
চোখের সামনে একজন পরিচিত মানুষকে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে। কণ্ঠও তারই মতো। মুখের অভিব্যক্তি স্বাভাবিক, ঠোঁটের নড়াচড়াও কথার সঙ্গে মিলছে। দেখলে মনে হতে পারে, ঘটনাটি সত্যিই ঘটেছে। কিন্তু ভিডিওটি আসলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি বা পরিবর্তন করা হয়ে থাকতে পারে। বাস্তব মানুষের চেহারা, কণ্ঠ বা বক্তব্যকে এমনভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে, যা দেখে সাধারণ দর্শকের পক্ষে আসল ও কৃত্রিমের পার্থক্য করা কঠিন।
এই ধরনের কৃত্রিম বা পরিবর্তিত বিষয়বস্তুর একটি পরিচিত রূপ হলো ‘ডিপফেক’। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও যন্ত্রশিক্ষা ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তির চেহারা, কণ্ঠ বা আচরণ পরিবর্তন করে এমনভাবে উপস্থাপন করা যায়, যেন তিনি সত্যিই ওই কথা বলেছেন বা ওই কাজ করেছেন।
একসময় কোনো ঘটনা সত্য কিনা, তা যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ছবি ও ভিডিওকে তুলনামূলকভাবে বেশি নির্ভরযোগ্য দৃশ্যমান প্রমাণ হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু সৃষ্টিশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সক্ষমতা বাড়ার সঙ্গে সেই ধারণা বদলে যাচ্ছে। এখন শুধু চোখে দেখা বা কানে শোনা কোনো বিষয় সত্য কিনা, সেটি নির্ধারণ করা আগের মতো সহজ নয়। সাম্প্রতিক গবেষণাগুলোও দেখাচ্ছে, মানুষের নিজস্ব চোখ ও পর্যবেক্ষণ ক্ষমতার ওপর এককভাবে নির্ভর করে ডিপফেক শনাক্ত করা বেশ কঠিন।
মানুষ কতটা ভালোভাবে ডিপফেক শনাক্ত করতে পারে
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে কান্টারের মাধ্যমে ভেরিফের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালিত এক গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ব্রাজিলের ৩ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর পরীক্ষা চালানো হয়। প্রতিটি দেশ থেকে ১ হাজার করে অংশগ্রহণকারী নেওয়া হয়। অংশগ্রহণকারীদের বয়স ছিল ১৮ থেকে ৬৪ বছর। বয়স, লিঙ্গ ও অঞ্চলভিত্তিক জাতীয় প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার জন্য নির্দিষ্ট অনুপাত অনুসরণ করা হয়েছিল।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের ১৬টি দৃশ্য দেখানো হয়। এর মধ্যে আটটি ছিল আসল এবং আটটি ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বা পরিবর্তিত বিষয়বস্তু। এর মধ্যে সম্পূর্ণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ছবি, কৃত্রিমভাবে তৈরি ভিডিও এবং একজনের মুখের জায়গায় অন্যজনের মুখ বসানো ভিডিওও ছিল। দৃশ্যগুলো এলোমেলোভাবে দেখানো হয়, যাতে উপস্থাপনের ক্রম পরীক্ষার ফলকে প্রভাবিত না করে।
ফলাফলে দেখা যায়, ডিপফেক শনাক্ত করার ক্ষেত্রে তিন দেশের মানুষের সক্ষমতা খুবই সীমিত। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের গড় শনাক্তকরণ স্কোর ছিল ০ দশমিক ০৭ এবং ব্রাজিলের ০ দশমিক ০৮।
