
গত তিন মাসে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনটি রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব সংঘর্ষে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন প্রায় ৯ জন শিক্ষার্থী। পরপর তিনটি সংঘর্ষের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও প্রক্টরিয়াল বডির ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
প্রথম সংঘর্ষ: ছাত্রদলের দুই পক্ষের মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষ
মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের দুই পক্ষের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলে বহিষ্কৃত ছাত্রলীগ নেতার অন্তর্ভুক্তিকে কেন্দ্র করে এ সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ ঘটনায় রাত ১২টার দিকে বিদ্রোহী হলের সামনে সিনিয়র ও জুনিয়রদের মধ্যে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে হাতাহাতি ও সংঘর্ষ হয়। প্রথম দফার সংঘর্ষে আহত হয়ে শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক শাহজালাল আহমেদ জনি হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা নেন।
এর কয়েক ঘণ্টা পর বুধবার (২৯ জুলাই) সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের অগ্নিবীণা হলের ডাইনিংয়ে দ্বিতীয় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, অগ্নিবীণা হলের ডাইনিংয়ে খাবার খাওয়ার সময় ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের শিক্ষার্থী ও ছাত্রদলকর্মী রিজওয়ানুল করিম রাব্বী ছাত্রদলের এক পক্ষের হামলার শিকার হন। পরে আহত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ফুটেজে হামলাকারীদের হাতে লাঠি ও লোহার রড দেখা যায়।
এ হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের দুই পক্ষের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর উভয় পক্ষ আবারও অগ্নিবীণা ও বিদ্রোহী হলের সামনে মুখোমুখি হলে তৃতীয় দফায় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।
জানা গেছে, রিজওয়ানুল করিম রাব্বী আগে ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাকে তিন বছরের জন্য বহিষ্কার করে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ছাত্রলীগের পরিচয় পরিবর্তন করে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
দ্বিতীয় সংঘর্ষ: ছাত্রদলের দুই পক্ষের মধ্যে ফের সংঘর্ষ
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের দুই পক্ষের মধ্যে আবারও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। শাখার আহ্বায়ক হাবিবুর রহমান হাবিব ও সদস্যসচিব মামুন সরকারের অনুসারীদের মধ্যে এ সংঘর্ষ হয়। এতে গুরুতর আহত হন নাট্যকলা ও পরিবেশনা বিদ্যা বিভাগের ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী তানজীম লাবিব।
রাতে অগ্নিবীণা হলের সামনে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় লাবিব মাথায় আঘাত পেয়ে গুরুতর আহত হলে তাকে ত্রিশাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। তার মাথায় ছয়টি সেলাই দিতে হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও একাধিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ভবনের সামনে এ ঘটনার সূত্রপাত হয়। সেখানে প্রকাশ্যে গাঁজা সেবনের বিষয়টি নিয়ে সদস্যসচিবের অনুসারী রাশেদুল হাসান রাতুল চারুকলা বিভাগের দুই শিক্ষার্থীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। পরে তাদের মধ্যে বাক্বিতণ্ডা হয়। চারুকলা বিভাগের ওই শিক্ষার্থীরা আহ্বায়ক হাবিবের অনুসারী বলে জানা গেছে।
এরপর আহ্বায়ক হাবিবের একটি মিছিলে এ ঘটনার জের ধরে রাতুল ও সদস্যসচিবের অন্য অনুসারীদের মধ্যে আবারও বাক্বিতণ্ডা ও ধস্তাধস্তি হয়।
এ ঘটনার সময় সদস্যসচিব মামুন সরকারকে নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগে যুগ্ম আহ্বায়ক ইনানকে বিদ্রোহী হল থেকে অগ্নিবীণা হলের সামনে নিয়ে আসেন সদস্যসচিব ও তার অনুসারীরা। পরে অগ্নিবীণা হলের সামনে আহ্বায়ক হাবিবের অনুসারীরা উপস্থিত হলে দুই পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি থেকে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এ সংঘর্ষে উসকানি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে শাখা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক শাহাবুল আলম ও সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী মহিউদ্দিনের বিরুদ্ধে।
সংঘর্ষের পর এক পক্ষ অগ্নিবীণা হলে এবং অন্য পক্ষ বিদ্রোহী হলে অবস্থান নেয়। এ সময় পুরো ক্যাম্পাসে থমথমে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পরে প্রক্টরিয়াল বডির উপস্থিতিতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।
