
ময়মনসিংহের চর ঈশ্বরদিয়া মৌজায় কেওয়াটখালী সেতুর সংযোগ সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে অধিগ্রহণ করা ২৫ শতাংশ জমির ক্ষতিপূরণের ১ কোটি ২৩ লাখ ১৪ হাজার ৫১২ টাকা ৫৯ পয়সা নিয়ে অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি রেকর্ডে জমির মালিক হিসেবে হরমুজ আলীর নাম থাকলেও তার ওয়ারিশদের অভিযোগ, নথিতে পরিবর্তন এনে ভিন্ন ব্যক্তিকে দাবিদার দেখিয়ে ক্ষতিপূরণের অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে।
এ ঘটনায় ফৌজদারি মামলা হয়েছে এবং অভিযুক্তদের মধ্যে কয়েকজন গ্রেপ্তারও হয়েছেন। তবে হাইকোর্টের ৬০ দিনের নির্দেশের পরও প্রকৃত মালিকের ওয়ারিশরা এখনো ক্ষতিপূরণের অর্থ পাননি। এতে ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ভুক্তভোগীদের দেওয়া নথি অনুযায়ী, চর ঈশ্বরদিয়া মৌজার এসএ খতিয়ান নং-২০৭, দাগ নং-২৭৯৫-এর মূল রেকর্ডীয় মালিক ছিলেন হরমুজ আলী। পরবর্তীতে বিআরএস খতিয়ান নং-৩২৮৩-এর দাগ নং-৫৩৬৮-এ ২৫ শতাংশ জমি তার নামে রেকর্ডভুক্ত হয়। জমিটির নামজারি, খারিজা খতিয়ান এবং নিয়মিত ভূমি উন্নয়ন কর পরিশোধের নথিও রয়েছে।
তাদের অভিযোগ, এলএ কেস নং-০৪/২০২২-২০২৩-এর আওতায় ২০২২ সালের ৪ ডিসেম্বর জারি করা ৪ ধারার নোটিশে হরমুজ আলীর নাম উল্লেখ থাকলেও পরবর্তী পর্যায়ে তাকে ‘অজ্ঞাত’ হিসেবে দেখানো হয়। এরপর শহিদুল ইসলাম নামে একজনকে দাবিদার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। শেষ পর্যন্ত ক্ষতিপূরণের অর্থ এমন একজনের কাছে পরিশোধ করা হয়, যার সঙ্গে জমিটির মালিকানার কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করছেন হরমুজ আলীর ওয়ারিশরা।
এদিকে ৪ ধারার নোটিশে মালিকের নাম থাকার পর কীভাবে তাকে ‘অজ্ঞাত’ দেখানো হলো? কে বা কোন কর্তৃপক্ষ এই পরিবর্তনের অনুমোদন দিয়েছে? নতুন দাবিদারকে কোন নথির ভিত্তিতে গ্রহণ করা হয়েছিল? সরকারি কোশাগার থেকে ১ কোটি ২৩ লাখ টাকার বেশি ক্ষতিপূরণ ছাড়ের আগে মালিকানা ও পরিচয় যাচাইয়ের বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না— এসব প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর এখনো মেলেনি।
এ ছাড়া ফৌজদারি মামলা হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কার্যক্রম ও দায় নির্ধারণে কোনো বিভাগীয় তদন্ত হয়েছে কি না, সেটিও স্পষ্ট নয়।
হরমুজ আলীর ওয়ারিশদের অভিযোগ, ক্ষতিপূরণের অর্থ আত্মসাতের প্রক্রিয়ায় জাল জাতীয় পরিচয়পত্র, ভুয়া কাগজপত্র ও মিথ্যা দাবিদার ব্যবহার করা হয়েছে। তাদের দাবি, প্রকৃত মালিকের আপত্তি উপেক্ষা করে অন্য ব্যক্তিকে হাজির দেখিয়ে আপত্তি নিষ্পত্তির নথি প্রস্তুত করা হয়।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, ক্ষতিপূরণের অর্থ জালিয়াতির অভিযোগে শহিদুল ইসলাম, শফিকুল ইসলাম, রুকনসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ও সার্টিফিকেট মামলা হয়েছে। অভিযুক্তদের মধ্যে শফিকুল ইসলাম ও রুকনকে গ্রেপ্তার করা হলেও বর্তমানে তারা জামিনে রয়েছেন।
অভিযুক্তদের দাবি, তারা এ ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী নন; অফিসের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে তারা প্রক্রিয়াটিতে যুক্ত হয়েছেন। তবে তাদের এ দাবির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আজিম উদ্দিন বলেন, ভূমি অধিগ্রহণের কাজটি তার যোগদানের আগেই সম্পন্ন হয়েছে। তার ভাষ্য, হরমুজ আলীর জমির একটি অংশ আগে বিক্রি হয়েছিল এবং ওয়ারিশদের অনাপত্তিপত্রের ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশোধ করা হয়। পরে জটিলতা সৃষ্টি হলে জালিয়াতির অভিযোগে অর্থ উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং অর্থ উদ্ধারের প্রক্রিয়া চলছে।
জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান বলেন, প্রকৃত মালিকের ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
স্থানীয় ভূমি বিশারদ মজিবুর রহমান মিন্টু বলেন, উপস্থাপিত নথিপত্র ও অভিযোগ সত্য হলে এটি শুধু একটি ব্যক্তিগত ক্ষতির ঘটনা নয়; বরং সরকারি ভূমি অধিগ্রহণ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন। সরকারি রেকর্ডে মালিকের নাম থাকার পরও অন্য ব্যক্তি কীভাবে ক্ষতিপূরণ পেলেন, তা নিরপেক্ষ তদন্তে উদঘাটন হওয়া প্রয়োজন। আদালতের নির্দেশ যথাসময়ে বাস্তবায়িত না হলে আইন-শাসনের প্রশ্নও সামনে আসে।
হরমুজ আলীর ওয়ারিশরা হাইকোর্টের নির্দেশ দ্রুত বাস্তবায়ন করে প্রকৃত মালিকের ক্ষতিপূরণ পরিশোধ, অধিগ্রহণের সব নথি পুনঃপর্যালোচনা, স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তারা জানান, প্রয়োজন হলে আদালত অবমাননার অভিযোগ নিয়ে আবারও হাইকোর্টের শরণাপন্ন হবেন।
আরটিভি/এমএইচজে


