
ফুটবলে একজন তারকা খেলোয়াড়কে দলে ভেড়াতে এখন আর শুধু প্রতিভা কিংবা পারফরম্যান্স বিবেচনাই যথেষ্ট নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে শত শত মিলিয়ন ইউরোর বিশাল অঙ্ক। সময়ের সঙ্গে ফুটবলের বাজার যত বড় হয়েছে, ততই বেড়েছে খেলোয়াড়দের ট্রান্সফার ফিও। তবে বিপুল অর্থ খরচ করলেই যে সাফল্য নিশ্চিত ফুটবলের ইতিহাসে তার প্রমাণ খুব কমই পাওয়া যায়।
কেউ রেকর্ড দামে দলবদল করে হয়ে উঠেছেন নতুন ক্লাবের প্রাণ, আবার কেউ প্রত্যাশার পাহাড়ের নিচে চাপা পড়ে হারিয়ে গেছেন। ট্রান্সফারমার্কেটের তথ্য অনুযায়ী, ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে দামি ১৫ দলবদলের দিকে একনজরে দেখে নেওয়া যাক।
১. নেইমার- বার্সেলোনা থেকে পিএসজি, ২২২ মিলিয়ন ইউরো
২০১৭ সালে বার্সেলোনা ছেড়ে পিএসজিতে যোগ দেন নেইমার। ব্রাজিলিয়ান তারকাকে দলে নিতে ২২২ মিলিয়ন ইউরো খরচ করে প্যারিসের ক্লাবটি যা এখনো ফুটবল ইতিহাসের সর্বোচ্চ ট্রান্সফার ফি।
পিএসজির হয়ে ঘরোয়া ফুটবলে একাধিক সাফল্য পেলেও কাঙ্ক্ষিত চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা এনে দিতে পারেননি নেইমার। ২০২০ সালে ইউরোপসেরার ফাইনালে উঠলেও বায়ার্ন মিউনিখের কাছে হেরে রানার্সআপ হয় পিএসজি। চোটও বারবার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্রাজিলিয়ান তারকার পথে।
২. কিলিয়ান এমবাপ্পে- মোনাকো থেকে পিএসজি, ১৮০ মিলিয়ন ইউরো
২০১৭ সালে মোনাকো থেকে পিএসজিতে যোগ দেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। অল্প সময়ের মধ্যেই ক্লাবটির প্রধান তারকায় পরিণত হন ফরাসি ফরোয়ার্ড।
পিএসজির হয়ে সাত বছরে ৩০৮ ম্যাচে ২৫৬ গোল করেন তিনি। হয়ে ওঠেন ক্লাবটির সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং জেতেন ১৬টি শিরোপা। তবে পিএসজির হয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে যায় তার।
৩. উসমান দেম্বেলে- ডর্টমুন্ড থেকে বার্সেলোনা, ১৪৮ মিলিয়ন ইউরো
বার্সেলোনায় যাওয়ার সময় উসমান দেম্বেলেকে ঘিরে ছিল বিশাল প্রত্যাশা। তবে ক্যাম্প ন্যুতে শুরুটা মোটেও সহজ ছিল না। চোট ও ফিটনেস সমস্যায় বারবার ছন্দ হারান ফরাসি উইঙ্গার।
বার্সেলোনা ছাড়ার পর পিএসজিতে গিয়ে অবশ্য নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করেন দেম্বেলে। লুইস এনরিকের অধীনে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর শেষ পর্যন্ত ব্যালন ডি’অরও জেতেন তিনি।
৪. আলেকজান্ডার ইসাক- নিউক্যাসল থেকে লিভারপুল, ১৪৫ মিলিয়ন ইউরো
২০২৬ সালের গ্রীষ্মের দলবদলের শেষ দিকে বড় চমক দেখায় লিভারপুল। নিউক্যাসল ইউনাইটেডের তারকা স্ট্রাইকার আলেকজান্ডার ইসাককে দলে নিতে ১৪৫ মিলিয়ন ইউরো খরচ করে তারা।
নিউক্যাসলের হয়ে নিজেকে ইউরোপের অন্যতম সেরা ফরোয়ার্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার পর এবার অ্যানফিল্ডে নতুন অধ্যায় শুরু করেছেন সুইডিশ তারকা। লিভারপুলে তার পারফরম্যান্স এখন তাই ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহের কেন্দ্রে।
৫. এনজো ফার্নান্দেজ- চেলসি থেকে ম্যানচেস্টার সিটি, ১৪৫ মিলিয়ন ইউরো
চেলসিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই বড় ট্রান্সফার ফি’র চাপ সামলাতে হয়েছে এনজো ফার্নান্দেজকে। সময়ের সঙ্গে পারফরম্যান্সে উন্নতি করলেও ২০২৬ সালে তাকে ঘিরে নতুন পরিকল্পনা করে ম্যানচেস্টার সিটি।
রদ্রি ও বার্নার্দো সিলভার বিদায়ের পর সিটির মাঝমাঠ পুনর্গঠনে আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডারকে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
৬. ব্র্যাডলি বারকোলা- পিএসজি থেকে লিভারপুল, ১৪০ মিলিয়ন ইউরো
মোহাম্মদ সালাহর বিদায়ের পর আক্রমণভাগে নতুন তারকার প্রয়োজন ছিল লিভারপুলের। সেই জায়গা পূরণে পিএসজির ব্র্যাডলি বারকোলাকে দলে টানে ইংলিশ ক্লাবটি।
চ্যাম্পিয়নস লিগে টানা দুটি শিরোপা জয়ে অবদান রাখা ২৩ বছর বয়সী ফরাসি উইঙ্গারকে ভবিষ্যতের বড় তারকা হিসেবে দেখছে লিভারপুল।
৭. মরগান রজার্স- অ্যাস্টন ভিলা থেকে চেলসি, ১৩৭ মিলিয়ন ইউরো
অ্যাস্টন ভিলায় দুর্দান্ত সময় কাটিয়ে প্রিমিয়ার লিগের আলোচিত আক্রমণভাগের খেলোয়াড়ে পরিণত হন মরগান রজার্স। তার পারফরম্যান্সে মুগ্ধ হয়ে নিজেদের ট্রান্সফার রেকর্ড নতুন করে চেলসি।
এখন বড় প্রশ্ন ভিলায় যে সাফল্য পেয়েছেন, স্ট্যামফোর্ড ব্রিজেও কি তা ধরে রাখতে পারবেন ইংলিশ তারকা?
৮. এলিয়ট অ্যান্ডারসন- নটিংহাম ফরেস্ট থেকে ম্যানচেস্টার সিটি, ১৩৫ মিলিয়ন ইউরো
নিউক্যাসল থেকে নটিংহাম ফরেস্টে যাওয়ার পর দ্রুতই নিজের বাজারমূল্য বাড়ান এলিয়ট অ্যান্ডারসন। দুই মৌসুমের পারফরম্যান্সে ইংল্যান্ডের অন্যতম আলোচিত তরুণ খেলোয়াড়ে পরিণত হন তিনি।
২০২৬ বিশ্বকাপেও নজর কাড়ার পর অ্যান্ডারসনকে দলে নিতে নিজেদের রেকর্ড ট্রান্সফার ফি খরচ করে ম্যানচেস্টার সিটি।
৯. ফিলিপে কুতিনহো- লিভারপুল থেকে বার্সেলোনা, ১৩৫ মিলিয়ন ইউরো
লিভারপুলের হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর ২০১৮ সালে বার্সেলোনায় যোগ দেন ফিলিপে কুতিনহো। তার দলবদল থেকে পাওয়া অর্থ পরবর্তীতে লিভারপুলের স্কোয়াড শক্তিশালী করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তবে বার্সেলোনায় লিভারপুলের সেই কুতিনহোকে দেখা যায়নি। চার মৌসুমের মধ্যে দুই মৌসুম ধারে কাটানোর পর ২০২২ সালে স্থায়ীভাবে ক্লাব ছাড়েন ব্রাজিলিয়ান তারকা।
১০. জোয়াও ফেলিক্স- বেনফিকা থেকে আতলেতিকো মাদ্রিদ, ১২৭ মিলিয়ন ইউরো
বেনফিকার হয়ে ঝলমলে পারফরম্যান্সের পর জোয়াও ফেলিক্সকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল বিপুল প্রত্যাশা। সেই প্রত্যাশা থেকেই পর্তুগিজ ফরোয়ার্ডকে পেতে ১২৭ মিলিয়ন ইউরো খরচ করে আতলেতিকো মাদ্রিদ।
তবে দিয়েগো সিমিওনের কৌশলের সঙ্গে পুরোপুরি মানিয়ে নিতে পারেননি ফেলিক্স। এরপর বার্সেলোনা, চেলসি ও এসি মিলানে ধারে খেলেছেন তিনি। ২০২৫ সালে যোগ দেন সৌদি ক্লাব আল নাসরে।
১১. জুড বেলিংহাম- ডর্টমুন্ড থেকে রিয়াল মাদ্রিদ, ১২৭ মিলিয়ন ইউরো
রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়ার পর বড় ট্রান্সফার ফি’র চাপকে উল্টো শক্তিতে পরিণত করেছেন জুড বেলিংহাম।
