
পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়া, প্রযুক্তির প্রতি অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং মানুষের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বাড়ানোর অন্যতম কারণ বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ডিআইইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ড. জাহিদুল ইসলাম।
শনিবার (১০ অক্টোবর) বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের HEAT প্রকল্পের উদ্যোগে আয়োজিত ‘Student Mental Well-Being in Higher Education: Awareness, Research and Professional Support’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
উপাচার্য বলেন, শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপের প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করা জরুরি। সমস্যার মূল উৎস শনাক্ত করা না গেলে শুধু মনোবিজ্ঞানী ও চিকিৎসকদের পরামর্শ দিয়ে এর স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এ জন্য ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি পরিবার, সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, আগে পরিবার, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও শিক্ষকদের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক অনেক বেশি নিবিড় ছিল। বর্তমানে এসব সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে। পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও আগের মতো যোগাযোগ ও আন্তরিকতা দেখা যায় না। তাঁর মতে, মানুষের মধ্যে এই বিচ্ছিন্নতা মানসিক চাপ ও বিভ্রান্তি বাড়াতে ভূমিকা রাখছে।
প্রযুক্তির ব্যবহার প্রসঙ্গে অধ্যাপক জাহিদুল ইসলাম বলেন, কোনো শিক্ষার্থী পড়াশোনায় সমস্যায় পড়লে আগে পরিবারের বড় সদস্য বা ভাইবোনের সহায়তা নেওয়ার সুযোগ ছিল। এখন অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকে পড়ছে। এতে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়ার পাশাপাশি তাদের মনোযোগও অন্যদিকে চলে যেতে পারে। প্রযুক্তির ব্যবহার কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সে বিষয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতায় পারিবারিক বন্ধনের গুরুত্ব তুলে ধরে উপাচার্য বলেন, বাবা-মা সন্তানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সহায়তার উৎস। পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে আরও একাকী হয়ে পড়তে পারে। তাই মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলোচনা ও চিকিৎসার পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে যোগাযোগ, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে হবে।
তিনি আরও বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ক্ষেত্রে চিকিৎসক ও মনোবিজ্ঞানীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণের পাশাপাশি সেই পরামর্শ অনুসরণ করাও জরুরি। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে তারা নিজেদের সমস্যা নিয়ে পরিবারের সদস্য, বন্ধু ও শিক্ষকদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলতে পারে।
সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন উপাচার্য। তাঁর মতে, সমাজে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও বিভাজন মানুষের মধ্যে মানসিক চাপ তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি করে। তরুণদের শিক্ষার পরিবেশে ইতিবাচক সম্পর্ক ও সহযোগিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে তারা জ্ঞান অর্জন ও নিজেদের বিকাশে মনোযোগ দিতে পারে।
শিক্ষার্থীদের বই পড়ার অভ্যাস বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। এ প্রসঙ্গে উপাচার্য জানান, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের লাইব্রেরিমুখী করতে নতুন একটি মডেল তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে ডিআইইউতেও এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।
সেমিনার আয়োজনের জন্য সিএসই বিভাগ, HEAT প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানান উপাচার্য। তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতা নিয়ে এ ধরনের আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি শিক্ষার্থী, পরিবার ও সমাজের মধ্যে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে।
অনুষ্ঠানে মূল বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শহীদ মুগ্ধ মেডিকেল সেন্টারের মনোবিজ্ঞানী মো. আবু তারেক। প্রধান অতিথি ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সচিব ড. মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।
আরটিভি/এসআর