তৃতীয় সংঘর্ষ: এনপিএল টুর্নামেন্টকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, আহত ছয়
বুধবার (১৪ অক্টোবর) নজরুল প্রিমিয়ার লিগ (এনপিএল) টুর্নামেন্ট চলাকালে অন্য পক্ষের খেলার বল সীমানার ভেতরে চলে যাওয়াকে কেন্দ্র করে কয়েক দফায় সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। এতে ছয় শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হন। তাদের হাসপাতালে নেওয়া হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে এনপিএল টুর্নামেন্ট চলাকালে এ ঘটনার সূত্রপাত হয়। পরে খেলার মাঠ, অগ্নিবীণা হলের সামনে, কলা ভবনের সামনে ও পেছনে চার দফায় সংঘর্ষ হয়। আহত ছয় শিক্ষার্থীর মধ্যে চারজনকে গুরুতর অবস্থায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরে আরও দুজনকে সেখানে নেওয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, এনপিএল চলাকালে খেলার মাঠের বাউন্ডারির ভেতরে বল চলে যাওয়াকে কেন্দ্র করে টুর্নামেন্টের আয়োজক ও বাউন্ডারির কাছে ফুটবল খেলতে থাকা শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রথমে বাক্বিতণ্ডা ও গালিগালাজ হয়। খেলা শেষ হওয়ার পর বিরোধ মীমাংসার জন্য দুই পক্ষ একত্র হলে আবারও বাক্বিতণ্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে হাতাহাতি হয়। এ সময় ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের ১৬ ব্যাচের শুভকে ২০ ব্যাচের এক শিক্ষার্থী চড় মারেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ উঠেছে, এর প্রতিশোধ নিতে অগ্নিবীণা হল ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ ভবনের সামনে এনপিএল আয়োজক কমিটির সদস্য সিফাত, নাসিম ও আরেক খেলোয়াড়কে লাঠিসোঁটা দিয়ে মারধর করেন মাঠে ফুটবল খেলতে আসা ইংরেজি এবং লোকপ্রশাসন ও সরকার পরিচালনা বিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থীরা। পরে হামলাকারীরা কলা ভবনের সামনে অবস্থান নেন।
পরে ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী ও আয়োজক কমিটির সদস্য সিফাতের নেতৃত্বে প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থী কলা ভবনের সামনে গেলে প্রক্টরের উপস্থিতিতেই দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। এ সময় কলা ভবনের সামনে অবস্থানরত ইংরেজি এবং লোকপ্রশাসন ও সরকার পরিচালনা বিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থীদের একটি পক্ষ সেখান থেকে সরে যায়।
পরে তাদের খুঁজতে গিয়ে কলা ভবনের পেছনে তিনজনকে পেয়ে রড ও স্টাম্প দিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এ সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মাহবুবুর রহমান ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে তার সঙ্গেও ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ সময় মারধরের ভিডিও ধারণ করতে গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের আরটিভির প্রতিনিধি আবু তাহেরের ওপরও চড়াও হন শিক্ষার্থীরা। অভিযোগ রয়েছে, এ সময় তার মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে জোরপূর্বক ভিডিও মুছে ফেলা হয়, তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয় এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়।
পরে আহত ইংরেজি, লোকপ্রশাসন ও চারুকলা বিভাগের শিক্ষার্থী রবিউল, সাকিব, রাফি ও রোমানকে ত্রিশাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে তাদের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। অন্য পক্ষের দিদারুল ইসলাম আঘাত পেয়ে ত্রিশাল মেডিকেল সেন্টারে ভর্তি হন। আর সিফাত ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হন বলে জানা গেছে।
সংঘর্ষ এড়াতে যা বলছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন
সংঘর্ষ এড়ানোর বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. আশরাফুল আলম বলেন, সিনিয়র-জুনিয়রদের মধ্যে সংঘর্ষ এড়াতে প্রথমে বিভাগগুলোকে দায়িত্ব নিতে হবে। বিভাগের শিক্ষকদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিং করা হলে তা বেশি কার্যকর হবে। কারণ, শিক্ষার্থীরা বিভাগের শিক্ষকদের নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং শিক্ষকদের প্রতি তাদের যথেষ্ট সম্মান রয়েছে।
তিনি বলেন, শিক্ষকেরা নিয়মিত কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সচেতন করবেন, যাতে তারা কোনো ধরনের সংঘর্ষে না জড়ান। সিনিয়ররা যেন জুনিয়রদের স্নেহ করেন এবং জুনিয়ররা যেন সিনিয়রদের সম্মান করেন। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের সচেতন করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তর রয়েছে।
আরটিভি/টিআর




