ঢাকা বুধবার, ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ২৯ আশ্বিন ১৪৩৩

ব্রাজিলে ইসলামের ইতিহাস, মুসলমানদের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ২৭ জুন ২০২৬, ০৫:৫৮ পিএম
ইসলামিক সেন্টার অব কাম্পিনাস, ব্রাজিল। ছবি: সংগৃহীত

দক্ষিণ আমেরিকার বৃহত্তম দেশ ব্রাজিলকে সাধারণত ফুটবল, কার্নিভাল ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য চেনে বিশ্ব। কিন্তু অনেকেরই অজানা, এই দেশটির মাটিতে ইসলামও বহন করে এক দীর্ঘ, বেদনাবিধুর এবং গৌরবময় ইতিহাস। দাসত্ব, নির্যাতন ও ধর্মীয় নিপীড়নের অন্ধকার অধ্যায় অতিক্রম করে এখন ব্রাজিলের মুসলিম সমাজ শিক্ষা, ব্যবসা, সামাজিক নেতৃত্ব এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিজেদের একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। তাদের এই যাত্রা ধৈর্য, আত্মত্যাগ ও ঈমানের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

ব্রাজিলে মুসলমানদের আগমন

বর্তমানে ব্রাজিলে প্রায় দেড় লাখ মুসলমান বসবাস করেন, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ০.১ শতাংশ। আমেরিকা আবিষ্কারের প্রাথমিক সময়েই পর্তুগিজ নাবিকেরা আফ্রিকান মুসলমানদের দাস হিসেবে ব্রাজিলে নিয়ে আসেন। দীর্ঘ প্রায় পাঁচ শতকের ইতিহাস পেরিয়ে আজ মুসলমানরা দেশটির অন্যতম অগ্রসর ও সম্মানিত সম্প্রদায়ে পরিণত হয়েছে।

ইসলামের প্রাথমিক বিস্তার

ষোড়শ শতকের শুরুতে পর্তুগিজ নাবিক পেদ্রো আলভারেস কারব্যাল ব্রাজিল উপকূলে পৌঁছান। তার সঙ্গে ছিলেন বেশ কয়েকজন মুসলিম নাবিক, যাদের মাধ্যমে ব্রাজিল ও আশপাশের অঞ্চলে ইসলামের পরিচয় ছড়িয়ে পড়ে। ইতিহাসে শিহাবুদ্দিন ইবনে মাজেদ এবং মুসা ইবনে সাতি বিশেষভাবে স্মরণীয়।

অন্যদিকে, স্পেনে মুসলিম শাসনের অবসানের পর বহু স্প্যানিশ মুসলমানও আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে ব্রাজিলে আশ্রয় গ্রহণ করেন।

নির্যাতন ও দাসত্বের নির্মম অধ্যায়

ব্রাজিলে আগত বহু মুসলমান পর্তুগিজ শাসকদের নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। অনেককে হত্যা করা হয়, আবার অসংখ্য আফ্রিকান মুসলমানকে দাস হিসেবে ব্রাজিলে আনা হয়।

ব্রাজিলের জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল থেকে জানা যায়, এসব আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মুসলমান নিজেদের ঈমান ও ধর্মীয় পরিচয় দৃঢ়ভাবে ধরে রেখেছিলেন। তারা আরবি ভাষায় কুরআন তিলাওয়াত করতেন এবং ইসলামের মৌলিক শিক্ষাগুলো নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতেন।

আরও পড়ুন

দাসদের মাঝেও ছিল ইসলামের শিক্ষা

মুসলিম দাসদের মধ্যে যারা বয়সে প্রবীণ ও জ্ঞানী ছিলেন, তারা অন্যদের কুরআন, ফিকহ, আকিদা ও শরিয়তের শিক্ষা দিতেন। কঠিন দাসজীবনের মধ্যেও ইসলামের আলো তারা নিভতে দেননি।

