ঢাকা শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩ আশ্বিন ১৪৩৩

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প, ১ লাখ ৮০ হাজার নতুন চাকরি

আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ৩০ জুলাই ২০২৬, ১২:০৫ পিএম
আপডেট : ৩০ জুলাই ২০২৬, ১২:১৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত

তৈরি পোশাক (আরএমজি) খাতের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে রপ্তানি বহুমুখীকরণের লক্ষ্য নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ‘এক্সপোর্ট কম্পিটিটিভনেস ফর জবস (ইসিফরজে)’ প্রকল্প দেশের অন্যতম সফল শিল্পোন্নয়ন উদ্যোগে পরিণত হয়েছে। প্রকল্পটির মাধ্যমে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, পাদুকা, প্লাস্টিক এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। একই সঙ্গে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার নতুন ও শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে এবং বৈশ্বিক মূল্যশৃঙ্খলে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে।

বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার (আইডিএ) অর্থায়নে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ২০১৭ সালের জুলাইয়ে প্রকল্পটি চালু করে। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার প্রেক্ষাপটে রপ্তানি বহুমুখীকরণকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্প শুরুর সময় দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশেরও বেশি আসত তৈরি পোশাক খাত থেকে, যা অর্থনীতিকে একটি নির্দিষ্ট খাতের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল করে তুলেছিল।

এ প্রেক্ষাপটে সম্ভাবনাময় চারটি উৎপাদন খাতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা, উৎপাদনশীলতা বাড়ানো এবং নতুন রপ্তানি বাজারে প্রবেশের সক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্যেই ইসিফরজে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়।

প্রকল্প পরিচালক ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শেখ মোহাম্মদ আব্দুর রহমান বলেন, প্রকল্পটি প্রায় সব প্রধান কর্মসম্পাদন সূচকেই নির্ধারিত লক্ষ্য ছাড়িয়ে গেছে এবং দীর্ঘমেয়াদে শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য একটি টেকসই ভিত্তি তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, প্রকল্পের উদ্দেশ্য শুধু রপ্তানি বৃদ্ধি নয়, বরং বাংলাদেশি শিল্পকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। প্রকল্পের ফলাফল প্রমাণ করে, রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দিলে শিল্পখাতের রূপান্তর উল্লেখযোগ্যভাবে ত্বরান্বিত করা সম্ভব।

আব্দুর রহমান বলেন, প্রকল্পের সবচেয়ে কার্যকর উদ্যোগ ছিল ‘এক্সপোর্ট রেডিনেস ফান্ড (ইআরএফ)’। এই ম্যাচিং গ্রান্ট কর্মসূচির আওতায় নারী উদ্যোক্তাপ্রতিষ্ঠানসহ ৫৭০টি প্রতিষ্ঠান আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা পেয়েছে। এসব সহায়তার মাধ্যমে পরিবেশ, সামাজিক ও গুণগত মান (ইএসকিউ) সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণ, দক্ষতা উন্নয়ন, উৎপাদনব্যবস্থা আধুনিকায়ন, আন্তর্জাতিক সনদ অর্জন এবং নতুন বিদেশি বাজারে প্রবেশে প্রতিষ্ঠানগুলো সক্ষমতা অর্জন করেছে।

প্রকল্পের তথ্য অনুযায়ী, উপকারভোগী প্রতিষ্ঠানগুলো ২৬০টি আন্তর্জাতিক কমপ্লায়েন্স সনদ অর্জন করেছে। একই সঙ্গে ইআরএফের মাধ্যমে বেসরকারি খাত থেকে ১ কোটি ৮০ লাখ মার্কিন ডলারের বেশি সহ-অর্থায়ন (কো-ইনভেস্টমেন্ট) এসেছে, যা সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি অতিরিক্ত বেসরকারি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করেছে।

প্রকল্পের আওতাভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিক্রি ৫৯ শতাংশ বেড়েছে, যেখানে প্রকল্পের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল ১৫ দশমিক ৪ শতাংশ। একই সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠান ২২টি নতুন আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করেছে।

প্রকল্প শুরুর আগে উপকারভোগী প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রপ্তানিকারকের হার ছিল ৫৯ শতাংশ, যা বেড়ে ৯৫ শতাংশে পৌঁছেছে। একই সময়ে তাদের গড় রপ্তানির পরিমাণ বেড়েছে ১৯২ শতাংশ।

এছাড়া ৭৩টি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানকে ১৪টি আন্তর্জাতিক সোর্সিং প্রদর্শনীতে অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে নতুন ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব ও রপ্তানির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

আরও পড়ুন

শুধু আর্থিক সহায়তাই নয়, শিল্প অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা উন্নয়নেও বড় ধরনের বিনিয়োগ করেছে ইসিফরজে প্রকল্প। এর আওতায় বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্লাস্টিকস ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (বিআইপিইটি) পূর্ণাঙ্গভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং বর্তমানে শিল্পভিত্তিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

এছাড়া গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বাংলাদেশ হাইটেক সিটিতে সেন্টার অব এক্সেলেন্স ফর ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (সিইইটি) এবং গাজীপুরের কাশিমপুরে ডিজাইন অ্যান্ড টেকনোলজি সেন্টার ফর লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার (ডিটিসিএলএফ)-এর নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে।

