তুরস্কের এজিয়ান সাগরের তীরে অবস্থিত ঐতিহাসিক শহর বোদ্রুম, যার প্রাচীন নাম ছিল হ্যালিকারনাসাস। বর্তমানে এটি পর্যটকদের অন্যতম জনপ্রিয় গন্তব্য হলেও প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে এই শহর ছিল এক শক্তিশালী রাজবংশের রাজধানী। এখানেই নির্মিত হয়েছিল প্রাচীন বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম হ্যালিকারনাসাসের মসলিয়াম যার পেছনে রয়েছে এক শোকাবহ রাজকীয় প্রেমের গল্প।
খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকে কারিয়ার শাসক রাজা মসলাস (মাউসোলাস) এবং তার বোন ও স্ত্রী দ্বিতীয় আরটেমিসিয়া এ অঞ্চল শাসন করতেন। সে সময় রাজপরিবারে ক্ষমতা ও বংশীয় ঐতিহ্য রক্ষার অংশ হিসেবে ভাই-বোনের মধ্যে বিয়ে অস্বাভাবিক ছিল না।
খ্রিষ্টপূর্ব ৩৫৩ সালে মসলাসের মৃত্যুর পর গভীর শোকে ভেঙে পড়েন আরটেমিসিয়া। স্বামীর স্মৃতিকে অমর করে রাখতে তিনি গ্রিক, মিসরীয় ও লিসিয়ান স্থাপত্যশৈলীর সমন্বয়ে এক বিশাল সমাধি নির্মাণের উদ্যোগ নেন। এই সমাধিই পরে ইতিহাসে হ্যালিকারনাসাসের মসলিয়াম নামে পরিচিতি পায় এবং প্রাচীন বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের একটি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।
ইতিহাস ও কিংবদন্তি অনুযায়ী, স্বামীর মৃত্যুশোকে আরটেমিসিয়া নাকি মদের সঙ্গে মসলাসের ভস্ম মিশিয়ে পান করেছিলেন। যদিও এ ঘটনার ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, তবুও এটি যুগ যুগ ধরে আলোচিত একটি কাহিনি হিসেবে টিকে আছে। মসলাসের মৃত্যুর মাত্র দুই বছর পর আরটেমিসিয়াও মারা যান এবং অসমাপ্ত সমাধির কাজ পরে কারিগররা শেষ করেন।
স্থানীয় গাইডদের বর্ণনা অনুযায়ী, এই বিশাল স্থাপত্য নির্মাণে অর্থ জোগাড় করতে সে সময় নানা ধরনের কর আরোপ করা হয়েছিল। প্রচলিত একটি কাহিনিতে বলা হয়, পুরুষদের লম্বা চুলের ওপরও কর বসানো হয়েছিল। যারা কর দিতে চাইতেন না, তাদের চুল কেটে নেওয়া হতো এবং সেই চুল পারস্যের অভিজাতদের জন্য পরচুলা তৈরিতে ব্যবহৃত হতো। তবে এ তথ্যের পক্ষে শক্ত ঐতিহাসিক প্রমাণ সীমিত।
পরবর্তী সময়ে ১২০০ থেকে ১৫০০ শতকের মধ্যে ধারাবাহিক ভূমিকম্পে মসলিয়ামটি ধ্বংস হয়ে যায়। উনবিংশ শতকে ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক চার্লস নিউটন এর ধ্বংসাবশেষ খনন করে গুরুত্বপূর্ণ ভাস্কর্য ও স্থাপত্যাংশ উদ্ধার করেন, যার অনেকগুলো বর্তমানে লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া ধ্বংসস্তূপের কিছু মার্বেল পাথর ব্যবহার করে নির্মাণ করা হয় বোদ্রুম ক্যাসল, যা আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
এক ভাই-বোনের রাজকীয় বিবাহ, গভীর শোক এবং অমর স্মৃতির প্রতীক হয়ে নির্মিত এই মসলিয়াম আজ আর অবশিষ্ট নেই। তবে এর ইতিহাস এখনো বিশ্বের অন্যতম বিস্ময়কর স্থাপত্যগাথা হিসেবে মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু।
সূত্র: সিএনএন
আরটিভি/এসকে



