
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের একলাশপুর ইউনিয়ন থেকে শরীফপুর ইউনিয়নে সাড়ে ৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন হাছানহাট সংযোগ সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাবে রডের পরিবর্তে জিআই তার দিয়ে ঢালায়ের অভিযোগ উঠেছে। শুধু তাই নয়, সেতুর রেলিংয়েও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
এরই মধ্যে পায়ের আঘাতে স্ল্যাব ভেঙে পড়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে স্ল্যাবের ভাঙা অংশে রডের পরিবর্তে জিআই তার দেখা যায়। এ নিয়ে এলাকায় ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়েছে। এ ঘটনায় বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী প্রকৌশলী আবুল মনসুর আহমেদকে বদলি করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বিকেলে নোয়াখালী এলজিইডি নির্বাহী প্রকৌশলী যুগল কৃষ্ণ মণ্ডল কৌশিক উপজেলা প্রকৌশলীকে বদলির বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
তিনি বলেন, উপজেলা প্রকৌশলীকে ঢাকা থেকে আজ বদলি করা হয়েছে। এ ছাড়া দুই কর্মকর্তাকে আমি শোকজ করা করেছি। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ত্রুটিপূর্ণ কাজ সংশোধনের নির্দেশ দিয়েছে এলজিইডি।
এলজিইডি সূত্রে জানা যায়, বেগমগঞ্জ উপজেলার একলাশপুর ইউনিয়ন টু শরীফপুর ইউনিয়ন নির্মাণাধীন সংযোগ সেতুটির দৈর্ঘ্য ৪৯ দশমিক ৬ মিটার। বিশ্বব্যাংক প্রকপ্লে আওতায় সেতুটি নির্মাণে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ কোটি ৬১ লাখ টাকা। মেসার্স হক ট্রেডার্স নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কাজটি করছে। মাঠপর্যায়ে কাজ বাস্তবায়ন করছেন ঠিকাদার মো. ফরহাদ পাটোয়ারী।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সেতু নির্মাণের শুরু থেকেই নিম্নমানের সিমেন্ট, বালু, রড, ইটের খোয়া ও পাথর ব্যবহার করা হয়েছে। ফুটপাতের স্ল্যাবে রডের পরিবর্তে জিআই তার ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাড়া সেতুর রেলিংয়েও নিম্নমানের রড ও নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা জিয়াউল হক বাবলু বলেন, একলাশপুর, শরীফপুর ও নেয়াজপুর ইউনিয়নসহ চারটি ইউনিয়নের প্রায় ২০ হাজার মানুষ প্রতিদিন সেতুটির ওপর দিয়ে যাতায়াত করবেন। শুরু থেকেই নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের বিষয়ে ঠিকাদার ও উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয়ে একাধিকবার অভিযোগ করা হলেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরে ফুটপাতের স্ল্যাব নির্মাণের পর হালকা আঘাতেই সেটি ভেঙে পড়ে। ভাঙা অংশে রডের পরিবর্তে জিআই তার দেখা যায়। নকশা ও শিডিউল অনুযায়ী রড, সিমেন্ট, বালু ও পাথর ব্যবহার করা হয়নি। উপজেলা প্রকৌশলী কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশ করে ঠিকাদার ইচ্ছেমতো কাজ করেছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. মামুন বলেন, সেতুর রেলিংয়ে নিম্নমানের মেয়াদোত্তীর্ণ সিমেন্ট ও রড ব্যবহার করা হয়েছে। নিন্মমানের সিমেন্ট ব্যবহারের কারণে হাত দিয়ে টান দিলেই রেলিং থেকে সিমেন্ট ও পাথর খসে পড়ছে। এ ধরনের কাজের কারণে সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগ উঠার পর নোয়াখালী এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী যুগল কৃষ্ণ মণ্ডল কৌশিক পৃথক তিনটি চিঠি দেন। এর মধ্যে বেগমগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী আবুল মনসুর আহমেদ ও উপসহকারী প্রকৌশলী মো. নাজমুল ইসলামকে কৈফিয়ত তলব করা হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা নির্মাণকাজ যথাযথভাবে তদারকি করেননি। এটি তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনে অবহেলা এবং সরকারি চাকরিবিধির পরিপন্থী। তাদের বিরুদ্ধে কেন প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করা হবে না, তা পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে লিখিতভাবে জানাতে বলা হয়েছে।
অন্যদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স হক ট্রেডার্সকে দেওয়া চিঠিতে নকশা ও স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী নির্মাণকাজের ত্রুটি সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আগামী সাত দিনের মধ্যে সংশোধিত কাজের বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলীর মাধ্যমে নির্বাহী প্রকৌশলীকে লিখিতভাবে জানাতে বলা হয়েছে। চিঠিতে আরও বলা হয়, কাজের গুণগত মান নিশ্চিত না করে কোনো বিল পরিশোধ করা যাবে না। একই সঙ্গে নকশা ও স্পেসিফিকেশনের বাইরে করা কোনো কাজের বিল না দিতে উপজেলা প্রকৌশলীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদার ফরহাদ পাটোয়ারী বলেন, ৫ আগস্টের পর তিনি বাবলু নামে এক ঠিকাদারের কাছ থেকে কাজটি কিনে নিয়ে বাস্তবায়ন করছেন। এটি একটি চলমান কাজ। একটি স্থানে দুটি স্ল্যাবে রডের পরিবর্তে বৈদ্যুতিক জিআই তার ব্যবহার করা হয়েছিল। বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে এলে দুপাশের পুরো স্ল্যাব ভেঙে নতুন করে নির্মাণ করে দেওয়া হয়।
নোয়াখালী এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী যুগল কৃষ্ণ মণ্ডল আরও বলেন, কয়েকটি স্ল্যাব নিম্নমানের মনে হওয়ায় সেগুলো ভেঙে নতুন করে করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত সোমবার স্ল্যাবগুলো ভাঙার সময় অতিউৎসাহী কিছু লোকজন সেখানে গিয়ে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে ভাইরাল করে।
আরটিভি/এমএম


