ঢাকা শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ২২ কার্তিক ১৪৩৩

ব্রাজিলে ইসলামের ইতিহাস, মুসলমানদের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগ 

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ২৭ জুন ২০২৬, ০৫:৫৮ পিএম
ইসলামিক সেন্টার অব কাম্পিনাস, ব্রাজিল। ছবি: সংগৃহীত

দক্ষিণ আমেরিকার বৃহত্তম দেশ ব্রাজিলকে সাধারণত ফুটবল, কার্নিভাল ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য চেনে বিশ্ব। কিন্তু অনেকেরই অজানা, এই দেশটির মাটিতে ইসলামও বহন করে এক দীর্ঘ, বেদনাবিধুর এবং গৌরবময় ইতিহাস। দাসত্ব, নির্যাতন ও ধর্মীয় নিপীড়নের অন্ধকার অধ্যায় অতিক্রম করে এখন ব্রাজিলের মুসলিম সমাজ শিক্ষা, ব্যবসা, সামাজিক নেতৃত্ব এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিজেদের একটি শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করেছে। তাদের এই যাত্রা ধৈর্য, আত্মত্যাগ ও ঈমানের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

ব্রাজিলে মুসলমানদের আগমন

বর্তমানে ব্রাজিলে প্রায় দেড় লাখ মুসলমান বসবাস করেন, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ০.১ শতাংশ। আমেরিকা আবিষ্কারের প্রাথমিক সময়েই পর্তুগিজ নাবিকেরা আফ্রিকান মুসলমানদের দাস হিসেবে ব্রাজিলে নিয়ে আসেন। দীর্ঘ প্রায় পাঁচ শতকের ইতিহাস পেরিয়ে আজ মুসলমানরা দেশটির অন্যতম অগ্রসর ও সম্মানিত সম্প্রদায়ে পরিণত হয়েছে।

ইসলামের প্রাথমিক বিস্তার

ষোড়শ শতকের শুরুতে পর্তুগিজ নাবিক পেদ্রো আলভারেস কারব্যাল ব্রাজিল উপকূলে পৌঁছান। তার সঙ্গে ছিলেন বেশ কয়েকজন মুসলিম নাবিক, যাদের মাধ্যমে ব্রাজিল ও আশপাশের অঞ্চলে ইসলামের পরিচয় ছড়িয়ে পড়ে। ইতিহাসে শিহাবুদ্দিন ইবনে মাজেদ এবং মুসা ইবনে সাতি বিশেষভাবে স্মরণীয়।

অন্যদিকে, স্পেনে মুসলিম শাসনের অবসানের পর বহু স্প্যানিশ মুসলমানও আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে ব্রাজিলে আশ্রয় গ্রহণ করেন।

নির্যাতন ও দাসত্বের নির্মম অধ্যায়

ব্রাজিলে আগত বহু মুসলমান পর্তুগিজ শাসকদের নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। অনেককে হত্যা করা হয়, আবার অসংখ্য আফ্রিকান মুসলমানকে দাস হিসেবে ব্রাজিলে আনা হয়।

ব্রাজিলের জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিল থেকে জানা যায়, এসব আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মুসলমান নিজেদের ঈমান ও ধর্মীয় পরিচয় দৃঢ়ভাবে ধরে রেখেছিলেন। তারা আরবি ভাষায় কুরআন তিলাওয়াত করতেন এবং ইসলামের মৌলিক শিক্ষাগুলো নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতেন।

আরও পড়ুন

দাসদের মাঝেও ছিল ইসলামের শিক্ষা

মুসলিম দাসদের মধ্যে যারা বয়সে প্রবীণ ও জ্ঞানী ছিলেন, তারা অন্যদের কুরআন, ফিকহ, আকিদা ও শরিয়তের শিক্ষা দিতেন। কঠিন দাসজীবনের মধ্যেও ইসলামের আলো তারা নিভতে দেননি।

১৬০৫ সালে ব্রাজিলের উত্তরাঞ্চলের আলমিরস এলাকায় প্রায় ৩০ হাজার কৃষ্ণাঙ্গ মুসলমান বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। তরুণ মুসলিম নেতা জানজা জুম্বা নিপীড়িত মুসলমানদের জন্য একটি স্বাধীন মুসলিম রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। তার ভাই ও উত্তরসূরিরা দীর্ঘদিন সেই রাজ্য টিকিয়ে রাখেন।

মুসলিম রাজ্যের পতন

প্রায় এক শতাব্দী পর, ১৬৯৪ সালে পর্তুগিজ বাহিনীর হাতে আলমিরসের পতন ঘটে। এরপর মুসলমানদের ওপর আবারও নেমে আসে ভয়াবহ নির্যাতন। অধিকাংশ মুসলমানকে জোরপূর্বক খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণে বাধ্য করা হয়।

