
আওয়ামী শাসনামলে সাড়ে ১৪ বছর আগে ঢাকা থেকে কুষ্টিয়া ফেরার পথে গুমের শিকার হয়েছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) দুই শিক্ষার্থী আল-মুকাদ্দাস ও মো. ওয়ালীউল্লাহ। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর গুম হওয়া দুই শিক্ষার্থীর ফেরারও আশা করেছিল তাদের পরিবার। কিন্তু এখনও না ফেরায় অপেক্ষার প্রহর গুনছেন তাদের বৃদ্ধ বাবা-মা। রাষ্ট্রের কাছে সন্তানদের সন্ধান ও ঘটনার বিচার চেয়ে অপেক্ষায় রয়েছেন স্বজনরাও।
ক্যাম্পাস সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় যান আল-মুকাদ্দাস। পরে ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে তিনি ও তার বন্ধু মো. ওয়ালীউল্লাহ রাজধানীর কল্যাণপুর থেকে হানিফ পরিবহনের একটি বাসে (নম্বর-৩৭৫০) ওঠেন। বাসটি রাত সাড়ে ১১টার দিকে কল্যাণপুর থেকে ছেড়ে রাত ১টার দিকে সাভারের নবীনগর এলাকায় পৌঁছায়। সেখানে র্যাব-৪-এর একটি কালো গাড়ি বাসটির গতিরোধ করে। র্যাবের পোশাক পরিহিত ৮-১০ জন এবং সাদা পোশাকধারী কয়েকজন ব্যক্তি বাসে উঠে র্যাব ও ডিবি পরিচয়ে মুকাদ্দাস ও ওয়ালীউল্লাহকে নামিয়ে নিয়ে যান। এরপর থেকে তাদের আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
এ ঘটনায় ৬ ফেব্রুয়ারি মুকাদ্দাসের চাচা আবদুল হাই রাজধানীর দারুস সালাম থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। ওয়ালীউল্লাহর নিখোঁজের ঘটনায় ৮ ফেব্রুয়ারি তার বড় ভাই খালেদ সাইফুল্লাহ আশুলিয়া থানায় জিডি করেন। পরে নিখোঁজ দুই শিক্ষার্থীর পরিবার পুলিশ, র্যাবসহ প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তার কাছে যোগাযোগ করেও তাদের সন্ধান না পেয়ে হাইকোর্টে পৃথক দুটি রিট পিটিশন করেন। পরবর্তীতে রিট দুটিও খারিজ হয়ে যায়।
রাজনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, আল-মুকাদ্দাস ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আল-ফিকহ বিভাগের অনার্স চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী এবং বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সাংস্কৃতিক সম্পাদক। তার বাড়ি পিরোজপুর সদর উপজেলার খানাকুনিয়ারী গ্রামে। বাবা মাওলানা আবদুল হালিম ও মা আয়শা সিদ্দিকার তিন সন্তানের মধ্যে জ্যেষ্ঠ ছিলেন তিনি। তার একমাত্র বোন তাজরিয়ান এবং ছোট ভাই মুকাররম হোসাইন জারি।
অন্যদিকে, মো. ওয়ালিউল্লাহ ছিলেন ইবির দাওয়াহ অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী এবং শাখা ছাত্রশিবিরের অর্থ সম্পাদক। ঝালকাঠির কাঁঠালিয়া উপজেলার পশ্চিম শৌলজালিয়া গ্রামের বাসিন্দা ওয়ালীউল্লাহ ছিলেন সাত ভাই-বোনের মধ্যে পঞ্চম।
এদিকে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে গত বছরের সেপ্টেম্বরে আল-মুকাদ্দাস ও মো. ওয়ালীউল্লাহর নিখোঁজের ঘটনা তদন্তে একটি ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কমিটিতে ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল হান্নানকে আহ্বায়ক এবং পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেনকে সদস্যসচিব করা হয়। কমিটির আহ্বায়ক অন্যান্য সদস্যের অসহযোগিতায় পদত্যাগ করেন। এরপর প্রায় এক বছরে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কমিটি পুনর্গঠন বা নতুন কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় তদন্ত কার্যক্রম থমকে গেছে।
মো. ওয়ালীউল্লাহর বড় ভাই খালিদ সাইফুল্লাহ বলেন, এসব নিয়ে কথা বলতে বলতে আর লিখতে লিখতে আমরা ক্লান্ত। সরকারের কাছে প্রত্যাশা করলেও তো কিছু পাব না। আপনার কী মনে হয়, সরকার আসলে এসব ঘটনার বিচার করতে পারবে? এই ঘটনার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জড়িত। সেখানে যারা এখনো কর্মরত, তারা কি তাদেরই বিচার করবে?
আল-মুকাদ্দাসের ছোট ভাই মুকাররম হোসাইন জারির বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটি করলেও আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। গুম কমিশন বা রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও যোগাযোগ করা হয়নি। এ বিষয়ে ছাত্রশিবির গুম কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে আমি সেখানে উপস্থিত ছিলাম। তৎকালীন চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামের পরামর্শে আশুলিয়া একটি থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেছি। সেটি বর্তমানে চলমান রয়েছে। কিন্তু সরকার পরিবর্তনের পর বর্তমানে এ বিষয়ে আর তেমন কোনো আলোচনা হচ্ছে না।
দুই পরিবারের বাবা-মা এখনও অপেক্ষায় আছেন। সন্তান জীবিত না মারা গেছে, তাও নিশ্চিত নন পরিবার।
শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি ইউসুব আলী বলেন, দুইজনের প্রজ্ঞা, নেতৃত্ব ও মানবিক গুণাবলির কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণ এবং পার্শ্ববর্তী সাধারণ মানুষের হৃদয়ে অতি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। আদর্শিক ও গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে তাদেরকে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে ২০১২ সালে তৎকালীন স্বৈরাচারী খুনি শেখ হাসিনা সরকার, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু নীতিভ্রষ্ট শিক্ষক-কর্মকর্তা এবং ছাত্রলীগের প্রত্যক্ষ সহায়তায় এই দুই মেধাবী ছাত্রনেতাকে গুম করে।
তিনি আরও বলেন, আজ বিপ্লব-উত্তর বাংলাদেশে দাঁড়িয়েও আমরা আমাদের এই প্রিয় ভাইদের কোনো সন্ধান পাইনি। এটি শুধু রাষ্ট্রের নয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনেরও চরম ব্যর্থতা ও উদাসীনতার বহিঃপ্রকাশ। যেসব শিক্ষক ও কর্মকর্তা এই বর্বরোচিত গুমের পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তারা এখনো স্বপদে বহাল আছেন, যা শহীদ ও গুম হওয়া পরিবারের সঙ্গে এক চরম নির্লজ্জতা ও তামাশার শামিল। আজও মুকাদ্দাস ও ওয়ালিউল্লাহ ভাইয়ের বৃদ্ধ ও অসুস্থ বাবা-মা পথ চেয়ে বসে আছেন—মৃত্যুর আগে অন্তত একবার হলেও আদরের সন্তানের মুখটি দেখার আশায়।
আরটিভি/টিআর