এখানে একটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। এই ০ দশমিক ০৭ বা ০ দশমিক ০৮ কোনো শতাংশ নয়। গবেষণায় স্কোরের পরিসর ছিল ঋণাত্মক ১ থেকে ধনাত্মক ১। সেখানে ১ মানে নিখুঁতভাবে শনাক্ত করা, ০ মানে অনুমানের পর্যায় এবং ঋণাত্মক ১ মানে ধারাবাহিকভাবে ভুল উত্তর দেওয়া। ফলে ০ দশমিক ০৭ বা ০ দশমিক ০৮ স্কোর বলতে বোঝায়, অংশগ্রহণকারীরা অনুমানের তুলনায় সামান্য ভালো করলেও তাদের শনাক্ত করার সক্ষমতা ছিল খুবই সীমিত।
যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে প্রায় অর্ধেক নিজেদের ডিপফেক শনাক্ত করার সক্ষমতা নিয়ে আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। কিন্তু পরীক্ষায় তাদের গড় ফল সেই আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। গবেষণাটি দেখিয়েছে, নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে মানুষের ধারণা এবং বাস্তবে তাদের শনাক্ত করার ক্ষমতার মধ্যে বড় ব্যবধান থাকতে পারে।
গবেষণায় প্রায় ৭ শতাংশ অংশগ্রহণকারীকে উচ্চঝুঁকির দলে রাখা হয়েছে। এই দলের মানুষের ডিপফেক শনাক্ত করার সক্ষমতা তুলনামূলক কম, নিজেদের দক্ষতা সম্পর্কে আত্মবিশ্বাস বেশি এবং সন্দেহজনক বিষয়বস্তু যাচাই করার প্রবণতা কম। অর্থাৎ শুধু ভুল শনাক্ত করাই সমস্যা নয়, বরং নিজের ভুল হওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসও ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
মানুষ আসলে কী দেখে
ডিপফেক শনাক্ত করার সময় মানুষ সাধারণত কিছু দৃশ্যমান অস্বাভাবিকতা খোঁজে। ভেরিফের ২০২৬ সালের গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৫৩ শতাংশ অস্বাভাবিক ত্বক বা ত্বকের গঠন লক্ষ্য করার কথা বলেছেন। ৫২ শতাংশ চুল, দাঁত বা চোখের মতো বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের অস্বাভাবিকতা খোঁজেন। ৫১ শতাংশ ভিডিওতে অস্বাভাবিক নড়াচড়া বা মুখের অভিব্যক্তি লক্ষ্য করেন। ৪৫ শতাংশ পেছনের দৃশ্যের অসংগতি এবং ৪৩ শতাংশ আলো বা ছায়ার অস্বাভাবিকতা খোঁজেন।
কিন্তু এখানেই তৈরি হচ্ছে নতুন সমস্যা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নতির সঙ্গে এসব দৃশ্যমান ত্রুটি অনেক ক্ষেত্রে কম স্পষ্ট হয়ে আসছে। অর্থাৎ একসময় যে ধরনের অস্বাভাবিকতা দেখে কৃত্রিম ছবি বা ভিডিও শনাক্ত করা যেত, উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি বিষয়বস্তুতে সেই চিহ্নগুলো সবসময় নির্ভরযোগ্য নাও হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ৩৬ শতাংশ অংশগ্রহণকারী বলেছেন, ডিপফেক শনাক্ত করার সময় তারা কোনো নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের চেয়ে নিজের সামগ্রিক অনুভূতির ওপর নির্ভর করেন। যুক্তরাজ্যে এই হার ছিল ৪৭ শতাংশ এবং ব্রাজিলে ৩৪ শতাংশ। অর্থাৎ অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ কোনো নির্দিষ্ট যাচাই প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে বিষয়টি দেখতে কেমন লাগছে, তার ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয়।
এখানেই বড় প্রশ্ন তৈরি হয়। কোনো ভিডিও দেখতে সত্যি মনে হলেই কি সেটি সত্য? আবার কোনো ভিডিওতে অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়লেই কি সেটি অবশ্যই কৃত্রিম? গবেষণাগুলো বলছে, শুধু এসব দৃশ্যমান লক্ষণের ওপর নির্ভর করে সিদ্ধান্ত নেওয়া নিরাপদ নয়।
