
কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলার রাজমাল্লীর হাট সিদ্দীকিয়া ফাজিল মাদরাসায় চার পদে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ ঘিরে উত্তেজনার এক সপ্তাহের মাথায় নতুন করে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে অবরুদ্ধ করে মারধর, হত্যার উদ্দেশ্যে গলা চেপে ধরা এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগে মাদরাসা পরিচালনা কমিটির ২সদস্য সহ ১৩ জনের নাম উল্লেখ পূ্র্বক অজ্ঞাতনামা ৩০ থেকে ৩৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ফলে গ্রেপ্তার আতঙ্কে বাড়িঘর ছেড়েছেন অনেকে।
মামলায় নিরপরাধ ব্যক্তিদেরও আসামি করার অভিযোগ তুলেছে স্থানীয়রা। ফলে রাজমাল্লীর হাট এলাকায় রাতে অনেকটা পুরুষশূন্য অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর সকালে মাদরাসায় দাপ্তরিক কাজ করছিলেন ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোখলেছুর রহমান। এ সময় শামছুদ্দিন দুলাল ও সালমান ফারসীর নেতৃত্বে ৩০ থেকে ৩৫ জন লাঠিসোঁটা নিয়ে মাদরাসায় প্রবেশ করে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করেন। একপর্যায়ে অফিস কক্ষের সিসিটিভি ফুটেজ নষ্ট ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার অভিযোগ করা হয়েছে।
এজাহারে আরও বলা হয়, নিয়োগ বাণিজ্যের ‘মিথ্যা অপবাদ’ দিয়ে অধ্যক্ষকে গালিগালাজ ও মারধর করা হয়। এতে তার চশমা ভেঙে ডান চোখে আঘাত লাগে। পরে হত্যার উদ্দেশ্যে গলা চেপে ধরে শ্বাসরোধের চেষ্টা এবং পেপার ওয়েট দিয়ে মাথায় আঘাত করার অভিযোগ রয়েছে। একপর্যায়ে ভয়ভীতি দেখিয়ে তার কাছ থেকে জোর করে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। অধ্যক্ষকে রক্ষা করতে এগিয়ে গেলে শিক্ষক মিজানুর রহমানকেও চড়-থাপ্পড় ও কিল-ঘুষি মেরে রক্তাক্ত জখম করা হয় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। পরে স্থানীয়দের সহায়তায় আহত দুজনকে উদ্ধার করে রাজারহাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়। এ ঘটনায় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোখলেছুর রহমান বাদী হয়ে ৯ অক্টোবর রাজারহাট থানায় মামলা করেন।
ঘটনার দিন সকালেই মাদরাসায় ল্যাব সহকারী, নৈশপ্রহরী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও আয়া—চারটি পদে নিয়োগের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে নিয়োগ বাণিজ্যের পাঁয়তারার অভিযোগ তুলে এলাকাবাসী মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেন। বিক্ষোভকারীরা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত ও অনিয়মের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
তবে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ অস্বীকার করে মোখলেছুর রহমান তখন জানিয়েছিলেন, এর আগেও তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগপত্র দিয়েছিলেন, কিন্তু মাদরাসা কমিটি তা গ্রহণ করেনি। এবার এলাকাবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।
একই ঘটনার বিষয়ে এখন করা মামলায় ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দাবি করেছেন, তাকে মারধর ও ভয়ভীতি দেখিয়ে জোরপূর্বক পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করানো হয়েছে। ফলে নিয়োগ নিয়ে শুরু হওয়া বিরোধ এক সপ্তাহের ব্যবধানে হামলা, মামলা ও গ্রেপ্তার আতঙ্কে নতুন মাত্রা পেয়েছে।
এলাকাবাসীর একাংশের অভিযোগ, ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন—এমন ব্যক্তিদেরও মামলায় আসামি করা হয়েছে। অজ্ঞাতনামা ৩০ থেকে ৩৫ জনকে আসামি করায় আতঙ্ক আরও বেড়েছে। অনেক পুরুষ বাড়িতে না থাকায় এলাকাটি অনেকটা পুরুষশূন্য হয়ে পড়েছে বলে তাদের দাবি।
মামলার ১নম্বর আসামী ও মাদরাসার বিদ্যুৎসাহী সদস্য শামুছুদ্দিন দুলাল বলেন, আমাকে এবং মাদরাসার অভিভাবক সদস্য মাইদুল ইসলামকে অন্যায়ভাবে সাজানো মামলায় আসামি করা হয়েছে। আমরা শান্তিপূর্ণ মানববন্ধনে অংশ করেছি কোন হামলা বা জোড় জবরদস্তিতে ছিলাম না। যা ভিডিও ফুটেজ দেখলেই প্রমাণ মিলবে। একইভাবে এলাকার নিরঅপরাধ মানুষকেও আসামি করা হয়েছে অভিযোগ করেন তিনি।
এবিষয়ে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও রাজমাল্লীরহাট ফাজিল মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মোখলেছুর রহমান ফোন রিসিভ করেননি। এমনকি রোববার তিনি মাদরাসায়ও উপস্থিত ছিলেন না।
রাজারহাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মামুনুর রশিদ বলেন, এজাহারের ভিত্তিতে দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় মামলা হয়েছে। ঘটনার সত্যতা উদঘাটনে তদন্ত চলছে। আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
আরটিভি/এমএম