১৮৮৮ সালে ব্রাজিলে দাসপ্রথা বিলুপ্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত মুসলমানদের ওপর অত্যাচার ও বৈষম্য অব্যাহত ছিল।

নতুন সূচনা ও মুসলিম অভিবাসন

উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে ব্রাজিলের মুসলমানদের ভাগ্যের পরিবর্তন শুরু হয়। আরব-ইসরাইল যুদ্ধ, লেবাননের গৃহযুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে লেবানন, ফিলিস্তিন, মিসর ও সিরিয়া থেকে বিপুলসংখ্যক মুসলমান ব্রাজিলে অভিবাসন করেন। এর ফলে ব্রাজিলের সঙ্গে আরব ও মুসলিম বিশ্বের সম্পর্ক আরও গভীর হয় এবং মুসলিম সমাজ নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করে।

অর্থনীতি ও সমাজে মুসলমানদের অবদান

গত শতাব্দী এবং চলতি শতাব্দীতে ব্রাজিলে আগত অধিকাংশ মুসলমান ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত হন। বর্তমানে দেশটির অর্থনীতিতে মুসলিম ব্যবসায়ীরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।

এ ছাড়া সরকারি চাকরি, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং অন্যান্য পেশায়ও মুসলমানরা দক্ষতা ও সাফল্যের পরিচয় দিচ্ছেন।

মসজিদ, ইসলামিক স্কুল ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান

বর্তমানে ব্রাজিলের প্রায় প্রতিটি শহরেই মসজিদ রয়েছে। দেশটিতে মসজিদের সংখ্যা প্রায় ১৩০, যা ২০০০ সালের তুলনায় চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

শিশুদের ইসলামি শিক্ষা প্রদানের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মক্তব, মাদ্রাসা ও ইসলামিক স্কুল। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এসব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও বিভিন্ন কার্যক্রমে সরকারও সহযোগিতা করে থাকে।

মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল

ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো শহরে রয়েছে বৃহৎ ইসলামিক সেন্টার, ইসলামিক স্কুল এবং একাধিক বড় মসজিদ।

এছাড়া সাও পাওলো শহরে রয়েছে শক্তিশালী মুসলিম কমিউনিটি। রিও ডি জেনিরো, সাও পাওলো এবং রিও গ্রান্দে দো সুল অঞ্চলে তুলনামূলকভাবে মুসলমানদের বসবাস বেশি। অন্যদিকে পারানা অঞ্চলেও আরব বংশোদ্ভূত উল্লেখযোগ্য মুসলিম সম্প্রদায়ের বসবাস রয়েছে।

ব্রাজিলের মুসলমানদের ইতিহাস কেবল একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের ইতিহাস নয়; এটি সংগ্রাম, আত্মত্যাগ, ধৈর্য এবং পুনর্জাগরণের এক অনন্য কাহিনী। দাসত্বের শৃঙ্খল, ধর্মীয় নিপীড়ন এবং দীর্ঘ প্রতিকূলতা অতিক্রম করে আজ তারা শিক্ষা, অর্থনীতি, ব্যবসা ও সামাজিক নেতৃত্বে সম্মানজনক অবস্থান অর্জন করেছে। তাদের এই পথচলা প্রমাণ করে— ইমান, অধ্যবসায় এবং ঐক্য থাকলে প্রতিকূলতার অন্ধকার ভেদ করে আলোর পথ নির্মাণ করা সম্ভব।

