
বিশ্বসেরা ফুটবলারের স্বীকৃতি ব্যালন ডি’অর। সোনালি ট্রফিটি হাতে তোলার স্বপ্ন দেখেন বিশ্বের প্রায় সব ফুটবলার। তবে এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার জিতলেই আয়োজকদের কাছ থেকে সরাসরি কোনো অর্থ পুরস্কার পান না বিজয়ী। যদিও ক্লাব ও স্পনসরদের সঙ্গে চুক্তির শর্ত অনুযায়ী লাখ লাখ ইউরো বোনাস পাওয়ার সুযোগ থাকে। পাশাপাশি বাড়ে বিজ্ঞাপনমূল্য ও বাণিজ্যিক চুক্তি থেকে আয়ের সম্ভাবনাও।
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এএসের আন্তর্জাতিক ফুটবল বিভাগের প্রধান আরিৎস গাবিলন্দোর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ব্যালন ডি’অর এখন কেবল ব্যক্তিগত শ্রেষ্ঠত্বের স্বীকৃতি নয়। এটি ফুটবলারদের বাণিজ্যিক মূল্য বাড়ানোরও বড় মাধ্যম। মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি এই পুরস্কার একজন খেলোয়াড়ের আর্থিক ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।
এএসের তথ্য অনুযায়ী, ব্যালন ডি’অরের সোনালি ট্রফিটির আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩ হাজার ৫০০ ইউরো। তবে ট্রফিটির প্রকৃত গুরুত্ব এর আর্থিক মূল্যে নয়, বরং এটি জয়ের মাধ্যমে একজন ফুটবলারের সামনে তৈরি হওয়া সম্ভাবনাময় বাণিজ্যিক সুযোগে।
ফুটবলারদের ক্লাব চুক্তিতে ব্যক্তিগত অর্জনের জন্য বিশেষ বোনাসের শর্ত থাকতে পারে। ব্যালন ডি’অর জিতলে এসব শর্ত অনুযায়ী কোনো কোনো খেলোয়াড়ের বোনাসের পরিমাণ ৩০ লাখ ইউরো পর্যন্ত হতে পারে।
এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ নেইমার। ২০১৭ সালে বার্সেলোনা ছেড়ে প্যারিস সেন্ট জার্মেইতে (পিএসজি) যোগ দেওয়ার পর ব্রাজিলিয়ান তারকার চুক্তিতে ব্যালন ডি’অর জয়ের জন্য প্রায় ৩০ লাখ ইউরো বোনাসের শর্ত থাকার খবর প্রকাশ করেছিল ফরাসি সংবাদমাধ্যম লে প্যারিসিয়েন। পরে লেকিপও এ তথ্য জানায়। তবে পিএসজির হয়ে কখনো ব্যালন ডি’অর জিততে পারেননি নেইমার। ফলে ওই বোনাস পাওয়ার সুযোগও তৈরি হয়নি।
ক্লাবের পাশাপাশি স্পনসরদের সঙ্গেও চুক্তিতে এমন বোনাসের শর্ত থাকতে পারে। ২০১৮ সালে ব্যালন ডি’অর জয়ের পর ক্রীড়াসামগ্রী প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান নাইকির সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী প্রায় আট লাখ ইউরো বোনাস পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল লুকা মদ্রিচের। স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এল কনফিদেনসিয়াল সে সময় এ তথ্য জানিয়েছিল।
মদ্রিচের অর্জনকে কাজে লাগিয়ে বিশেষ সংস্করণের ফুটবল বুটও বাজারে এনেছিল নাইকি। অর্থাৎ, ব্যালন ডি’অর জয় শুধু ফুটবলারের জন্যই নয়, স্পনসর প্রতিষ্ঠানের জন্যও বাড়তি ব্যবসার সুযোগ তৈরি করে।
তবে আর্থিক সুবিধা কেবল এককালীন বোনাসেই সীমাবদ্ধ নয়। ব্যালন ডি’অর জয়ের ফলে একজন ফুটবলারের আন্তর্জাতিক পরিচিতি ও বিজ্ঞাপনমূল্য বেড়ে যেতে পারে। নতুন স্পনসর পাওয়া, পুরোনো চুক্তি নবায়নের সময় বেশি অর্থ দাবি করা এবং বৈশ্বিক বাজারে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হয়।
এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ লিওনেল মেসি ও ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। মেসি আটবার এবং রোনালদো পাঁচবার ব্যালন ডি’অর জিতেছেন। মাঠের সাফল্যের পাশাপাশি বিজ্ঞাপন ও বিভিন্ন বাণিজ্যিক চুক্তির মাধ্যমেও বিপুল আয় করেছেন এই দুই তারকা। তাদের জনপ্রিয়তা এখন ফুটবল মাঠের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়েছে।
এএসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মেসি-রোনালদোর পরবর্তী প্রজন্মের তারকা কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লামিনে ইয়ামালের সামনেও একই ধরনের বাণিজ্যিক অবস্থান তৈরির সুযোগ রয়েছে। ব্যক্তিগত অর্জন ও মাঠের সাফল্য কাজে লাগিয়ে বিশ্ব ফুটবলের বাণিজ্যিক বাজারে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারেন তারা।
অবশ্য ব্যক্তিগত পুরস্কারকেন্দ্রিক এই প্রতিযোগিতা নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে। পিএসজির কোচ লুইস এনরিকের মতো অনেকে ব্যক্তিগত অর্জনের চেয়ে দলীয় সাফল্যকে বেশি গুরুত্ব দেন। তাদের মতে, ফুটবল দলীয় খেলা; তাই একজন খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত স্বীকৃতির চেয়ে পুরো দলের অর্জনই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তারপরও ব্যালন ডি’অরের জনপ্রিয়তা ও বাণিজ্যিক গুরুত্ব ক্রমেই বেড়েছে। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের অনুষ্ঠান বিশ্বের ১০৫টি দেশে সম্প্রচারিত হয়েছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও পুরস্কারটি ঘিরে তৈরি হয়েছিল ব্যাপক আগ্রহ।
সব মিলিয়ে, ব্যালন ডি’অর জিতলে আয়োজকদের কাছ থেকে সরাসরি নগদ অর্থ না পেলেও একজন ফুটবলারের সামনে বড় অঙ্কের বোনাস ও বাণিজ্যিক আয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়। সেই আয় নির্ভর করে ক্লাব ও স্পনসরদের সঙ্গে চুক্তির শর্ত, খেলোয়াড়ের জনপ্রিয়তা এবং ভবিষ্যতে তৈরি হওয়া নতুন সুযোগের ওপর। তাই সোনালি ট্রফিটির চেয়েও সেটি জয়ের আর্থিক মূল্য অনেক বেশি হতে পারে।
আরটিভি/এসকে