তরুণরা কি ডিপফেক শনাক্ত করতে বেশি সক্ষম
তরুণদের ডিপফেক শনাক্ত করার পদ্ধতি নিয়েও গবেষণা হয়েছে। ২০২৫ সালের ১৬ অক্টোবর প্রকাশিত ‘জেনারেশন জেডের ডিপফেক ভিডিও শনাক্ত করার কৌশল’ শীর্ষক গবেষণায় ২১ বছরের কম বয়সী অংশগ্রহণকারীদের ডিপফেক শনাক্ত করার কৌশল পরীক্ষা করা হয়। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের চারটি ভিডিও দেখানো হয়। এর মধ্যে দুটি ছিল আসল এবং দুটি ছিল ডিপফেক। এরপর তারা কীভাবে ভিডিওগুলো শনাক্ত করেছেন, সে বিষয়ে অনলাইন জরিপে উত্তর দেন।
গবেষণায় দেখা যায়, তরুণরা ডিপফেক শনাক্ত করার সময় মূলত তিন ধরনের তথ্যের ওপর নির্ভর করেন। এগুলো হলো দৃশ্যগত তথ্য, শব্দভিত্তিক তথ্য এবং আগে থেকে জানা তথ্য বা ঘটনার প্রেক্ষাপট। অর্থাৎ শুধু ভিডিওর চেহারা নয়, কণ্ঠ, ভাষা, আগে থেকে জানা তথ্য এবং বিষয়টির প্রেক্ষাপটও তারা বিবেচনায় নেন।
তবে শুধু মুখের বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করা খুব কার্যকর হয়নি। গবেষণায় আসল ও ডিপফেক ভিডিও শনাক্ত করার ক্ষেত্রে মুখের বৈশিষ্ট্য ব্যবহারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য পাওয়া যায়নি। বরং ভুলভাবে ডিপফেককে আসল মনে করার ক্ষেত্রে মুখের বৈশিষ্ট্যের ওপর বেশি নির্ভর করা হয়েছিল।
অন্যদিকে শব্দভিত্তিক তথ্য, বিশেষ করে কণ্ঠ ও ভাষার বৈশিষ্ট্য, আসল ভিডিও সঠিকভাবে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। গবেষণায় সঠিকভাবে আসল ভিডিও শনাক্ত করার সময় কণ্ঠের বৈশিষ্ট্য ব্যবহারের হার ছিল ৮৬ দশমিক ৭ শতাংশ। ডিপফেক শনাক্ত করার সময় তা ছিল ৭২ দশমিক ৯ শতাংশ। ভাষাগত বৈশিষ্ট্যের ক্ষেত্রে এই হার ছিল যথাক্রমে ৫৬ শতাংশ ও ৩৬ দশমিক ৭ শতাংশ।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের ডিপফেক শনাক্ত করার গড় নির্ভুলতা ছিল ৭১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং আসল ভিডিও শনাক্ত করার গড় নির্ভুলতা ছিল ৭৭ শতাংশ। তবে এই পার্থক্য পরিসংখ্যানগতভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল না। ফলে এই ফলকে তরুণদের ডিপফেক শনাক্ত করার ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে ভালো বা খারাপ সক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে দেখানো যাবে না।
এই গবেষণার আরেকটি সীমাবদ্ধতা হলো, অংশগ্রহণকারীদের সংখ্যা ও গবেষণার ধরন সীমিত ছিল। ফলে ফলাফলকে বিশ্বের সব জেনারেশন জেড তরুণের ওপর সরাসরি প্রয়োগ করা ঠিক হবে না। বরং এটি তরুণদের ডিপফেক শনাক্ত করার কৌশল সম্পর্কে একটি গবেষণাভিত্তিক চিত্র দেয়।
৯২৪ জনের গবেষণায় কী পাওয়া গেল
২০২৬ সালের ৬ আগস্ট প্রকাশিত আরেকটি গবেষণায় ৯২৪ জন অংশগ্রহণকারীর ওপর ডিপফেক প্রযুক্তি সম্পর্কে মানুষের ঝুঁকি, উপকারিতা, গোপনীয়তা এবং আস্থার বিষয় নিয়ে জরিপ করা হয়। গবেষণাটি বিভিন্ন দেশের অংশগ্রহণকারীদের নিয়ে করা হলেও এটি বিশ্বের সাধারণ জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী কোনো পূর্ণাঙ্গ জরিপ নয়। নমুনার সবচেয়ে বড় অংশ ছিল নরওয়ে থেকে ৩৬ দশমিক ৪ শতাংশ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে ৩২ শতাংশ এবং ফ্রান্স থেকে ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ।
