সাতক্ষীরা সদর উপজেলার লাবসা ইউনিয়নে শৈলকুর বিলে অপরিকল্পিত মৎস্য ঘেরের কারণে স্থায়ী জলাবদ্ধতার শিকার হয়েছেন শত শত পরিবারের হাজার হাজার মানুষ। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে ইউপির মাগুরা, কৈখালী, তালতলা, গোপীনাথপুরসহ অন্তত ১০টি গ্রামে এই কৃত্রিম বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা দেখা দেওয়ায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। দুর্ভোগ নিরসনে দ্রুত জেলা প্রশাসকের কার্যকর হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টানা বর্ষণে তালতলা ঈদগাহ মোড় থেকে কৈখালী মাদ্রাসা পর্যন্ত সড়ক, মাগুরা আইসক্রিম ফ্যাক্টরি থেকে দাসপাড়ার ইটের সোলিং রাস্তা এবং মাগুরা কর্মকার পাড়ার পাকা রাস্তা পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ফলে স্কুলগামী কোমলমতি শিশুদের যাতায়াতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। এ ছাড়া লোকালয়ে পানি ঢুকে গৃহস্থালি পুকুরের মাছ ভেসে গেছে এবং বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি ও বেশ কিছু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের আঙিনা প্লাবিত হয়েছে।
এদিকে সাতক্ষীরা-খুলনা মহাসড়কের মাগুরা-গোপীনাথপুর ও বিনেরপোতা অংশ এবং বিনেরপোতা বিসিক শিল্পনগরী থেকে লাবসা মোড় পর্যন্ত বাইপাস সড়কের দুই ধারে অপরিকল্পিত ঘের থাকায় সড়কের বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। মহাসড়কের বিভিন্ন অংশের পিচ উঠে গিয়ে তৈরি হয়েছে ছোট-বড় অনেক গর্ত।
স্থানীয় বাসিন্দা আলতাফ হোসেন বাবু বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, একসময় শৈলকুর বিলের পানি স্থানীয় গেটের খাল হয়ে বেতনা নদীতে গিয়ে পড়তো। এ ছাড়া কুলুটিয়া ও গোপীনাথপুর খাল দিয়ে এলাকা থেকে পানি অপসারণ হতো। তবে গত সাত-আট বছর ধরে মাত্র ১৫-১৬টি ঘেরের কারণে ঐতিহ্যবাহী এই পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমের আগেই ঘেরমালিকেরা ভেকু দিয়ে বেড়িবাঁধ উঁচিয়ে তোলায় একটু বৃষ্টি হলেই পুরো গ্রাম পানিবন্দি হয়ে পড়ে।
শৈলকুর বিলে খন্দকার আলী হায়দার, ইয়ার আলী, আলী হোসেন মেম্বার ও তার ছেলে জুয়েল-জুলু, রাজু, কামরুজ্জামান, তৈয়ব আলী, জিয়াদ আলী, কামাল হোসেন, ইকবাল হোসেনসহ কয়েকজন প্রভাবশালী মৎস্য ঘের তৈরি করায় এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানা গেছে।
ঘের মালিকদের একজন কামরুজ্জামান নিজেই স্বীকার করে বলেন, শৈলকুর বিলের ১৫-১৬টি ঘেরের বেড়িবাঁধ কেটে দিলে মাগুরা ও কৈখালী গ্রামের প্রায় চার হাজার মানুষ জলাবদ্ধতার হাত থেকে তাৎক্ষণিক মুক্তি পাবে।
মাগুরা গ্রামের সমাজসেবক আবিদার রহমান বলেন, অপরিকল্পিত ঘেরের কারণে কয়েক হাজার মানুষ পানিবন্দি। দুর্ভোগ লাঘবে সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আমরা কার্যকর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জোরালো দাবি জানাচ্ছি।
স্থানীয় মাদ্রাসা শিক্ষক সালমা খাতুন বলেন, পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে চার থেকে পাঁচ মাস ঘরবাড়িতে পানি জমে থাকে। এর ফলে পানিবাহিত চর্মরোগ, চুলকানি ও ঘা-পাঁচড়া ছড়িয়ে পড়ছে। স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে এবং বিষাক্ত সাপ ও পোকামাকড়ের উপদ্রব বেড়েছে। সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছেন নারী ও শিশুরা।
সাতক্ষীরা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অর্ণব দত্ত বলেন, শৈলকুর বিলের জমা পানি সরানোর জন্য স্থানীয় লাবসা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে অবিলম্বে মৎস্য ঘের মালিক ও এলাকাবাসীকে নিয়ে বৈঠক করার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয়ভাবে পানি সরানোর উদ্যোগ সফল না হলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ঘেরের বাঁধ কেটে পানি অপসারণ করা হবে।
আরটিভি/এমএম