আরটিভি/ এসকেডি

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
মৃতদেহ উঠে আসার ভয়ে গলায় কাস্তে, পায়ে তালা! ভ্যাম্পায়ার-ভীতি নাকি অন্য কিছু?
মৃত্যুর পর দাফন বা সৎকারের রীতি দেশ ও সংস্কৃতিভেদে ভিন্ন। তবে ইউরোপের কিছু অঞ্চলে একসময় প্রচলিত ছিল অদ্ভুত এক বিশ্বাস—কবর দেওয়া মৃত ব্যক্তিও নাকি ফিরে আসতে পারেন জীবিতদের মাঝে!
মৃতদেহ উঠে আসার ভয়ে গলায় কাস্তে, পায়ে তালা! ভ্যাম্পায়ার-ভীতি নাকি অন্য কিছু?
গরু বিক্রিতে বাধা দেওয়ায় স্ত্রীকে ট্রাকচাপা দিলেন স্বামী
ধারের টাকা পরিশোধের জন্য গোয়ালের গরু বিক্রি করতে চেয়েছিলেন ট্রাকচালক চুন্নিলাল কুমাওয়াত (৫৬)। তবে এতে তার স্ত্রী চুঙ্কি দেবী (৫২) আপত্তি জানান।
গরু বিক্রিতে বাধা দেওয়ায় স্ত্রীকে ট্রাকচাপা দিলেন স্বামী
হরমুজ প্রণালিতে ভারত-চীনসহ ৪ দেশের জাহাজ চলাচলে ছাড় দিল ইরান
ইরানের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে চলাচলের ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ থেকে ভারত, চীন, ইরাক ও কাতারের জাহাজকে ছাড় দেওয়া হয়েছে।
হরমুজ প্রণালিতে ভারত-চীনসহ ৪ দেশের জাহাজ চলাচলে ছাড় দিল ইরান
ইরানকে ৯০টি অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার দিতে রাজি রাশিয়া
ইরানের কাছে ৯০টি অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা বিক্রিতে সম্মতি দিয়েছে রাশিয়া। হেলিকপ্টার থেকে পরিচালিত এসব লঞ্চারের মাধ্যমে নির্ভুল লক্ষ্যভেদী ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা সম্ভব। ইউক্রেন যুদ্ধে রুশ বাহিনীও এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের (এফটি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা শিল্পের ২০২৪ ও ২০২৫ সালের উৎপাদনসংক্রান্ত নথিতে ‘এপিইউ-এল’ মডেলের ৯০টি লঞ্চার রপ্তানির আদেশের তথ্য রয়েছে। সেখানে ক্রেতার নাম সরাসরি উল্লেখ না করে ‘কে-১০’ সাংকেতিক পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছে।  রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় অস্ত্র রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের নথিতে এই সংকেত দিয়ে ইরানকে বোঝানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়। তবে এসব সরঞ্জাম ইতোমধ্যে ইরানের কাছে পৌঁছেছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। লঞ্চারগুলো রাশিয়ার এমআই-২৮ মডেলের আক্রমণকারী হেলিকপ্টারে স্থাপন করা যায়। প্রতিটি লঞ্চারে দুটি করে ‘এলএমইউআর’ নির্ভুল লক্ষ্যভেদী ক্ষেপণাস্ত্র বহনের সক্ষমতা রয়েছে। আকাশে উড্ডয়নের সময়ও এসব ক্ষেপণাস্ত্রের গতিপথ পরিবর্তন করা যায়। ফলে চলমান লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সুযোগ তৈরি হয়। এফটির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইরানের সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতেও প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়েছে মস্কো। ‘সি৪৩০এল’ নামের একটি গোপন প্রকল্পের আওতায় রুশ প্রকৌশলীরা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের ইঞ্জিন ও জ্বালানি ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করেছেন। সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি ভবিষ্যতে পারস্য উপসাগরে মোতায়েন করা মার্কিন যুদ্ধজাহাজগুলোর জন্য নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য এর আগে ইরানের কাছ থেকে শাহেদ ড্রোন সংগ্রহ করেছিল রাশিয়া। পাশাপাশি ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতেও সহযোগিতা করছে মস্কো। বিশ্লেষকদের ধারণা, সামরিক ক্ষেত্রে দুই দেশের সম্পর্ক ক্রমেই ঘনিষ্ঠ হলেও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে সরাসরি অংশ নেওয়ার বিষয়ে সতর্ক রাশিয়া। যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য প্রভাবশালী শক্তির সঙ্গে কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখাই ক্রেমলিনের অন্যতম লক্ষ্য।  এ কারণে রুশ সামরিক সহায়তায় ইরানের সক্ষমতা বাড়ার সম্ভাবনা থাকলেও তা আঞ্চলিক সংঘাতের সামগ্রিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। আরটিভি/এসআর  
ইরানকে ৯০টি অত্যাধুনিক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার দিতে রাজি রাশিয়া
ভুয়া তথ্যে করোনার ১৮ মিলিয়ন ডলারের অনুদান লুট, অভিযুক্ত মার্কিন নারী 
যুক্তরাষ্ট্রে করোনাকালীন সরকারি আর্থিক সহায়তার ১ কোটি ৮০ লাখ ডলার (১৮ মিলিয়ন ডলার) জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক নারীর বিরুদ্ধে।
ভুয়া তথ্যে করোনার ১৮ মিলিয়ন ডলারের অনুদান লুট, অভিযুক্ত মার্কিন নারী 
আরও পড়ুন
২০৩০ সালে ষষ্ঠ বিশ্বকাপ ট্রফির দেখা পাবে ব্রাজিল: কাফু
ব্রাজিল-কিউবার ১৩ নাগরিকের বিরুদ্ধে ভিসা-বিয়ে নিয়ে জালিয়াতির অভিযোগ
সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে ব্রাজিলের দল ঘোষণা
নির্বাচনে হেরে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে গিয়ে নিজেকে ব্রাজিলের বৈধ নেতা দাবি ফ্লাভিওর