
জন্মের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ছেলে ও মেয়ের আচরণে সূক্ষ্ম পার্থক্য দেখা দিতে পারে এমনই ইঙ্গিত মিলেছে নতুন এক গবেষণায়। গবেষণায় দেখা গেছে, খেলনার তুলনায় মানুষের মুখের দিকে মেয়ে-ছেলেদের চেয়ে গড়ে বেশি সময় তাকিয়ে থাকে।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের পরিচালিত এই গবেষণায় অংশ নেয় ১৩০ জন নবজাতক। তাদের বয়স ছিল মাত্র আট ঘণ্টা থেকে সর্বোচ্চ তিন দিন। ফলে সামাজিক পরিবেশ বা লালন-পালনের প্রভাব পড়ার সুযোগ খুবই সীমিত ছিল।
গবেষণায় নবজাতকদের সামনে ল্যাপটপের পর্দায় পাশাপাশি দুটি ভিডিও দেখানো হয়। একটি ভিডিওতে ছিল এক তরুণীর মুখ, অন্যটিতে ছিল ‘নিউটনের ক্রেডল’ নামে পরিচিত দোল খাওয়া ধাতব বলের খেলনা। আই-ট্র্যাকিং প্রযুক্তির মাধ্যমে কোন ভিডিওর দিকে শিশুরা কতক্ষণ তাকাচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করেন গবেষকরা।
ফলাফলে দেখা যায়, ছেলে ও মেয়ে উভয় শিশুই খেলনার তুলনায় মানুষের মুখের ভিডিওর দিকে বেশি সময় তাকিয়েছে। তবে মেয়ে-ছেলে তুলনায় মুখের দিকে আনুপাতিকভাবে বেশি সময় মনোযোগ ধরে রেখেছে।
গবেষণার প্রধান গবেষকদের একজন, কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অটিজম রিসার্চ সেন্টারের পিএইচডি গবেষক ইউমনা খান বলেন, আচরণে লিঙ্গভেদে পার্থক্যের কারণ এবং এর সূচনা কখন থেকে এ নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিতর্ক রয়েছে। নতুন গবেষণাটি অন্তত কিছু পার্থক্য জীবনের একেবারে শুরুতেই দেখা দিতে পারে বলে ইঙ্গিত দিচ্ছে।
গবেষকদের ধারণা, এত অল্প বয়সে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের সুযোগ কম থাকায় বংশগত বৈশিষ্ট্য কিংবা গর্ভাবস্থায় হরমোনের মাত্রার পার্থক্যের মতো জৈবিক কারণ এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এ বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন।
গবেষকরা একই সঙ্গে সতর্ক করেছেন, এই ফলাফল সব ছেলে বা সব মেয়ের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য নয়। গবেষণাটি দুটি দলের গড় পার্থক্য তুলে ধরেছে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে দুই দলের শিশুর আচরণে যথেষ্ট মিল ও পার্থক্য থাকতে পারে।
জন্মের সময় দেখা এই পার্থক্য কোনো শিশুর ভবিষ্যৎ আচরণ বা বিকাশ নির্ধারণ করে দেয় এমন দাবি করার সুযোগ নেই। তবে গবেষকদের মতে, জীবনের শুরুতে থাকা কোনো প্রাথমিক প্রবণতা পরবর্তী বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারে।
সাধারণভাবে মেয়েরা কিছু ভাষাগত ও সামাজিক দক্ষতায় ছেলেদের তুলনায় কিছুটা আগে এগিয়ে যেতে পারে। জন্ম থেকেই সামাজিক বিষয়ে মনোযোগের পার্থক্য থাকলে তা পরবর্তী বিকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত কি না, ভবিষ্যৎ গবেষণায় সেটিই খতিয়ে দেখা হবে।
এ ছাড়া নবজাতকের মনোযোগের এই পার্থক্যের সঙ্গে পরবর্তী স্নায়ুবিক বিকাশ বা মানসিক স্বাস্থ্যের কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিও গবেষকদের আগ্রহের বিষয়। তবে বর্তমান গবেষণায় নবজাতকের এই আচরণের সঙ্গে অটিজম, এডিএইচডি, উদ্বেগ বা বিষণ্নতার সরাসরি কোনো সম্পর্ক প্রমাণিত হয়নি।
গবেষকদের মতে, গর্ভাবস্থায় হরমোনের পার্থক্যও এ ধরনের আচরণগত তফাতের সম্ভাব্য কারণ হতে পারে। আগের কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভাবস্থার প্রথম ও দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে ছেলে ভ্রূণ মেয়ে ভ্রূণের তুলনায় বেশি টেস্টোস্টেরনের সংস্পর্শে আসে।
এই হরমোনগত পার্থক্য জন্মের পর মনোযোগ ও মস্তিষ্কের বিকাশে কতটা প্রভাব ফেলে, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
গবেষণাটির বিস্তারিত ফলাফল ‘Biology of Sex Differences’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকদের মতে, নতুন এই ফলাফল প্রকৃতি ও লালন-পালনের প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কে নতুন কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তবে জন্মের সময়ের এই সূক্ষ্ম পার্থক্য কীভাবে পরবর্তী বিকাশের সঙ্গে যুক্ত হয়, তা জানতে আরও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা প্রয়োজন।
সূত্র: গার্ডিয়ান
আরটিভি/এসকে




