
পিরোজপুর জেলা সদর থেকে মঠবাড়িয়া উপজেলা প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। বলেশ্বর নদের কোলঘেঁষা এ উপজেলায় প্রবাসী পরিবারের সংখ্যা বেশি। এসব পরিবারের অনেক অভিভাবক দীর্ঘদিন বিদেশে থাকায় মেয়েদের দেখভালের দায়িত্ব থাকে পরিবারের অন্য সদস্যদের ওপর। তদারকি ও সচেতনতার অভাবে এসব পরিবারের কিছু কিশোরী বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে পড়ছে। সচেতনতার অভাব ও অভিভাবকদের দায়িত্বহীনতার আড়ালে এভাবে বাল্যবিবাহের উদ্বেগজনক বাস্তবতা সামনে আসছে। শুধু পৌর শহরের বিদ্যালয়গুলোতেই নয়, উপজেলার ইউনিয়ন পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও বাল্যবিবাহের প্রকোপ রয়েছে।
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কাজ করা ব্যক্তিদের মতে, পিরোজপুর জেলায় বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটে না, এমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুঁজে পাওয়া কঠিন। ষষ্ঠ শ্রেণিতে যতসংখ্যক ছাত্রী ভর্তি হয়, দশম শ্রেণিতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তাদের ৩০ থেকে ৪৮ শতাংশ শুধু বাল্যবিবাহের কারণে ঝরে পড়ে। ফলে অল্প বয়সে বিয়ের শিকার হওয়ার পাশাপাশি শিক্ষাজীবন থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে অনেক কিশোরী।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাল্যবিবাহ দেওয়া হয়েছে এমন একটি পরিবারের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভিন্ন কারণে তারা মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দিয়েছেন। কেউ দারিদ্র্য ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। কেউ আবার ‘ভালো ছেলে’ পেয়ে যাওয়ায় বিয়ে দিয়েছেন। কয়েকজন অভিভাবকের দাবি, তারা মেয়ের বিয়ে দেননি বরং ছেলে-মেয়েরা নিজেরাই পছন্দ করে বিয়ে করেছে।
আব্দুল ওহাব আলিম মহিলা মাদ্রাসার অধ্যক্ষ বেলায়েত হোসেন বলেন, সরকার এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নিলে বাল্যবিবাহের এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে। বাল্যবিবাহ নিবন্ধিত না হওয়ায় নির্যাতন বা বিবাহবিচ্ছেদের শিকার হলেও মেয়েরা আইনি প্রতিকার থেকে বঞ্চিত হয়।
বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে কাজ করা সমাজকর্মী মমতাজ আক্তার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, উপজেলার দাউদখালী ইউনিয়নে এক মাদরাসাছাত্রীর বাল্যবিবাহের আয়োজন করা হয়েছিল। মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর ও উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় তারা সেই বিয়ে বন্ধ করেন। এমনকি উপজেলার স্বনামধন্য সরকারি হাতেম আলী বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদেরও অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছে। এ রকম অনেক ঘটনা রয়েছে।
এ বিষয়ে উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা মনিকা আক্তার বলেন, মঠবাড়িয়ায় বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটে। যেসব ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়, সেগুলোর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। প্রয়োজনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয় অথবা মুচলেকা নেওয়া হয়। তবে তাদের অগোচরে বাল্যবিবাহ হলে সে বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায় না।
তিনি আরও বলেন, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বিদ্যালয়ভিত্তিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম, পরিবারভিত্তিক উঠান বৈঠক এবং কিশোর-কিশোরী ক্লাবের মাধ্যমে নিয়মিত প্রচার-প্রচারণা চালানো হচ্ছে। অনেক সময় বাল্যবিবাহ বন্ধ করে দেওয়ার পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা পার্শ্ববর্তী উপজেলায় গিয়ে সরকারি নিবন্ধন ছাড়াই বিয়ে করেন। এ কারণে উপজেলায় বাল্যবিবাহের প্রকৃত সংখ্যা নিরূপণ করা কঠিন। তবে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
আরটিভি/এমএ




