
দারিদ্র্যের সুযোগ নিয়ে কিডনি বিক্রির ফাঁদে ফেলা হয়েছিল নেপালের একটি গ্রামের অসংখ্য মানুষকে। দালালদের প্রলোভন আর মিথ্যা আশ্বাসে একসময় গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবারেই কেউ না কেউ কিডনি বিক্রি করেন। এমনকি অনেককে বলা হয়েছিল একটি কিডনি বিক্রি করলেও কোনো সমস্যা হবে না, কিডনি আবার গজিয়েও উঠবে!
কিডনি বিক্রির এই ভয়াবহ ইতিহাসের কারণে নেপালের হোকসে গ্রাম পরিচিত হয়ে ওঠে ‘কিডনি ভ্যালি’ নামে।
গ্রামের বাসিন্দা কাঞ্চা ও রাম আর্থিক সংকটের কারণে কিডনি বিক্রি করেছিলেন। অস্ত্রোপচারের পর থেকে নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন কাঞ্চা। ব্যথার কারণে এখন আর আগের মতো কাজও করতে পারেন না তিনি।
কাঞ্চা বলেন, কত মানুষ কিডনি বিক্রি করেছেন, তার সঠিক হিসাব করাও কঠিন। শুধু তার গ্রাম নয়, আশপাশের অনেক এলাকার মানুষও দালালদের প্রলোভনে পড়ে কিডনি বিক্রি করেছেন।
অবৈধ হওয়া সত্ত্বেও বছরের পর বছর হোকসে ও আশপাশের এলাকায় সক্রিয় ছিল কিডনি পাচারকারী দালালচক্র। দরিদ্র মানুষকে টার্গেট করে তাদের নানা প্রলোভন দেখানো হতো। অনেককে বলা হতো, একটি কিডনি ছাড়াও মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারে। আবার কারও কাছে এমন মিথ্যাও বলা হয়েছিল কিডনি শরীরে আবার তৈরি হয়ে যাবে।
এই প্রতারণার শিকার হয়ে কিডনি বিক্রি করা অনেকেই পরবর্তী সময়ে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন। অস্ত্রোপচারের জটিলতায় কয়েকজনের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ‘কিডনি ভ্যালি’ হিসেবে পরিচিতির এই বদনাম থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছেন স্থানীয়রা। কিন্তু দারিদ্র্য ও কর্মসংস্থানের সংকট এখনো নেপালে কিডনি পাচারের নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।
২০২৪ সালের এপ্রিলে স্কাই নিউজের এক প্রতিবেদনে নেপালে কিডনি বিক্রির ভয়াবহ চিত্র উঠে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদেশে কাজের আশায় থাকা দরিদ্র নেপালিদের একটি অংশ কিডনি বিক্রির মতো ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছেন। উপসাগরীয় দেশ ও মালয়েশিয়ায় কঠিন পরিবেশে কাজ করা কিছু নেপালি শ্রমিক দেশে ফিরছেন কিডনি বিকল অবস্থায়। তীব্র গরম, পানিশূন্যতা ও কঠোর কর্মপরিবেশকে এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন কয়েকজন বিজ্ঞানী।
এর মধ্যেই নতুন করে সামনে এসেছে নেপাল-ভারত সীমান্ত ব্যবহার করে কিডনি পাচারের অভিযোগ।
নেপালের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিইএসএলএএম সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব লেবার অ্যান্ড মোবিলিটি এর ২০২৬ সালের মে মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে দরিদ্র ও আর্থিকভাবে অসহায় নেপালিদের ভারতে নিয়ে যাচ্ছে একটি চক্র। হোটেলে ভালো বেতনের চাকরির কথা বলে সীমান্ত পার করার পর তাদের আটকে রেখে কিডনি অপসারণ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
২০২৫ সালে সিন্ধুলির এক ব্যক্তি এমনই একটি চক্রের ফাঁদে পড়েন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। চাকরির প্রলোভনে তাকে ভারতে নেওয়ার পর প্রায় এক মাস একটি অ্যাপার্টমেন্টে আটকে রাখা হয়। পরে কিডনি অপসারণের কথা জানানো হলে তিনি রাজি হননি।
অভিযোগ, এরপর তাকে জোর করে একটি ক্লিনিকে নিয়ে অচেতন করে তার বাম কিডনি অপসারণ করা হয়। বিনিময়ে তাকে ৬ লাখ নেপালি রুপি দেওয়ার কথা থাকলেও দেশে ফেরার সময় দেওয়া হয় মাত্র ১০ হাজার রুপি।
পরে অসুস্থ হয়ে পরিবারের কাছে পুরো ঘটনা জানান ওই ব্যক্তি। এরপর নেপালের অ্যান্টি-হিউম্যান ট্র্যাফিকিং ইনভেস্টিগেশন ব্যুরোতে অভিযোগ করেন তিনি।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, এ ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। বিদেশে চাকরির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মানুষকে অঙ্গ পাচারচক্রে ফাঁসানো হচ্ছে।
ফলে নেপালে একদিকে রয়ে গেছে পুরোনো ‘কিডনি ভ্যালি’র ক্ষত, অন্যদিকে নতুন করে সক্রিয় হওয়ার অভিযোগ উঠেছে কিডনি পাচারচক্রের। আর এর নেপথ্যে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে সামনে আসছে দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও অসহায় মানুষের দুর্বলতাকে কাজে লাগানো।
আরটিভি/এসকে



