
দুই বছর আগে শিক্ষার্থীদের ১৭ দফা আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি (বিএমইউ)। ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর উত্থাপিত এসব দাবির মধ্যে অন্যতম প্রধান ও রাজপথের মূল দাবি ছিল চট্টগ্রামের হামিদচরে নির্মাণাধীন ১০৬.৬৬ একরের স্থায়ী ক্যাম্পাসে দ্রুত স্থানান্তর।
এর পাশাপাশি সেমিস্টার ও ক্রেডিট ফি যৌক্তিককরণ, শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষ সংকট নিরসন, পরীক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মেরিটাইম খাতে গ্র্যাজুয়েটদের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ছিল। তবে দুই বছর পেরিয়ে গেলেও অধিকাংশ মৌলিক দাবি পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়ায় ক্ষোভ ও সংশয় বিরাজ করছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে।
২০২৪ সালের ৪ মার্চ চট্টগ্রামের হামিদচরে স্থায়ী ক্যাম্পাস নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়। প্রথম ধাপে একাডেমিক ও প্রশাসনিক অবকাঠামো নির্মাণের নির্ধারিত সময়সীমা ছিল ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত। তবে নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও এখনও মিরপুর-১২-এর অস্থায়ী ক্যাম্পাসে পাঠদান চালিয় যেতে বাধ্য হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়টি।
শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ অপেক্ষার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানিয়েছে, চলতি বছরের ডিসেম্বর বা আগামী বছরের জানুয়ারির মধ্যে স্থানান্তরের একটি প্রস্তুতিমূলক পরিকল্পনা রয়েছে। সম্প্রতি শিক্ষার্থীদের স্মারকলিপি প্রদানের পর রেজিস্ট্রার কমডোর এস এম শরিফ-উল ইসলাম এই আশ্বাসের কথা জানান।
শিক্ষক সংকট ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা
অস্থায়ী ক্যাম্পাসে এখনও তীব্র শ্রেণিকক্ষ ও শিক্ষক সংকট রয়ে গেছে। পোর্ট অ্যান্ড শিপিং ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ফাইনাল ইয়ারের শিক্ষার্থী সিদরাতুল মুনতাহার রাফি বলেন, ওরিয়েন্টেশনে দ্রুত স্থায়ী ক্যাম্পাসে নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল, কিন্তু ফাইনাল ইয়ার শেষ হতে চললেও সেই ১০৬ একরের দেখা মিলল না। শিক্ষক সংকটের কারণে আমাদের এখনও এক্সটার্নাল ফ্যাকাল্টির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এছাড়া কারিকুলাম আধুনিকায়ন ও স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগের দাবিতে ধীরগতি রয়েছে বলেও অভিযোগ শিক্ষার্থীদের।
নাম পরিবর্তনসহ কিছু দাবিতে অগ্রগতি
আন্দোলনের ফলে ১৭ দফার কিছু দাবি আলোর মুখ দেখেছে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তন করে 'বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটি' করা হয় এবং একই সঙ্গে সংশোধিত ফি কাঠামো ও হলের ফি সংক্রান্ত কিছু সিদ্ধান্ত আনা হয়। তবে শিক্ষার্থীদের মতে, ফি পুরোপুরি যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা এবং পর্যাপ্ত আবাসিক সুবিধার সুরাহা এখনও হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, রেজিস্ট্রার ও ডিন পর্যায়ে ঘন ঘন রদবদলকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বড় বাধা হিসেবে দেখছেন শিক্ষার্থীরা।
মেরিটাইম ল’ অ্যান্ড পলিসি বিভাগের শিক্ষার্থী সানজিম সাজিদ জীম ও মেরিন ফিশারিজ বিভাগের আবদুল মালেক জানান, তারা কোনো প্রশাসনের বিরুদ্ধে ছিলেন না; বরং শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক পরিবেশ চেয়েছিলেন। প্রতিশ্রুতি নয়, তারা বাস্তব পরিবর্তন দেখতে চান।
অন্যদিকে, ১৭ দফায় অন্তর্ভুক্ত ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার স্বাধীনতা প্রসঙ্গে বিএমইউ সাংবাদিক সমিতির সভাপতি শাহানুর রহমান মুকুট বলেন, স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ এখনও পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির স্বার্থে প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা তুলে ধরার মুক্ত সুযোগ থাকা প্রয়োজন।
আধা-বাস্তবায়িত প্রতিশ্রুতি আর ঘনঘন প্রশাসনিক রদবদলের মাঝে দাঁড়িয়ে মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দৃষ্টি এখন চট্টগ্রামের হামিদচরের দিকে—কবে শেষ হবে এই দীর্ঘ প্রহর আর কবে শুরু হবে স্বপ্নের স্থায়ী ক্যাম্পাসে যাত্রা।
আরটিভি/এসআর/টিআর


