
মা-বাবা না থাকলে, ভাইবোনের সম্পর্কের বাঁধন যেন আলগা হয়ে যায়। মা-বাবার টানেই উৎসবে বা অকারণেও একসঙ্গে হওয়া হতো। বাবা–মা না থাকলে তখন যেন যোগাযোগেও দূরত্ব চলে আসে।
এ বিষয়ে মনোবিজ্ঞানী শারমিন হক বলছেন, ভাইবোনের সম্পর্কের সুতা আলগা হওয়ার পেছনে কেবল সম্পত্তি নয়, রয়েছে আরও বহু কারণ। কখনো সমস্যাটা গুরুতর, আবার কখনো নিতান্তই ছোটখাটো কোনো ভুল–বোঝাবুঝি বড় আকার ধারণ করে।
ভাইবোনেরা যে যেখানেই থাকুন না কেন, মা-বাবার আহ্বানে একসঙ্গে হন। উৎসব–আয়োজনে ছুটি নিয়ে বাড়ি ফেরেন। মা-বাবাই পরিবারের কেন্দ্রে থাকার কারণে অন্যান্য সময়েও তাঁদের মাধ্যমে যোগাযোগ থাকে। কিন্তু তারা যখন থাকেন না, তখন সেই কেন্দ্রটি আর অবশিষ্ট থাকে না। মা বেঁচে থাকতে হয়তো কোনো নির্দিষ্ট দিনে সবাইকে বাড়িতে ডাকতেন ভালোমন্দ খাওয়াতে কিংবা বাবা হয়তো নাতি-নাতনিদের দেখতে চাইতেন।
মা-বাবাই যদি না থাকেন, তখন সেই আয়োজনগুলো আর হয়ে ওঠে না। ভাইবোনদের দেখাও হয় না আগের মতো। চোখের আড়ালে থাকতে থাকতে ভাইবোনেরা একসময় মনের আড়ালে চলে যেতে পারেন।
এই দূরত্বের উৎস কেবল বর্তমান পরিস্থিতিই নয়, এর শেকড় থাকতে পারে শৈশবেও। মা-বাবার বৈষম্যমূলক আচরণ ভাইবোনদের দ্বন্দ্বের উৎস হতে পারে। বড় সন্তানকে একটু বেশি আদর করা, ছোটকে অতিরিক্ত আহ্লাদ দেওয়া কিংবা পড়ালেখায় ভালো সন্তানের বাড়তি প্রশংসা এবং অন্যকে ভয়াবহ তিরস্কার—এই বিভাজন সৃষ্টি হলে তার নেতিবাচক প্রভাব দেখা যায় ভবিষ্যতে।
মা-বাবা বেঁচে থাকা অবস্থায় অনেকেই মনের এ দ্বন্দ্ব প্রকাশ করেন না। তাদের কথা ভেবে স্বাভাবিক সম্পর্ক ধরে রাখার চেষ্টা চললেও, মা-বাবা দুজনেরই মৃত্যু হলে সেই দায়টাও যেন আর থাকে না।
এছাড়াও, মা-বাবার দেখভাল বা পরিবারের আর্থিক প্রয়োজনে কোনো একজনকে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হলে তা থেকেও অশান্তি সৃষ্টি হতে পারে। ভাইবোনেরা কে কী ভূমিকা রেখেছেন, সেই বিষয় নিয়ে তাদের মৃত্যুর পর বিরোধ তৈরি হয়।
এমনকি মা-বাবার শেষ বয়সে তাদের দেখভাল করার কারণে কেউ যদি তাদের কাছ থেকে বাড়তি সুযোগ-সুবিধা নিয়ে থাকেন, এমন অভিযোগও পরবর্তী সময়ে ভাইবোনদের সম্পর্ক খারাপ করতে পারে।
অনেক সময় বিরোধের শুরু হয় মৃত্যু থেকেও। মা-বাবার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া কোথায় এবং কীভাবে হবে, এ নিয়ে ভাইবোনদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিতে পারে। কেউ হয়তো চান বিদেশে থাকা আপনজনের জন্য অপেক্ষা করতে, আবার কেউ চান দ্রুত সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করতে। এসব নিয়ে একটা চাপা কষ্ট থেকে যেতে পারে বহুদিন। নিজেকে গুরুত্বহীন ভাবতে পারেন কেউ।
তবে সব পরিবারেই এমন হয় না। এমন অনেক পরিবারই আছে, যেখানে মা-বাবা না থাকলেও তাদের পারিবারিক ধারাটা কোনো না কোনোভাবে বজায় রাখেন ভাইবোনেরা। অহেতুক রেষারেষির জায়গা যেখানে নেই, সেখানে ভুল–বোঝাবুঝি হলেও মিটিয়ে ফেলা গেলে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখা সম্ভব।
আরটিভি/এএইচ