গবেষণায় ৫৪ দশমিক ৩ শতাংশ অংশগ্রহণকারী মনে করেন, ডিপফেক প্রযুক্তির ব্যবহারিক উপকারিতা থাকতে পারে। অন্যদিকে ৮৪ দশমিক ৮ শতাংশ মনে করেন, ডিপফেক মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে। ৮২ দশমিক ৭ শতাংশ মনে করেন, কারও ছবি বা কণ্ঠ অননুমোদিতভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে ডিপফেক ব্যক্তিগত তথ্য ও গোপনীয়তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
অর্থাৎ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি শুধু ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভালো’ বা ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খারাপ’ এমন সরল জায়গায় নেই। মানুষ একদিকে প্রযুক্তিটির সম্ভাব্য ব্যবহারিক সুবিধা দেখছে, অন্যদিকে একই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিভ্রান্তি, গোপনীয়তা লঙ্ঘন ও অপব্যবহারের ঝুঁকি নিয়েও উদ্বিগ্ন।
তবে গবেষণাটি ছিল নির্দিষ্ট সময়ের মানুষের মতামতভিত্তিক একটি জরিপ। তাই এসব সম্পর্ককে সরাসরি কারণ ও ফলাফল হিসেবে ব্যাখ্যা করা যায় না।
বাংলাদেশে পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগজনক
বাংলাদেশেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংশ্লিষ্ট ভুল তথ্য এখন বাস্তব তথ্যপরিবেশের অংশ। তবে এখানে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করা জরুরি। বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়া সব ভুল তথ্যের পূর্ণ হিসাব হিসেবে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য যাচাইয়ের উপাত্তকে ব্যবহার করা যাবে না।
ফ্যাক্টচেকবিডির বাংলাদেশ ভুল তথ্য পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ২ হাজার ৪০২টি যাচাইকৃত ও সমন্বিত ভুল তথ্যের ঘটনা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪১৬টি ঘটনা ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংশ্লিষ্ট। অর্থাৎ ওই উপাত্তের ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ ঘটনার সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় তৈরি বিষয়বস্তুর সম্পর্ক ছিল।
এই ৪১৬টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংশ্লিষ্ট ঘটনার মধ্যে আনুমানিক ৩৫ শতাংশ ছিল ডিপফেক ভিডিও, ৩০ শতাংশ ছবি পরিবর্তন, ২২ শতাংশ ভুয়া তথ্যচিত্র এবং ১৩ শতাংশ কণ্ঠস্বর নকলের ঘটনা।
মাধ্যমের দিক থেকেও ফেসবুক ছিল সবচেয়ে বড় মাধ্যম। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল ২০২৬ সালের উপাত্তে ভুল তথ্যের ঘটনার ৬২ শতাংশ ফেসবুকের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। টিকটকের হার ছিল ১৫ শতাংশ এবং ইউটিউবের ১০ শতাংশ।
তবে এই উপাত্তকে বাংলাদেশের সব ভুল তথ্যের পূর্ণ চিত্র হিসেবে দেখা যাবে না। কারণ এটি প্রকাশ্যে যাচাই করা দাবির ভিত্তিতে তৈরি এবং একই দাবির একাধিক যাচাইকে একত্র করে একটি ঘটনা হিসেবে গণনা করা হয়েছে। ফলে এটি যাচাইকৃত ঘটনার একটি উপাত্ত, দেশের মোট ভুল তথ্যের পরিমাণ নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সময়সীমা। জানুয়ারি থেকে এপ্রিল ২০২৬ সালের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মাধ্যমভিত্তিক বিস্তারিত বিভাজন পাওয়া গেলেও পরবর্তী মাসগুলোর একই ধরনের বিভাজন পাওয়া যায় না। তাই জানুয়ারি থেকে এপ্রিলের হার ধরে পরবর্তী মাসগুলোর পরিস্থিতি সম্পর্কে কোনো অনুমান করা ঠিক হবে না।