১৬০৫ সালে ব্রাজিলের উত্তরাঞ্চলের আলমিরস এলাকায় প্রায় ৩০ হাজার কৃষ্ণাঙ্গ মুসলমান বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তরুণ মুসলিম নেতা জানজা জুম্বা নিপীড়িত মুসলমানদের জন্য একটি স্বাধীন মুসলিম রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তার ভাই ও উত্তরসূরিরা দীর্ঘদিন সেই রাজ্য টিকিয়ে রাখেন।

মুসলিম রাজ্যের পতন

প্রায় এক শতাব্দী পর, ১৬৯৪ সালে পর্তুগিজ বাহিনীর হাতে আলমিরসের পতন ঘটে। এরপর মুসলমানদের ওপর আবারও নেমে আসে ভয়াবহ নির্যাতন। অধিকাংশ মুসলমানকে জোরপূর্বক খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করা হয়।

১৮৮৮ সালে ব্রাজিলে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত মুসলমানদের ওপর অত্যাচার ও বৈষম্য অব্যাহত ছিল।

নতুন সূচনা ও মুসলিম অভিবাসন

উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে ব্রাজিলের মুসলমানদের ভাগ্যের পরিবর্তন শুরু হয়। আরব-ইসরাইল যুদ্ধ, লেবাননের গৃহযুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে লেবানন, ফিলিস্তিন, মিসর ও সিরিয়া থেকে বিপুলসংখ্যক মুসলমান ব্রাজিলে অভিবাসন করেন। এর ফলে ব্রাজিলের সঙ্গে আরব ও মুসলিম বিশ্বের সম্পর্ক আরও গভীর হয় এবং মুসলিম সমাজ নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করে।

অর্থনীতি ও সমাজে মুসলমানদের অবদান

গত শতাব্দী এবং চলতি শতাব্দীতে ব্রাজিলে আগত অধিকাংশ মুসলমান ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হন। বর্তমানে দেশটির অর্থনীতিতে মুসলিম ব্যবসায়ীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।

এ ছাড়া সরকারি চাকরি, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং অন্যান্য পেশায়ও মুসলমানরা দক্ষতা ও সাফল্যের পরিচয় দিচ্ছেন।

মসজিদ, ইসলামিক স্কুল ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান

বর্তমানে ব্রাজিলের প্রায় প্রতিটি শহরেই মসজিদ রয়েছে। দেশটিতে মসজিদের সংখ্যা প্রায় ১৩০, যা ২০০০ সালের তুলনায় চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

শিশুদের ইসলামি শিক্ষা প্রদানের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মক্তব, মাদ্রাসা ও ইসলামিক স্কুল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও বিভিন্ন কার্যক্রমে সরকারও সহযোগিতা করে থাকে।

মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল

ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো শহরে রয়েছে বৃহৎ ইসলামিক সেন্টার, ইসলামিক স্কুল এবং একাধিক বড় মসজিদ।

এছাড়া সাও পাওলো শহরে রয়েছে শক্তিশালী মুসলিম কমিউনিটি। রিও ডি জেনিরো, সাও পাওলো এবং রিও গ্রান্দে দো সুল অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে মুসলমানদের বসবাস বেশি। অন্যদিকে পারানা অঞ্চলেও আরব বংশোদ্ভূত উল্লেখযোগ্য মুসলিম সম্প্রদায়ের বসবাস রয়েছে।

ব্রাজিলের মুসলমানদের ইতিহাস কেবল একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ইতিহাস নয়; এটি সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, ধৈর্য এবং পুনর্জাগরণের এক অনন্য কাহিনী। দাসত্বের শৃঙ্খল, ধর্মীয় নিপীড়ন এবং দীর্ঘ প্রতিকূলতা অতিক্রম করে আজ তারা শিক্ষা, অর্থনীতি, ব্যবসা ও সামাজিক নেতৃত্বে সম্মানজনক অবস্থান অর্জন করেছে। তাদের এই পথচলা প্রমাণ করে— ইমান, অধ্যবসায় এবং ঐক্য থাকলে প্রতিকূলতার অন্ধকার ভেদ করে আলোর পথ নির্মাণ করা সম্ভব।

