
বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ দিনটি একজন শিক্ষার্থীর কাছে যতটা আনন্দের, তার পরের দিনগুলো ততটাই অনিশ্চয়তায় ভরা। কয়েক বছরের ক্লাস, পরীক্ষা, অ্যাসাইনমেন্ট, রাত জেগে পড়াশোনা আর ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন শেষে হাতে আসে একটি সনদ। কিন্তু সেই সনদ হাতে নিয়েই শুরু হয় আরেকটি কঠিন অধ্যায়—চাকরির অপেক্ষা।
বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালে ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্নের কোনো কমতি থাকে না। কেউ ব্যাংকার হতে চান, কেউ বিসিএস ক্যাডার, কেউ যেতে চান করপোরেট প্রতিষ্ঠানে। কেউ আবার স্বপ্ন দেখেন বিদেশে উচ্চশিক্ষার। কিন্তু পড়াশোনা শেষ হওয়ার পর বাস্তবতা অনেক সময় সেই স্বপ্নের সঙ্গে তাল মেলায় না।
সকালে ঘুম থেকে উঠে চাকরির ওয়েবসাইট দেখা, একের পর এক নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি খোঁজা, সিভি তৈরি, অনলাইনে আবেদন, লিখিত পরীক্ষার প্রস্তুতি—দিনের পর দিন চলতে থাকে একই রুটিন। কোনো দিন আসে একটি পরীক্ষার প্রবেশপত্র, আবার কোনো দিন আসে প্রত্যাখ্যানের বার্তা। কখনো লিখিত পরীক্ষায় বাদ পড়তে হয়, কখনো মৌখিক পরীক্ষার পর দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয় ফলাফলের জন্য।
শেষ হয় না অপেক্ষার দীর্ঘ সময়
একসময় যে তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে বন্ধুদের সঙ্গে বসে ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা করতেন, চাকরি না পেয়ে তাকেই হয়তো পরিবারের সামনে বারবার একই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় - চাকরির কী হলো?
প্রশ্নটি হয়তো খুব সাধারণ। কিন্তু বেকার একজন তরুণের কাছে প্রতিদিনের এই প্রশ্ন হয়ে ওঠে তার মানসিক চাপের আরেক নাম।
সন্তানের পড়াশোনার পেছনে বছরের পর বছর অর্থ ও শ্রম দেওয়ার পর বাবা-মাও স্বাভাবিকভাবেই চান, সন্তান দ্রুত নিজের পায়ে দাঁড়াক। কিন্তু চাকরির বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় অনেককে।
তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ যেন একজন তরুণকে এক অদ্ভুত বাস্তবতার সামনে দাঁড় করায় - শিক্ষাজীবন শেষ, কিন্তু কর্মজীবন এখনও শুরু হয়নি।
এই সময়টায় অনেকের আত্মবিশ্বাসেও ভাটা পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমবয়সীদের চাকরি, পদোন্নতি কিংবা বিদেশযাত্রার ছবি চোখে পড়ে। নিজের অবস্থানকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করে তখন হতাশ হয়ে পড়েন কেউ কেউ। অথচ প্রত্যেকের পথ যে আলাদা—এই সত্যটিই তখন মনে রাখা সবচেয়ে কঠিন হয়ে যায়।
বেকারত্ব শুধু আয় না থাকার সমস্যা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আত্মপরিচয়, আত্মসম্মান, পারিবারিক দায়িত্ব, সম্পর্ক হারানোর ভয় এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা। দীর্ঘদিন কর্মহীন থাকা একজন তরুণের দক্ষতা ও সম্ভাবনার পাশাপাশি তার মানসিক শক্তির ওপরও চাপ তৈরি করে।
এর মধ্যে কখনো খবর আসে, প্রেমিকার বিয়ের তারিখ ঠিক হয়ে গেছে। বাবার অবসরের সময় ঘনিয়ে আসে। ছোট বোনও বড় হয়ে ওঠে, সামনে আসে তার বিয়ের চিন্তা। দায়িত্বগুলো যেন একের পর এক সামনে এসে দাঁড়ায়। অথচ নিজের জীবনটাই তখন অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে থাকে।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ মানেই জীবনের শেষ নয়। একটি চাকরি না পাওয়া মানে একজন মানুষের যোগ্যতা শেষ হয়ে যাওয়া নয়। চাকরির পাশাপাশি দক্ষতা অর্জন, প্রশিক্ষণ, ফ্রিল্যান্সিং, উদ্যোক্তা হওয়া কিংবা উচ্চশিক্ষার মতো বিকল্প পথও রয়েছে। প্রয়োজন শুধু নিজের সক্ষমতা ও পরিস্থিতি অনুযায়ী পথটি খুঁজে নেওয়া।
তবু বাস্তবতা হলো, একজন তরুণের জীবনে সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোর একটি হতে পারে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কর্মজীবনে যাওয়ার এই মধ্যবর্তী সময়। একদিকে পরিবারের প্রত্যাশা, অন্যদিকে নিজের স্বপ্ন; একদিকে চাকরির প্রস্তুতি, অন্যদিকে অর্থনৈতিক চাপ—সবকিছু মিলিয়ে সময়টা হয়ে ওঠে এক কঠিন পরীক্ষা।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ দিনে যে তরুণটি সনদ হাতে হাসিমুখে ছবি তোলেন, কয়েক মাস পর সেই একই তরুণ হয়তো একটি চাকরির বিজ্ঞপ্তির সামনে বসে নিজের যোগ্যতা মেলাতে থাকেন। কোথাও বয়সের হিসাব মেলেনা, কোথাও অভিজ্ঞতার ঘাটতি, আবার কোথাও প্রতিযোগীদের ভিড়ে হারিয়ে যায় তার আবেদন।
তাই বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ হওয়া শুধু একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি নয়; শুরু হয় অপেক্ষার আরেক অধ্যায়।
আর সেই অপেক্ষার শেষে যখন কাঙ্ক্ষিত নিয়োগপত্র হাতে আসে, তখন হয়তো সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই দিনগুলোর কথা—যেদিন ভবিষ্যৎ নিয়ে শুধু স্বপ্ন ছিল, কিন্তু ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় ছিল না। সেই দিন মনে পড়ে ক্যাম্পাসের করিডোর, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, পরীক্ষার আগের রাত, আর চায়ের দোকানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকা সেই সময়গুলো। তখন হয়তো এসব মুহূর্তের মূল্য বোঝা যায়নি। কিন্তু কর্মজীবনের ব্যস্ততায় পেছনে ফিরে তাকালে সেই দিনগুলোই হয়ে ওঠে সবচেয়ে স্মরণীয়।
এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস একদিন শেষ হয়ে যায়, ক্লাসরুমের দরজা বন্ধ হয়ে যায়, বন্ধুরা ছড়িয়ে পড়ে ভিন্ন ভিন্ন শহরে, ভিন্ন ভিন্ন জীবনে। কিন্তু সেই দিনগুলোর স্মৃতি থেকে যায়—আর চাকরির অপেক্ষায় থাকা তরুণের কাছে সেসব স্মৃতিগুলো যেন হয়ে ওঠে পাওয়া না পাওয়ার হিসাবরেখা।
লেখক: আবুবকর সম্পদ, জবি সংবাদদাতা
আরটিভি/ এসকেডি