বাংলাদেশে ২০২৬ সালে এমন বড় আকারের প্রকাশ্য জরিপ, যেখানে কয়েকশ বা কয়েক হাজার বাংলাদেশি অংশগ্রহণকারীকে সরাসরি আসল ও ডিপফেক ভিডিও দেখিয়ে শনাক্ত করার নির্ভুলতা মাপা হয়েছে, সাম্প্রতিকভাবে পাওয়া গবেষণাগুলোর মধ্যে পাওয়া যায়নি। তাই যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ব্রাজিল বা অন্যান্য দেশের গবেষণার ফলকে সরাসরি বাংলাদেশের মানুষের সক্ষমতা হিসেবে উপস্থাপন করা বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক হবে না।
তবে বাংলাদেশের তথ্য যাচাইয়ের উপাত্ত এবং আন্তর্জাতিক গবেষণাগুলো পাশাপাশি রাখলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। কৃত্রিম বা পরিবর্তিত বিষয়বস্তু বাংলাদেশের তথ্যপরিবেশেও উপস্থিত। একই সময়ে আন্তর্জাতিক গবেষণা দেখাচ্ছে, সাধারণ মানুষের পক্ষে এসব বিষয় শুধু চোখে দেখে নির্ভরযোগ্যভাবে শনাক্ত করা কঠিন।
তাহলে সত্য-মিথ্যা বোঝার উপায় কী
ডিপফেকের যুগে প্রথম নিয়ম হওয়া উচিত, ভিডিও দেখেই সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাস না করা।
কোনো ভিডিও গুরুত্বপূর্ণ কোনো দাবি করলে প্রথমেই এর উৎস খুঁজতে হবে। ভিডিওটি প্রথম কে প্রকাশ করেছে? সেটি কি মূল উৎস? সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার নিজস্ব মাধ্যমে একই বক্তব্য বা ঘটনার কোনো তথ্য আছে কি না, সেটি দেখা দরকার।
দ্বিতীয়ত, একাধিক নির্ভরযোগ্য উৎসে তথ্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। কোনো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সত্য হলে তার অন্য স্বাধীন সংবাদ প্রতিবেদন, ছবি, ভিডিও, সরকারি বক্তব্য বা প্রত্যক্ষ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। শুধু একটি ফেসবুক পেজ, টিকটক হিসাব বা অপরিচিত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের হিসাবের ভিডিওকে একমাত্র প্রমাণ হিসেবে ধরা উচিত নয়।
তৃতীয়ত, ভিডিওর প্রেক্ষাপট যাচাই করতে হবে। ভিডিওটি কখন ধারণ করা হয়েছে? কোথায়? কোন ঘটনার সময়? বক্তব্যের আগে ও পরে কী বলা হয়েছিল? কয়েক বছর আগের কোনো ভিডিওকে নতুন ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে কি না, এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
চতুর্থত, কণ্ঠ ও ভাষার দিকে নজর দেওয়া যেতে পারে। কণ্ঠের ওঠানামা, উচ্চারণ, বক্তব্যের ধরন, শব্দের ব্যবহার এবং বক্তব্যের সঙ্গে ব্যক্তির পরিচিত আচরণ মিলছে কি না, সেগুলো কিছুটা ধারণা দিতে পারে। তবে এগুলোও চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।
