কারাগারই এখন মাদকসেবীদের আস্তানা!

বকশীগঞ্জ (জামালপুর) প্রতিনিধি, আরটিভি নিউজ

বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬ , ১২:৪০ পিএম


কারাগারই এখন মাদকসেবীদের আস্তানা!
ছবি: আরটিভি

জামালপুরের বকশীগঞ্জ উপজেলার প্রাণকেন্দ্রে প্রায় আট বিঘা সরকারি জমির উপর দাঁড়িয়ে আছে একটি উপ-কারাগার। উদ্দেশ্য ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা, সীমান্তবর্তী এলাকার আসামিদের নিরাপদে সংরক্ষণ করা এবং জেলা কারাগারের ওপর চাপ কমানো। কিন্তু নির্মাণের ৪২ বছর পেরিয়ে গেলেও একদিনের জন্যও চালু হয়নি এই উপ-কারাগারটি। ফলে মাদকসেবীদের নিরাপদ আস্তানা হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে এই পরিত্যক্ত কারাগারটি। এ কারণে কোটি টাকার সরকারি স্থাপনাটি আজ পরিণত হয়েছে পরিত্যক্ত ধ্বংসস্তূপে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কারাগারের ভবনগুলোতে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ছে, জানালা-দরজা নষ্ট হয়ে গেছে, চারপাশ ঘিরে আছে ঝোপঝাড়। দীর্ঘদিনের অবহেলায় একসময়কার সম্ভাবনাময় সরকারি স্থাপনাটি এখন ভূতুড়ে পরিবেশের সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত সংরক্ষণের ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে পুরো স্থাপনাই ধ্বংস হয়ে যাবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র ও পুরোনো নথি থেকে জানা গেছে, ১৯৮৪ সালে তৎকালীন সরকারের উদ্যোগে প্রায় ২ দশমিক ৭৩ একর (প্রায় ৮ বিঘা) জমির ওপর নির্মাণ করা হয় বকশীগঞ্জ উপ-কারাগার। এখানে বন্দিদের জন্য ব্যারাক, প্রশাসনিক ভবন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক কোয়ার্টার, খেলার মাঠ ও একটি বড় পুকুর নির্মাণ করা হয়েছিল। তবে নির্মাণ ব্যয়ের তথ্য এখন আর পাওয়া যায় না।

তৎকালীন সময়ে বকশীগঞ্জ, দেওয়ানগঞ্জসহ সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের জামালপুর জেলা কারাগারে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে নিতে হতো। সেই ভোগান্তি ও নিরাপত্তা ঝুঁকি কমাতেই উপ-কারাগারটি নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন জটিলতার কারণে প্রকল্পটি আর চালু হয়নি। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভবনটি পরিণত হয়েছে অব্যবহৃত সরকারি সম্পদে। কারাগারের ভবেনর ইট খুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে নজরদারির অভাবে কারাগারের কিছু অংশে অবৈধ দখলে চলে গিয়েছে। সরকারি সম্পদ রক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে পুরো জায়গাই বেদখলের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০০৩ সালে স্থাপনাটি গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমানে এটি সরকারি সম্পত্তি হিসেবে সংরক্ষিত থাকলেও দীর্ঘদিনেও এর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে বকশীগঞ্জ পৌর শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থিত এত বড় সরকারি জায়গা জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহারের দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। স্থানীয়দের মতে, এখানে একটি আধুনিক শিশু বিনোদন কেন্দ্র, পার্ক, কোল্ড স্টোরেজ, স্টেডিয়াম, কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, সরকারি কলেজ কিংবা অন্য কোনো জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হলে এলাকার শিক্ষা, ক্রীড়া, কৃষি ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।

আরও পড়ুন

বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক আফসার আলী বলেন, ১৯৮৪ সালে তৎকালীন এরশাদ সরকারের আমলে জেলখানাটি নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু চালু না হওয়ায় এটি আজ পরিত্যক্ত। মূল স্থাপনার ঐতিহাসিক কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে ভেতরে শিশু বিনোদন কেন্দ্র গড়ে তোলা হলে এটি যেমন ইতিহাসের স্মারক হিসেবে সংরক্ষিত থাকবে, তেমনি শিশুদের বিনোদনের নতুন ঠিকানাও হবে। এছাড়া এখানে একটি কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ করা হলে কৃষকরাও সরাসরি উপকৃত হবেন।

উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোছা. কনিকা খাতুন বলেন, ২০০৩ সালে গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে স্থাপনাটি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে হস্তান্তর করা হয়। এরপর থেকে উপজেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের পক্ষ থেকে পরিত্যক্ত জেলখানা, মাঠ ও পুকুরটি জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহারের চেষ্টা চলছে। মন্ত্রণালয়ের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পেলে এটি জনগণের কাজে লাগানো সম্ভব হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুরাদ হোসেন বলেন, বকশীগঞ্জের পরিত্যক্ত উপ-কারাগারটি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে রয়েছে। এটিকে জনগণের সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ চলছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে পরিত্যক্ত উপ-কারাগারটিকে জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা গেলে একদিকে রক্ষা পাবে কোটি টাকার সরকারি সম্পদ, অন্যদিকে বকশীগঞ্জবাসী পাবে একটি যুগোপযোগী ও প্রয়োজনীয় সেবাকেন্দ্র।

আরটিভি/এমএইচজে

আরটিভি খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

logo_appslogo_apps

Loading...

আরও পড়ুন

© All Rights Reserved 2016-2026 | RTV Online | It is illegal to use contents, pictures, and videos of this website without authority's permission