প্রথম মৌসুমেই দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে ওঠেন ইংলিশ মিডফিল্ডার। গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে গোল করে রিয়াল মাদ্রিদের চ্যাম্পিয়নস লিগ জয়ের পথেও বড় অবদান রাখেন তিনি।
১২. ইয়ান দিয়োমান্দে- আরবি লাইপজিগ থেকে রিয়াল মাদ্রিদ, ১২৫ মিলিয়ন ইউরো
একটি দুর্দান্ত বুন্দেসলিগা মৌসুমই বদলে দেয় ইয়ান দিয়োমান্দের পরিচিতি। অল্প সময়ের মধ্যেই আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসা আইভরি কোস্টের এই উইঙ্গারকে নিয়ে আগ্রহ দেখিয়েছিল লিভারপুলও।
শেষ পর্যন্ত অবশ্য রিয়াল মাদ্রিদই তাকে দলে ভেড়ায়। নতুন ‘গ্যালাকটিকো’ হিসেবে এখন পুরো ফুটবলবিশ্বের নজর এই তরুণ তারকার দিকে।
১৩. ফ্লোরিয়ান ভির্টজ-লেভারকুসেন থেকে লিভারপুল, ১২৫ মিলিয়ন ইউরো
বায়ার লেভারকুসেনের ঐতিহাসিক বুন্দেসলিগা জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ফ্লোরিয়ান ভির্টজের। জাভি আলোনসোর অধীনে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স তাকে ইউরোপের অন্যতম কাঙ্ক্ষিত তরুণ তারকায় পরিণত করে।
বায়ার্ন মিউনিখের আগ্রহ উপেক্ষা করে প্রিমিয়ার লিগের পথ বেছে নেন জার্মান মিডফিল্ডার। তবে লিভারপুলে তার শুরুটা প্রত্যাশামতো সহজ হয়নি।
১৪. এনজো ফার্নান্দেজ-বেনফিকা থেকে চেলসি, ১২১ মিলিয়ন ইউরো
কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার শিরোপাজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পর এনজো ফার্নান্দেজকে দলে নিতে বিপুল অর্থ খরচ করে চেলসি।
বেনফিকা থেকে মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে বিশাল অঙ্কের ট্রান্সফারে লন্ডনের ক্লাবটিতে যোগ দেন তিনি। শুরুতে মানিয়ে নিতে সময় লাগলেও পরে চেলসির মাঝমাঠের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে ওঠেন আর্জেন্টাইন তারকা।
১৫. এডেন হ্যাজার্ড-চেলসি থেকে রিয়াল মাদ্রিদ, ১২১ মিলিয়ন ইউরো
চেলসির হয়ে বছরের পর বছর দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের পর ২০১৯ সালে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন এডেন হ্যাজার্ড। তাকে ঘিরে ছিল নতুন ‘গ্যালাকটিকো’ হয়ে ওঠার প্রত্যাশা।
কিন্তু চোট ও ফর্মহীনতায় সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। লা লিগায় রিয়ালের হয়ে ৫৪ ম্যাচ খেলেও গোল করতে পেরেছেন মাত্র চারটি। শেষ পর্যন্ত ২০২৩ সালে মাত্র ৩২ বছর বয়সেই ফুটবলকে বিদায় জানান বেলজিয়ান তারকা।
ফুটবলের ইতিহাসের সবচেয়ে দামি দলবদলের তালিকাই বলে দেয়, রেকর্ড ট্রান্সফার ফি সবসময় রেকর্ড সাফল্যের নিশ্চয়তা দেয় না। নেইমার, কুতিনহো, ফেলিক্স ও হ্যাজার্ডের মতো তারকারা প্রত্যাশার পুরোটা পূরণ করতে পারেননি। অন্যদিকে এমবাপ্পে, বেলিংহাম ও দেম্বেলের মতো খেলোয়াড়রা বড় অঙ্কের মূল্যকে সাফল্যে রূপ দিতে পেরেছেন।
শেষ পর্যন্ত ফুটবলের বাজারে খেলোয়াড়ের মূল্য যতই আকাশছোঁয়া হোক, মাঠে তার ভবিষ্যৎ কখনোই আগেভাগে লেখা থাকে না। বিপুল অর্থ যেমন একজন খেলোয়াড়কে তারকা বানাতে পারে, তেমনি সেই মূল্যই হয়ে উঠতে পারে তার ওপর সবচেয়ে বড় চাপ।
আরটিভি/এসকে




