
করোনাভাইরাসের আতঙ্ক কাটতে না কাটতেই নতুন এক ভাইরাসকে ঘিরে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গবাদি পশুর শরীরে সংক্রমণ ঘটানো শামোন্ডা ভাইরাস এবার মানুষের শরীরেও শনাক্ত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হচ্ছে।
ফ্রান্সে ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার শরীরে ভাইরাসটির উপস্থিতি পাওয়ার ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে শামোন্ডা ভাইরাস কি ভবিষ্যতে করোনাভাইরাসের মতো মহামারির কারণ হতে পারে?
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের শরীরে ভাইরাসটির উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার খবর উদ্বেগের কারণ হলেও, এটিকে করোনাভাইরাসের মতো মহামারির সঙ্গে তুলনা করার মতো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো নেই।
শামোন্ডা ভাইরাস অর্থোবুনিয়াভাইরাস গোত্রের একটি ভাইরাস, যা সিম্বু সেরোগ্রুপের অন্তর্ভুক্ত। এটি মূলত গবাদি পশুর মধ্যে সংক্রমণ ঘটায়। মশা ও অন্যান্য রক্তচোষা ক্ষুদ্র পতঙ্গের মাধ্যমে ভাইরাসটি পশুর শরীরে ছড়াতে পারে।
গরু, ছাগল ও ভেড়ার মতো প্রাণীর মধ্যে এ ধরনের ভাইরাসের সংক্রমণ পশুর স্বাস্থ্য এবং প্রজননব্যবস্থায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে শামোন্ডা ভাইরাসের কারণে পশু ও মানুষের মধ্যে কী ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে, তা নির্ধারণে আরও নির্ভরযোগ্য গবেষণার প্রয়োজন।
ফ্রান্সে এক ব্যক্তির শরীরে ভাইরাসটির উপস্থিতি শনাক্ত হওয়ার খবর সামনে আসার পর বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ওই ব্যক্তি আগে থেকেই গুরুতর স্বাস্থ্যগত জটিলতায় ভুগছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তার মৃত্যুর সঙ্গে ভাইরাসটির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রয়োজন।
একই সঙ্গে কীভাবে ওই ব্যক্তি সংক্রমিত হয়েছিলেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আক্রান্ত পতঙ্গের কামড়ের মাধ্যমে সংক্রমণ ঘটেছিল কি না, তা নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত না হলে সংক্রমণের উৎস সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
শামোন্ডা ভাইরাসকে করোনাভাইরাসের চেয়ে বেশি ভয়ংকর বলার মতো কোনো প্রতিষ্ঠিত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। করোনাভাইরাসের ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সক্ষমতা বড় ধরনের বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসংকট তৈরি করেছিল।
অন্যদিকে, শামোন্ডা ভাইরাসের ক্ষেত্রে মানুষ থেকে মানুষে সংক্রমণের ধারাবাহিকতা বা ব্যাপক বিস্তারের প্রমাণ সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। ভাইরাসটির প্রকৃত ঝুঁকি নির্ধারণে এর সংক্রমণপদ্ধতি, মানুষের শরীরে রোগ সৃষ্টির ক্ষমতা এবং সম্ভাব্য বিস্তার নিয়ে আরও গবেষণা জরুরি।
তাই শুধু একজন মানুষের শরীরে ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার খবরের ভিত্তিতে আসন্ন মহামারির আশঙ্কা করা বৈজ্ঞানিকভাবে যুক্তিসংগত নয়।
প্রাণী থেকে মানুষের শরীরে নতুন বা আগে অজানা সংক্রমণ শনাক্ত হলে জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ সাধারণত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করে। কারণ, কোনো ভাইরাসের সংক্রমণপদ্ধতি বা রোগ সৃষ্টির ধরনে পরিবর্তন ঘটছে কি না, তা দ্রুত শনাক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।
শামোন্ডা ভাইরাসের ক্ষেত্রেও সংক্রমণের উৎস, আক্রান্ত ব্যক্তির চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য এবং ভাইরাসটির জিনগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ইউরোপীয় রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নিয়েছে, তা নিশ্চিত করতে তাদের আনুষ্ঠানিক হালনাগাদ তথ্য যাচাই করা জরুরি।
বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে শামোন্ডা ভাইরাসকে করোনাভাইরাসের মতো সম্ভাব্য মহামারি হিসেবে বিবেচনা করার যথেষ্ট কারণ নেই। তবে বিষয়টিকে একেবারে উপেক্ষা করাও ঠিক হবে না।
পশুর মধ্যে অস্বাভাবিক অসুস্থতা দেখা দিলে দ্রুত প্রাণিসম্পদ কর্তৃপক্ষকে জানানো, খামারে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা এবং মশা ও অন্যান্য রোগবাহক পতঙ্গ নিয়ন্ত্রণে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে, শামোন্ডা ভাইরাস নিয়ে উদ্বেগের মূল কারণ হলো মানুষের শরীরে এর উপস্থিতির খবর এবং এর প্রকৃত ঝুঁকি সম্পর্কে সীমিত তথ্য। আতঙ্ক নয়, বরং নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্য, গবেষণা এবং জনস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার ভিত্তিতেই পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
আরটিভি/এসকে