পঞ্চমত, প্রযুক্তিগত যাচাই ব্যবহার করা যেতে পারে। ছবির উৎস খোঁজা, ফাইলের তথ্য বিশ্লেষণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক শনাক্তকরণ ব্যবস্থা কিছু ক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারে। কিন্তু এগুলোর কোনোটিকেই এককভাবে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে দেখা উচিত নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে কোনো ফাইল বারবার আপলোড বা পরিবর্তন হলে ফাইলের মূল তথ্য হারিয়ে যেতে পারে। একইভাবে কোনো একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শনাক্তকারী ব্যবস্থার ফলও ভুল হতে পারে।
বরং সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি হলো একাধিক স্তরে যাচাই করা। উৎস, সময়, স্থান, বক্তব্যের প্রেক্ষাপট, অন্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং প্রয়োজনে প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ সবগুলো একসঙ্গে বিবেচনা করা।
শুধু ‘ভুয়া’ শনাক্ত করাই কি যথেষ্ট
ডিপফেকের ঝুঁকি শুধু মানুষকে মিথ্যা বিশ্বাস করানোতে সীমাবদ্ধ নয়। এর আরেকটি সম্ভাব্য বিপদ হলো, মানুষ ধীরে ধীরে সত্যিকেও সন্দেহ করতে শুরু করতে পারে।
যদি মানুষ মনে করতে শুরু করে, ‘যেকোনো ভিডিওই তো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে বানানো হতে পারে’, তাহলে সত্যিকার ভিডিও, বক্তব্য বা প্রমাণ নিয়েও অযথা সন্দেহ তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। ডিপফেকের এই সম্ভাব্য প্রভাব শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য নয়, সংবাদমাধ্যম, জনআস্থা, বিচারিক প্রক্রিয়া ও গণতান্ত্রিক তথ্যপরিবেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
৯২৪ জনের গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা ডিপফেকের সম্ভাব্য প্রভাব হিসেবে ভুল তথ্য, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন, অপরাধমূলক অপব্যবহার ও সুনাম ক্ষতির মতো বিষয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু ‘একটি ভিডিও ভুয়া কি না’ এই প্রশ্নে আটকে নেই। প্রশ্নটি আরও বড়। মানুষ কীভাবে ভবিষ্যতে ডিজিটাল প্রমাণের ওপর আস্থা রাখবে, সংবাদমাধ্যম কীভাবে বিষয়বস্তু যাচাই করবে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কৃত্রিম বিষয়বস্তুর মধ্যে সত্যিকার তথ্য কীভাবে আলাদা করা হবে, সেসবও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সাংবাদিকতার জন্য চ্যালেঞ্জ আরও বড়
ডিপফেকের যুগে সাংবাদিকদের দায়িত্বও বদলাচ্ছে। আগে কোনো ভিডিও বা ছবি পাওয়ার পর সেটির স্থান, সময় ও উৎস যাচাই করাই ছিল মূল কাজ। এখন তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিষয়টি আদৌ কৃত্রিমভাবে তৈরি বা পরিবর্তন করা হয়েছে কিনা, সেই প্রশ্নও।
একটি ভিডিও যদি কোনো গুরুত্বপূর্ণ দাবি করে, সাংবাদিকের উচিত শুধু ভিডিওটি দেখে খবর প্রকাশ না করা। ভিডিওটির প্রথম উৎস খুঁজে বের করা, মূল ফাইল পাওয়া গেলে সেটি পরীক্ষা করা, একই ঘটনার অন্য ভিডিও বা ছবি খোঁজা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া এবং স্বাধীন উৎসের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
বিশেষ করে কোনো ভিডিও যদি রাজনৈতিক, সামাজিক, অপরাধমূলক বা জনস্বার্থের গুরুত্বপূর্ণ দাবি বহন করে, তাহলে যাচাইয়ের স্তর আরও শক্ত হওয়া দরকার। কারণ একটি ভুলভাবে প্রকাশিত ডিপফেক শুধু একটি ভুল খবর তৈরি করে না, এটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সুনাম, জনমত এবং বৃহত্তর তথ্যপরিবেশেও প্রভাব ফেলতে পারে।
