‘এটা আবু সাঈদ-মুগ্ধের বাংলাদেশ। এখানে কোনো ধরনের পঙ্কিলতা থাকবে না, কোনো জটিলতা থাকবে না। আমরা নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ করব’ বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সচিব ড. মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম।
শনিবার (১০ অক্টোবর) বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ডিআইইউ) কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের হিট প্রকল্পের উদ্যোগে আয়োজিত ‘উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতা: সচেতনতা, গবেষণা ও পেশাগত সহায়তা’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ইউজিসি সচিব বলেন, উচ্চশিক্ষার মান নিয়ে আলোচনায় সাধারণত অবকাঠামো, গবেষণা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অনুপাত, গবেষণাগার, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক অবস্থান ও কর্মসংস্থানের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়। তবে শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে কেমন আছে, সেটিও উচ্চশিক্ষার মানের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। মানসিক সুস্থতা না থাকলে শিক্ষার্থীদের শেখার সক্ষমতা, সৃজনশীলতা ও গবেষণার আগ্রহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
তিনি বলেন, কোনো শিক্ষার্থী উদ্বেগ, হতাশা, একাকিত্ব, অতিরিক্ত মানসিক চাপ কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগলে তার হাতে আধুনিক গবেষণাগার বা উন্নত প্রযুক্তি থাকলেও সেগুলো যথাযথভাবে কাজে লাগানো কঠিন হয়ে পড়ে। তাই মানসিক সুস্থতাকে শিক্ষার বাইরের কোনো বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মানসম্মত শিক্ষার অন্যতম ভিত্তি।
বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন ধরনের চাপের কথা উল্লেখ করে ড. মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, পরীক্ষার ফলাফল, সিজিপিএ, গবেষণা, পারিবারিক প্রত্যাশা, আবাসন সমস্যা, চাকরির অনিশ্চয়তা ও সামাজিক তুলনা শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মুঠোফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার, দীর্ঘ সময় পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকা এবং সব সময় অনলাইনে যুক্ত থাকার প্রবণতা।
মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, মানসিক চাপে থাকা দুর্বলতার পরিচয় নয়। পরামর্শদাতার কাছে গেলে কেউ মানসিকভাবে দুর্বল, এমন ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শিক্ষার্থীরা যেন সংকোচ ছাড়াই নিজেদের সমস্যা নিয়ে কথা বলতে পারে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সে পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতা মূল্যায়নে মানসিক সুস্থতা সূচক চালুর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তবে এ ধরনের উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা, সম্মতি ও নৈতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে গবেষণা ও কার্যক্রম পরিচালনার সময় এসব বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষার্থীদের জন্য পেশাগত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে ইউজিসি সচিব বলেন, আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রন্থাগার, গবেষণাগার ও তথ্যপ্রযুক্তি কেন্দ্রের পাশাপাশি শিক্ষার্থী পরামর্শকেন্দ্র এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত পরামর্শদাতা, চিকিৎসামনোবিজ্ঞানী এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সহায়তা নিশ্চিত করা দরকার। গুরুতর মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত বা আত্মহত্যার ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের দ্রুত বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানোর ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য পরামর্শকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা যাতে সহজে সরাসরি ও অনলাইনে পরামর্শ নিতে পারে, সে ব্যবস্থা থাকা জরুরি। পাশাপাশি সেবাগ্রহীতার গোপনীয়তা রক্ষা, প্রয়োজনীয় পরবর্তী যোগাযোগ এবং বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠানোর কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
শিক্ষার্থীদের মানসিক সুস্থতায় বন্ধুদের পারস্পরিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, অনেক শিক্ষার্থী পরিবারের সদস্য বা শিক্ষকের কাছে নিজের সমস্যার কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। তারা প্রথমে বন্ধুর কাছে মনের কথা বলতে পারে। তাই ক্যাম্পাসে এমন পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কেউ অন্যকে উপহাস করবে না; বরং বিপদে পড়লে একে অন্যকে সহযোগিতা করবে। সহমর্মিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, অন্তর্ভুক্তি ও বন্ধুত্বের সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন।
পরিবারের ভূমিকা তুলে ধরে ইউজিসি সচিব বলেন, সন্তানের কাছ থেকে ভালো ফলাফল প্রত্যাশা করা স্বাভাবিক। তবে সেই প্রত্যাশা যেন তার ওপর অসহনীয় চাপ তৈরি না করে। একজন শিক্ষার্থীর মূল্য শুধু তার সিজিপিএ দিয়ে নির্ধারিত হয় না। তাকে ভালো ফল করার পাশাপাশি ভালো থাকার গুরুত্বও বোঝাতে হবে।
মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সময় ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগের দক্ষতা ও আবেগ নিয়ন্ত্রণের মতো বিষয়গুলো শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিকশিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানো এবং শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন।
মাদকাসক্তির বিষয়ে সতর্ক করে তিনি বলেন, মাদকের ভয়াবহতা থেকে শিক্ষার্থীদের দূরে রাখতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধ চর্চা এবং দায়িত্বশীল জীবনযাপনে উৎসাহিত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
ড. মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির এ প্রকল্পের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ রয়েছে। প্রকল্পটির সফলতা নির্ভর করবে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা এর কার্যক্রম থেকে কতটা উপকৃত হচ্ছেন এবং মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে তাঁদের সচেতনতা কতটা বাড়ছে, তার ওপর।
তিনি আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন উচ্চশিক্ষায় গবেষণা ও উদ্ভাবনের বিভিন্ন উদ্যোগে সহযোগিতা করছে। ভবিষ্যতে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এ ধরনের আরও প্রকল্প গ্রহণ করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে নতুন বাংলাদেশ গঠনে তরুণদের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে ইউজিসি সচিব বলেন, ‘এটা আবু সাঈদের বাংলাদেশ, এটা মুগ্ধের বাংলাদেশ। এখানে কোনো ধরনের পঙ্কিলতা থাকবে না, কোনো জটিলতা থাকবে না। আমরা নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ করব।’ মাদকমুক্ত, উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে মূল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন শহীদ মুগ্ধ চিকিৎসাকেন্দ্রের মনোবিজ্ঞানী মো. আবু তারেক। সেমিনারে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।
আরটিভি/এসআর