আরটিভি/ এসকেডি

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
ভারতে গঙ্গায় নৌকাডুবি, শিশুসহ নিহত ১১
ভারতের বিহার রাজ্যে গঙ্গা নদীতে নৌকাডুবির ঘটনায় শিশুসহ অন্তত ১১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে পাঁচজনকে। নিখোঁজদের সন্ধানে উদ্ধার অভিযান চলছে।
ভারতে গঙ্গায় নৌকাডুবি, শিশুসহ নিহত ১১
রিয়াদের বিমানবন্দরসহ সৌদির তিন স্থাপনা ছাড়তে বলল হুথিরা
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা থেকে সবাইকে তাৎক্ষণিক সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও।
রিয়াদের বিমানবন্দরসহ সৌদির তিন স্থাপনা ছাড়তে বলল হুথিরা
হঠাৎ সৌদিতে সতর্কতা জারি
সৌদি আরবের বিভিন্ন অঞ্চলে ভারী বজ্রঝড়, শিলাবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যার আশঙ্কায় সতর্কতা জারি করেছে দেশটির জাতীয় আবহাওয়া কেন্দ্র (এনসিএম)।
হঠাৎ সৌদিতে সতর্কতা জারি
ভারতের মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করলেন প্রতিমন্ত্রী মুরুগান
  ভারতের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেছেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী এল মুরুগান। একই সঙ্গে রাজ্যসভার সদস্যপদ থেকেও পদত্যাগ করেছেন তিনি।  মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান মুরুগান। পদত্যাগের কারণ হিসেবে তামিলনাড়ুতে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সাংগঠনিক শক্তি বাড়ানোর কথা জানিয়েছেন তিনি। ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে রাজ্যে দলের ভিত আরও মজবুত করতে পুরো সময় দিতে চান এই বিজেপি নেতা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে মুরুগান বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে ভারতমাতা ও তামিলনাড়ুর সেবা করার সুযোগ পাওয়া তার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্মান। তিনি আরও বলেন, দিনমজুর পরিবারের সন্তান হিসেবে জীবন শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় কাজ করার সুযোগ পাওয়া তার কাছে অত্যন্ত গর্বের বিষয়। মুরুগান জানিয়েছেন, এবার তিনি দলের তৃণমূল পর্যায়ে ফিরে যেতে চান। তামিলনাড়ুতে বিজেপিকে আরও শক্তিশালী করাই হবে তার প্রধান লক্ষ্য। এর আগে তামিলনাড়ুতে বিজেপির রাজ্য সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এল মুরুগান। পরে মধ্যপ্রদেশ থেকে রাজ্যসভার সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ২০৩০ সালে রাজ্যসভায় তার মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল। তবে পদত্যাগপত্রে তিনি অবিলম্বে তাকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন। সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস আরটিভি/ এসকেডি
ভারতের মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করলেন প্রতিমন্ত্রী মুরুগান
রোবট দিয়ে কিশোরীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ
জার্মানির কোলন শহরে রোবট ব্যবহার করে এক কিশোরীকে যৌন হয়রানি এবং সেই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারের অভিযোগে ১৬ ও ১৯ বছর বয়সী দুই তরুণের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
রোবট দিয়ে কিশোরীকে যৌন হয়রানির অভিযোগ
আরও পড়ুন
অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ড্রয়ের খেসারত ব্রাজিলের, সুখবর পর্তুগালের
ব্রাজিলে ভোটগ্রহণ শেষ, লুলা-বলসোনারোর হাড্ডাহাড্ডি লড়াই
ব্রাজিল কেন ঘুরে ঘুরে বিদেশের মাটিতে প্রীতি ম্যাচ খেলে?
ব্রাজিলে আজ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন, কঠিন লড়াইয়ে লুলা-ফ্লাভিও