১৮ দিনে ৩ জাহাজে হানা জলদস্যুদের, লুটে নিল ১০ কোটি টাকার মালামাল

আরটিভি নিউজ

শনিবার, ০১ আগস্ট ২০২৬ , ০৪:৫১ পিএম


১৮ দিনে ৩ জাহাজে হানা জলদস্যুদের, লুটে নিল ১০ কোটি টাকার মালামাল
১৮ দিনে ৩ জাহাজে হানা জলদস্যুদের, লুটে নিল ১০ কোটি টাকার মালামাল। ছবি: সংগৃহীত

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে জলদস্যুদের তৎপরতা বেড়েছে। ১৮ দিনের মধ্যে তিনটি জাহাজে হানা দিয়ে মোট ১০ কোটি টাকার মালপত্র লুট করেছে তারা। যার ফলে উদ্বিগ্ন আমদানিকারকসহ বন্দর ব্যবহারকারীরা। সেই সঙ্গে ইমেজ সংকটে পড়েছে চট্টগ্রাম বন্দর।

তাই চট্টগ্রাম চেম্বার দস্যুতা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে চিঠি পাঠিয়েছে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে।

গত ১৬ জুলাই ভোরে চার্লি অ্যাঙ্করেজে নোঙর করা সিয়েরা লিওনের পতাকাবাহী ট্যাঙ্কার ‘তাই শুয়েন’-এ হামলা চালায় জলদস্যুরা। জাহাজটি হংকং থেকে আনা হয় সীতাকুণ্ডে জনতা স্টিলের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে ভাঙার জন্য। প্রায় ২০ সশস্ত্র দস্যু পাঁচটি কাঠের নৌকায় এসে হানা দেয়।

শিপিং এজেন্ট বেন লাইনের মালিক মোশাররফ হোসেন জানান, নোঙর ফেলার সময় হামলাকারীদের একটি দল নাবিকদের ব্যস্ত রাখে এবং অন্য দল ডেক থেকে নোঙরের দড়ি, ব্যাটারি ও অন্যান্য মূল্যবান সরঞ্জাম লুট করে। জাহাজের ক্যাপ্টেন তাৎক্ষণিকভাবে বন্দর নিয়ন্ত্রণ কক্ষে রেডিও বার্তা পাঠালেও কোস্টগার্ড ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই দস্যুরা পালিয়ে যায়। 

আরও পড়ুন

এর আগে ২৯ জুন চার্লি অ্যাঙ্করেজে ডায়নামিক শিপ রিসাইক্লিংয়ের আমদানি করা ‘এমভি হাই জু’ জাহাজে ২০ থেকে ২৫ জন সশস্ত্র ডাকাত উঠে নাবিকদের জিম্মি করে প্রায় এক কোটি টাকার যন্ত্রাংশ লুট করে নিয়ে যায়। এর পরদিন যমুনা শিপ ব্রেকার্সের আমদানি করা ‘এমটি আইআরওএস’ জাহাজ থেকে কয়েক কোটি টাকার সরঞ্জাম চুরি হয়। পরে নৌ পুলিশ রাজধানীর বাংলাবাজার এলাকা থেকে প্রায় দুই কোটি টাকার চোরাই মালপত্র উদ্ধার করে। 

প্রতিটি ঘটনায় কোস্টগার্ড ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হলেও তাৎক্ষণিক সহায়তা পাওয়া যায়নি বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন। 
আন্তর্জাতিক সমুদ্র নিরাপত্তা সংস্থা রিজিওনাল কো-অপারেশন এগ্রিমেন্ট অন কমবেটিং পাইরেসি অ্যান্ড আর্মড রোবেরি এগেইনস্ট শিপস ইন এশিয়া (রিক্যাপ) তাদের সবশেষ প্রতিবেদনে বলেছে, চট্টগ্রাম বন্দরে চলতি বছরের প্রথম চার মাসে (জানুয়ারি-এপ্রিল) কোনো প্রকার দস্যুতা বা চুরির ঘটনা ঘটেনি। তবে হঠাৎ করে একের পর এক ঘটনায় চরম উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে শিপিং এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন, শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরসহ বন্দর ব্যবহারকারী বিভিন্ন সংস্থা। 

চট্টগ্রাম বন্দরে আসা পণ্যের প্রায় ৭০ শতাংশ খালাস হয় বহির্নোঙরে। নাব্য সংকটে জাহাজগুলো সরাসরি জেটিতে নোঙর করতে পারে না। ছোট আকারের (লাইটার) জাহাজে বেশির ভাগ আমদানি পণ্য খালাস করা হয়। প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৫০টি বড় পণ্যবাহী জাহাজ নোঙর করা থাকে সেখানে। এসব জাহাজ থেকে গড়ে দৈনিক দেড় লাখ টন পণ্য খালাস করা হয় লাইটার জাহাজে।
 
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে দেশের আমদানি-রপ্তানির ৯২ ভাগ পরিচালিত হয়। এটির বহির্নোঙরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে জাতীয় অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতির মুখে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশি শিপিং অপারেটরদের মধ্যে ঝুঁকির আশঙ্কা বাড়বে, বীমা ব্যয় এবং বৈদেশিক বাণিজ্যের খরচও বেড়ে যাবে। তাই জরুরি পদক্ষেপ নিতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছি আমরা।

বহির্নোঙরে জাহাজে জলদস্যুতা প্রতিরোধে নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের কাছে পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, জলদস্যুতার ঘটনায় অন্তত ১০ কোটি টাকার মালপত্র, জাহাজের সরঞ্জাম ও মূল্যবান যন্ত্রাংশ লুট হয়েছে। পাশাপাশি জাহাজের নিরাপত্তা ও নাবিকদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর বহির্নোঙরে বড় জাহাজের পণ্য খালাসের দায়িত্ব পালন করে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটররা। বাংলাদেশ বার্থ অপারেটর অ্যান্ড শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান  সরওয়ার হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে চলতি বছরের প্রথম চার মাসে কোনো দস্যুতার ঘটনা ঘটেনি। হঠাৎ করে ডাকাতি হচ্ছে বহির্নোঙরে। 

লাইটার জাহাজ পরিচালনা করে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল। এই সংগঠনের মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ বলেন, ছোট নৌকায় করে কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে বড় জাহাজে হঠাৎ চড়াও হয় দস্যুরা। চুরি-ডাকাতি ঠেকাতে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বন্দর ও কোস্টগার্ডকে। 

বহির্নোঙরে কয়েকটি জাহাজে চুরির অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নেয় বন্দর কর্তৃপক্ষ ও কোস্টগার্ড। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে এরই মধ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন), বাংলাদেশ কোস্টগার্ড পূর্ব জোনের জোনাল কমান্ডারকে নিয়ে সমন্বয় সভা করেছেন। 

সভায় সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর পর্যালোচনা, ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও ভবিষ্যতে চুরি প্রতিরোধে করণীয় নির্ধারণ করা হয়। সভায় বাংলাদেশ কোস্টগার্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে বহির্নোঙরে নজরদারি বাড়ানো, অনুমোদিত ওয়াচম্যান নিয়োগ নিশ্চিত, জাহাজের আগমনের তথ্য বাধ্যতামূলক সরবরাহ, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি জোরদারসহ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব রেফায়েত হামীম বলেন, বহির্নোঙরে চুরি বন্ধে নিরাপত্তাব্যবস্থা কঠোর করা হয়েছে। টানা অভিযান চালাচ্ছে কোস্টগার্ড। চুরির সঙ্গে জড়িত কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। 

আরটিভি/এসআর 

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission