
দেশে প্রকৌশল শিক্ষার অন্যতম বাতিঘর উত্তরবঙ্গের বুকে দাঁড়িয়ে থাকা রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষক সংকট কাটানো, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, গবেষণার সক্ষমতা, শিক্ষার্থী বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত এবং একাডেমিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এগোচ্ছে সবুজ বৃক্ষরাজি ঘেরা ১৫২ একরের এই প্রতিষ্ঠানটি।
১৯৯৯ সালে এই রুয়েটে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুর রাজ্জাক। এরপর একাধারে সহকারী অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। সবশেষ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি।
সম্প্রতি তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আরটিভির রুয়েট সংবাদদাতা তৌফিক আহমেদ। এই সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুর রাজ্জাকের দায়িত্ব গ্রহণের প্রায় ১ বছর ১১ মাসে রুয়েটের সংকট, সম্ভাবনা, পরিকল্পনা ও প্রত্যাশার নানামুখী দিক। এ সময় শিক্ষার্থীদের মতামতকে প্রাধান্য দিয়ে রুয়েটে একটি শিক্ষাবান্ধব ও সুস্থ পরিবেশ গড়ে তোলার প্রত্যয়ও ব্যক্ত করেন তিনি।
দায়িত্ব নেওয়ার পর কার্যকরী ওয়ার্ক টিম, অবকাঠামোগত স্থবিরতা, চলমান প্রকল্পে অর্থসংক্রান্ত জটিলতাসহ বেশ কিছু বিষয়কে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেন ড. এস এম আব্দুর রাজ্জাক। তিনি জানান, বিগত প্রশাসনে রুয়েটের বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ না হওয়ায় ২০১৭-২০২৪ সালে প্রায় ১৬৫ কোটি টাকা অব্যবহৃত অবস্থায় ফেরত যায়। এ কারণে প্রকল্পের অর্থায়ন নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। তবে এ অর্থ ছাড়ের জন্য প্রকল্প সংশোধনের আবেদন করা হয়েছে। অনুমোদন পাওয়া গেলে কাজ গুলো দ্রুত শেষ করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক কাজ পরিচালনায় ক্রিয়াশীল ওয়ার্ক টিম তৈরি করা প্রধান চ্যালেঞ্জ মনে হয়েছে। কাজের পরিধির সঙ্গে সেটাও অনেকটাই গঠন করা গেছে।
শিক্ষক সংকটের বিষয়ে উপাচার্য বলেন, রুয়েটে শিক্ষক সংকট আছে এটা সত্য। তবে, আমার দায়িত্ব গ্রহণের সময় শিক্ষক ছিলেন ৩০০ জনের মতো। গত দেড় বছরে তিন ধাপে ১২০ জন প্রভাষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক সংখ্যা ৪৩০-এর বেশি। বুয়েট ও কুয়েটের তুলনায় শিক্ষক এখনও কম থাকলেও ধারাবাহিকভাবে এ ঘাটতি পূরণের চেষ্টা চলছে।
আবাসন ও অবকাঠামোগত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রুয়েটে চলমান প্রকল্পের কাজ এ বছর ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করে নতুন ৪টি হল নির্ধারিত সময়ের আগেই চালু করা সম্ভব হয়েছে। এরই মধ্যে নারী শিক্ষার্থীদের শতভাগ আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করেছে বর্তমান প্রশাসন। লিফটসহ কিছু সাময়িক সমস্যা আছে, প্রকল্প শেষ হলে এসব সমস্যার সমাধান হবে বলে আশা করা যায়।
গবেষণা ও উদ্ভাবনে শিক্ষার্থীদের মেধা ও সৃজনশীলতাকে রুয়েটের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হিসেবে দেখেন উপাচার্য। তিনি জানান, সীমিত বাজেটের মাঝেও গবেষণা কার্যক্রম বাড়াতে শিক্ষক ও গবেষকদের বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। যার অর্থে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
রুয়েটকে শক্তিশালী একাডেমিক ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ, গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধি, ল্যাব ও শ্রেণিকক্ষের সুযোগ-সুবিধা উন্নয়ন এবং শিক্ষার্থী বান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার কাজ ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যেতে চাই।
ড. এস এম আব্দুর রাজ্জাক বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়কে আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে অন্তর্ভুক্ত করা এবং তা ধরে রাখা আমাদের অন্যতম দায়িত্ব। র্যাঙ্কিংয়ের এসব সূচকে উন্নতির সাথে একাডেমিক সুনাম ও আমাদের ভবিষ্যত প্রকৌশলীদের মূল্যায়নের গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে শিক্ষার্থীদের কোডিং ব্যবস্থার দাবির প্রসঙ্গে তিনি জানান, এটি বাস্তবায়নের চেষ্টা চলমান রয়েছে। কোথাও সমস্যা থাকলে ডিনদের সঙ্গে আলোচনা করে তা সমাধান করা হবে।
উপাচার্য বলেন, এখনকার পরীক্ষা ব্যবস্থায় খাতা দেখা, প্রশ্ন প্রণয়ন ও মডারেশনে একাধিক পর্যায়ের শিক্ষক যুক্ত থাকেন। একটি কোর্সে একজন শিক্ষক এককভাবে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন না। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জন্য পরীক্ষার খাতা পর্যালোচনার ব্যবস্থাও চালু করা হয়েছে। তাই কোনো শিক্ষার্থী প্রাপ্য নম্বরের চেয়ে কম পেয়েছে মনে হলে তা দেখার সুযোগ পাবে। ফলে নির্ধারিত কারো খাতা অবমূল্যায়নের সুযোগ অনেকাংশেই নেই।
একইসঙ্গে বিগত প্রশাসনে একাডেমিক অস্থিরতা ও সেশনজটের যে বিষয় গুলো ছিল, সেখানে কাজ চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, একাডেমিক কার্যক্রমে স্থিতিশীলতা ধরে রেখে প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক অগ্রগতি বজায় রাখাই এখন প্রধান লক্ষ্য।
ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে প্রশাসনের অবস্থান প্রসঙ্গে উপাচার্য বলেন, ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মতামতকে আমরা প্রাধান্য দিতে চাই। একটি শিক্ষাবান্ধব ও সুস্থ পরিবেশ গড়তে চাই, যেখানে সবাই নিজের কথা বলতে পারবে এবং মতের পার্থক্য থাকলেও পরস্পরের প্রতি সম্মান বজায় থাকবে।
তিনি বলেন, ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ থাকলে তা প্রকাশ্যে বা গোপনে—উভয়ভাবেই নিষিদ্ধ। তবে, বিশ্ববিদ্যালয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বা গোয়েন্দা সংস্থা নয়; তাই কোনো কার্যক্রম গোপনে হচ্ছে কি না, তা শনাক্ত করতেও শিক্ষার্থীদের সহযোগিতা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে রাজনীতি না চাইলে প্রশাসন তাদের মতামতকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করবে।
এ সময় সরকারের কাছে শিক্ষাখাতে দেশের বাজেট বাড়ানোর প্রত্যাশা ব্যক্ত করে ড. এস এম আব্দুর রাজ্জাক বলেন, একটা দেশের জিডিপির ৫ শতাংশ শিক্ষাখাতে রাখা স্ট্যান্ডার্ড হিসেবে ধরা হয়। আশার কথা বর্তমান সরকার আগের তুলনায় বাজেট বাড়িয়ে ২ শতাংশে উন্নীত করেছে। বর্তমান অর্থমন্ত্রীও আগামী বছর সেটা ৩ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যে কাজ করছেন এবং সেটা ৫ শতাংশে কীভাবে নিয়ে যাওয়া যায়, সেটা সরকারের কাছে আমাদের চাওয়া। একইসঙ্গে রুয়েটের চলমান প্রকল্পে প্রয়োজনীয় বাজেট দ্রুত পাওয়া এখন সময়ের দাবি।
সব মিলিয়ে সংকট ও ঘাটতি কাটিয়ে গবেষণা, একাডেমিক কার্যক্রমে অগ্রগতি ও শিক্ষার্থী বান্ধব পরিবেশে রুয়েটকে এগিয়ে নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বর্তমান উপাচার্য অধ্যাপক ড. এস এম আব্দুর রাজ্জাক ও তার প্রশাসন।
আরটিভি/এসএইচএম