মানুষকে কি শুধু প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করতে হবে
না। বরং গবেষণাগুলোর ফল থেকে যে বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে সামনে আসে তা হলো, মানুষের বিচারবোধ ও প্রযুক্তিগত যাচাই দুটিকে একসঙ্গে ব্যবহার করা প্রয়োজন।
কান্টার ও ভেরিফের গবেষণায় দেখা গেছে, শুধু মানুষের চোখের ওপর নির্ভর করলে ফল খুব সীমিত হতে পারে। আবার তরুণদের নিয়ে করা গবেষণায় দেখা গেছে, শব্দ, ভাষা ও প্রেক্ষাপটের মতো বিভিন্ন ধরনের তথ্য একসঙ্গে বিবেচনা করা হয়। অন্যদিকে ৯২৪ জনের গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ প্রযুক্তির সম্ভাব্য সুবিধা স্বীকার করলেও ভুল তথ্য ও গোপনীয়তা নিয়ে বড় ধরনের উদ্বেগও রাখে।
তাই ভবিষ্যতের তথ্য যাচাই সম্ভবত শুধু ‘মানুষ বনাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ হবে না। বরং মানুষ, প্রযুক্তি, উৎস যাচাই এবং প্রাতিষ্ঠানিক যাচাই সবগুলোকে একসঙ্গে কাজে লাগানোর প্রয়োজন হবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা কী
ডিপফেক শনাক্ত করার জন্য কোনো একক জাদুকরী কৌশল নেই। চোখের নড়াচড়া, মুখের গঠন, ঠোঁটের নড়াচড়া, কণ্ঠের ওঠানামা বা আলোছায়া দেখে কিছু লক্ষণ পাওয়া যেতে পারে। কিন্তু এগুলোর কোনোটিই সব পরিস্থিতিতে নিশ্চিত প্রমাণ নয়।
সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো বরং অন্য একটি শিক্ষা দেয়। মানুষ অনেক সময় নিজের সক্ষমতা সম্পর্কে যতটা আত্মবিশ্বাসী, বাস্তবে তার শনাক্ত করার নির্ভুলতা ততটা ভালো নাও হতে পারে। কান্টার ও ভেরিফের গবেষণায় এই আত্মবিশ্বাস ও বাস্তব সক্ষমতার ব্যবধান স্পষ্ট হয়েছে। একই সঙ্গে তরুণদের নিয়ে করা গবেষণায় দেখা গেছে, প্রেক্ষাপট, শব্দ ও ভাষার মতো একাধিক ধরনের তথ্য বিবেচনা করা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বাংলাদেশের তথ্যপরিবেশেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংশ্লিষ্ট ভুল তথ্যের উপস্থিতি এখন নথিভুক্ত। ফ্যাক্টচেকবিডির জানুয়ারি থেকে এপ্রিল ২০২৬ সালের সমন্বিত উপাত্তে ৪১৬টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসংশ্লিষ্ট ঘটনা পাওয়া গেছে, যার মধ্যে আনুমানিক ৩৫ শতাংশ ছিল ডিপফেক ভিডিও। তবে এই সংখ্যা বাংলাদেশের সব ভুল তথ্যের পূর্ণ চিত্র নয়। এটি প্রকাশ্যে যাচাই করা ঘটনার একটি উপাত্ত।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সক্ষমতা আরও বাড়ার সঙ্গে কৃত্রিম বিষয়বস্তু আরও বাস্তবসম্মত হয়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতের তথ্যজগতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা শুধু ‘ভুয়া ধরতে পারা’ নয়। বরং কোনো তথ্য বিশ্বাস করার আগে তার উৎস, প্রেক্ষাপট ও স্বাধীন প্রমাণ খুঁজে দেখার অভ্যাস তৈরি করা।
কারণ এখন আর প্রশ্নটা শুধু, ‘এটা দেখতে সত্যি কিনা?’ বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, ‘এটা সত্য, তার প্রমাণ কী?’
আরটিভি/এসএস