ভবিষ্যৎ শিল্পায়নের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করতে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে বিসিক কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে প্রস্তাবিত ইনস্টিটিউট অব জেনারেল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (আইজিইটি) এবং চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে জাতীয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে (এনএসইজেড) প্রস্তাবিত ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব জেনারেল ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (আইআইজিইটি)-এর জন্য ভূমি অধিগ্রহণ ও সাইট উন্নয়নকাজও সম্পন্ন হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক বলেন, এসব প্রতিষ্ঠান রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য উন্নত প্রযুক্তিসেবা, পণ্য উন্নয়ন, পরীক্ষাগার সুবিধা এবং দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মক্ষেত্রের নিরাপত্তা এবং কমপ্লায়েন্স বিষয়ক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রকল্পটি সরাসরি ১ লাখ ৭ হাজারের বেশি মানুষকে উপকৃত করেছে। তাদের মধ্যে ৩৮ শতাংশই নারী।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, সামগ্রিকভাবে এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজার নতুন ও শোভন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে, যা প্রকল্পের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা ৬০ হাজারের প্রায় তিন গুণ।

বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নের প্রসঙ্গ তুলে ধরে আব্দুর রহমান বলেন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সরকার ও বেসরকারি খাতের সফল অংশীদারত্বের একটি উদাহরণ হিসেবে ইসিফরজে প্রকল্পকে উল্লেখ করেছে উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাটি।

বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, ২০১৬ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রকল্পের আওতাভুক্ত তৈরি পোশাকবহির্ভূত খাতগুলোর রপ্তানি প্রায় ৮৩ শতাংশ বেড়েছে, যা প্রকল্পের প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রাকে উল্লেখযোগ্যভাবে ছাড়িয়ে গেছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রকল্পটির অন্যতম উদ্ভাবনী দিক ছিল অনুদান ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি। আন্তর্জাতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত একটি স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের সংস্থা উপকারভোগী প্রতিষ্ঠান নির্বাচন, প্রকল্প বাস্তবায়ন তদারকি এবং নির্ধারিত অগ্রগতি যাচাইয়ের ভিত্তিতে অর্থ ছাড়ের কাজ পরিচালনা করেছে। এতে একদিকে জবাবদিহি নিশ্চিত হয়েছে, অন্যদিকে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগও উৎসাহিত হয়েছে।

বিশ্বব্যাংক বলেছে, আর্থিক প্রণোদনার পাশাপাশি কারিগরি সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম সমন্বিতভাবে পরিচালনা করলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমেই বৈশ্বিক মানদণ্ড পূরণে সক্ষম হয়। ইসিফরজে প্রকল্পের সাফল্য তারই প্রমাণ।

আরটিভি/এমএ

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
জ্বালানি খাতে আরও গভীর সহযোগিতার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখেছে বাংলাদেশ-তুরস্ক
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) ঢাকায় প্রাপ্ত এক বার্তায় জানানো হয়েছে, গত সোমবার তুরস্কের জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদ মন্ত্রণালয়ে সে দেশের মন্ত্রী আলপারস্লান বায়রাকতার এবং তুরস্কে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এম আমানুল হকের মধ্যে অনুষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে সহযোগিতার এসব ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনা হয়।
জ্বালানি খাতে আরও গভীর সহযোগিতার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখেছে বাংলাদেশ-তুরস্ক
জ্বালানি সংকটে দুই মাসে কোনো পোশাক কারখানা বন্ধ হয়নি: বিজিএমইএ
জ্বালানি সংকটের কারণে গত দুই মাসে পোশাক কারখানাগুলোর উৎপাদন ব্যাহত হলেও কোনো কারখানা বন্ধ হয়নি বলে জানিয়েছেন তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান। গত সাত দিনের তুলনায় বর্তমানে কারখানাগুলোয় গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলেও জানান তিনি।
জ্বালানি সংকটে দুই মাসে কোনো পোশাক কারখানা বন্ধ হয়নি: বিজিএমইএ
বন্ধ শিল্পের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ স্কিম চালু
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-১ থেকে এ-সংক্রান্ত একটি সার্কুলার জারি করা হয়েছে।
বন্ধ শিল্পের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ স্কিম চালু
বাটেক্সপো ২০২৬ দিয়ে বিশ্ববাজারে নতুনভাবে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ব্র্যান্ডিং: বিজিএমইএ
বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পকে আধুনিক, উদ্ভাবননির্ভর ও টেকসই শিল্প হিসেবে তুলে ধরতে দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি বিরতির পর আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ‘বাটেক্সপো ২০২৬’।
বাটেক্সপো ২০২৬ দিয়ে বিশ্ববাজারে নতুনভাবে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ব্র্যান্ডিং: বিজিএমইএ
জ্বালানি নিরাপত্তায় আরও দুটি এফএসআরইউ ও উপকূলীয় গ্যাস অনুসন্ধানের দাবি বিজিএমইএ’র
শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে আরও দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ স্থাপন, স্থলভিত্তিক এলএনজি সংরক্ষণাগার নির্মাণ এবং উপকূলীয় গ্যাস অনুসন্ধান দ্রুত জোরদারের দাবি জানিয়েছে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ।
জ্বালানি নিরাপত্তায় আরও দুটি এফএসআরইউ ও উপকূলীয় গ্যাস অনুসন্ধানের দাবি বিজিএমইএ’র
আরও পড়ুন
আগস্টে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে রেকর্ড
পোশাক খাতের সংকট নিরসনে সর্বোচ্চ চেষ্টার আশ্বাস রাষ্ট্রপতির
হিমায়িত খাদ্য রপ্তানিতে ৭ শতাংশ সুদে মিলবে ঋণ
এবার অস্ত্র রপ্তানি বাড়াতে বড় প্রস্তুতি নিচ্ছে পাকিস্তান