেন্টাইন সেখানে প্রশ্ন করছেন অনবরত, তর্ক জুড়ে দিচ্ছেন শিক্ষকের সঙ্গে।
সেই ছাত্রের নাম কি জানেন? লিওনেল স্কালোনি। আর তার সামনে দাঁড়িয়ে, ধৈর্য নিয়ে অনুসন্ধিৎসু ছাত্রের প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন যিনি, তার নামটা লুইস দে লা ফুয়েন্তে।
৯ বছর পর আজ সেই শিক্ষক আর সেই ছাত্র আবার মুখোমুখি—তবে এবার ক্লাসরুমে নয়, বিশ্বকাপ ফাইনালের ডাগআউটে। এমন গল্প তো লেখা হয় সিনেমাতেই!
২০১৭ সালের সেই দিনগুলোতে ফিরে গেছেন দে লা ফুয়েন্তে। তার ভাষায়, পৃথিবীর যেকোনো স্কুলের ক্লাসরুমের মতোই লাস রোজাসেও ছিল নির্দিষ্ট বিন্যাস—কেউ সামনে বসে মনোযোগী, আবার ব্যাকবেঞ্চাররা পেছনে বসে করে উসখুস।
স্কালোনি বসতেন ক্লাসের সবচেয়ে মনোযোগী ছাত্রের মতো সামনের বেঞ্চে। শুধু শুনতেনই না; কোচের প্রতিটি কথায় প্রশ্ন তুলতেন, বিতর্কে জড়াতেন। দে লা ফুয়েন্তের ভাষায়, তখনই বোঝা গিয়েছিল এই ছেলেটার মধ্যে ‘অন্য রকম কিছু’ আছে।
২০২৬ বিশ্বকাপে স্পেন ফ্রান্সকে হারিয়ে এবং আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডকে বিদায় করে নিশ্চিত করেছে ফাইনাল। ফলে ফুটবল বিশ্ব পাচ্ছে এক স্বপ্নের লড়াই— ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেনের বিপক্ষে বর্তমান বিশ্ব ও কোপা আমেরিকা চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।
তবে এই ফাইনালের গল্প শুধু দুই ফুটবল পরাশক্তির লড়াই নয়। ডাগআউটেও থাকছে এক বিশেষ অধ্যায়। স্পেনের কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে এবং আর্জেন্টিনার কোচ লিওনেল স্কালোনির সম্পর্ক একসময় ছিল গুরু-শিষ্যের। এবার ফাইনালে হবে সেই গুরু-শিষ্যের লড়াই।
২০১৭ সালে খেলোয়াড়ি জীবন শেষ করে কোচিংয়ে পা রাখেন স্কালোনি। সে সময় স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশনের (আরএফইএফ) লা রোজাস কোচিং একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নেন তিনি। সেখানে প্রশিক্ষকদের একজন ছিলেন দে লা ফুয়েন্তে, যিনি তখন স্পেনের বয়সভিত্তিক দলের দায়িত্বেও ছিলেন। অবসর-পরবর্তী কোচিং জীবনের শুরুতে তিনি স্কালোনিকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
সেই সময়ের কথা স্মরণ করে ২০২৪ কোপা আমেরিকার সময় স্কালোনি বলেছিলেন, লুইস আমাদের মতো কোচিং কোর্স করা অনেককে দারুণভাবে সাহায্য করেছেন। তার সঙ্গে আমার অনেকবার কথা হয়েছে। আমি তার জন্য সবসময় শুভকামনা জানাই।
এই শ্রদ্ধা একতরফা নয়। দে লা ফুয়েন্তেও স্কালোনির ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। সাবেক শিষ্যকে তিনি একজন ‘মাস্টার’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। যিনি আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ ও কোপা আমেরিকার শিরোপা জিতিয়েছেন।
২০২৪ ইউরোর সময় স্কালোনি বলেছিলেন, স্পেন ভালো করুক, সেটাই চাই। লা রোজাসে কোচিং কোর্সের সময় তিনি আমাদের অনেক সাহায্য করেছেন। তিনি যেভাবে দল পরিচালনা করেন এবং খেলোয়াড়দের কাছ থেকে সেরাটা বের করে আনেন, সেটা আমার খুব ভালো লাগে।
দুই কোচই পরে নিজ নিজ মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্ব জিতেছেন। এবার সেই সম্পর্কের নতুন অধ্যায় লিখতে যাচ্ছেন ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে।
স্পেনের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক স্কালোনির
স্পেনের সঙ্গে স্কালোনির সম্পর্ক শুধু কোচিং কোর্সেই সীমাবদ্ধ নয়। তার স্ত্রী এলিসা মনতেরো স্প্যানিশ। তাদের সন্তানদের জন্মও স্পেনে, আর পরিবার নিয়ে বসবাস করেন মায়োর্কায়।
আবার খেলোয়াড়ি জীবনেও দীর্ঘ সময় স্পেনে কাটিয়েছেন স্কালোনি। তিনি খেলেছেন দেপোর্তিভো লা করুনা, রেসিং সান্তান্দের এবং মায়োর্কার হয়ে।
এর আগে, ২০২৪ সালে ইউরো চলাকালে স্কালোনি বলেছিলেন, আমার পরিবারের একটি অংশ স্প্যানিশ। তাই স্বাভাবিকভাবেই আমি স্পেনকে সমর্থন করছি।
ফাইনালের আগে সৌহার্দ্যপূর্ণ কথার লড়াইয়ে গুরু-শিষ্য
ফ্রান্সকে হারিয়ে ফাইনালে ওঠার পর দে লা ফুয়েন্তে বলেছিলেন, আর্জেন্টিনার বিপক্ষে খেলতে পারলে তিনি খুশিই হবেন। তবে এর কারণ প্রতিপক্ষকে দুর্বল মনে করা নয়, বরং স্কালোনির সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক।
ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেমিফাইনালের আগের দিন স্কালোনিও দে লা ফুয়েন্তেকে নিয়ে বলেন, আমি ওর জন্য খুব খুশি। সে দারুণ একজন মানুষ। স্পেন দল যেভাবে খেলছে, আমরাও আমাদের দলে ঠিক তেমনটাই দেখতে চাই।
এরপর মজা করে বলেন, যদি আমাদের সবকিছু ঠিকঠাক না চলে, তাহলে ওকে ফোন করব। তবে যদি ফাইনালে ওদের বিপক্ষে খেলতে হয়। না, তাহলে ফাইনালের আগে কোনো ফোন নয়।
শেষ পর্যন্ত সেটাই হয়েছে। এখন আর গুরু-শিষ্যের সম্পর্ক নয়, বিশ্বকাপের মঞ্চে তারা প্রতিপক্ষ। আবেগ, বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা আপাতত এক পাশে রেখে রবিবারের ফাইনালে নির্ধারিত হবে— ফুটবলের সবচেয়ে বড় পুরস্কার জিতবেন গুরু, নাকি তারই সাবেক শিষ্য।
আরটিভি/এমএম

