
জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব আগামী ১ জানুয়ারি দায়িত্ব নেবেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে শক্তিগুলোর নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক সংস্থাটি গড়ে উঠেছিল, ৮১ বছর বয়সী সেই প্রতিষ্ঠান এখন ক্রমেই জটিল হয়ে ওঠা বিশ্বের নানা সংকট মোকাবিলায় নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে।
জটিল হয়ে ওঠা এই বিশ্বে জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিবের সামনে কী ধরনের চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করছে, তা নিয়ে সোমবার (৫ অক্টোবর) প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে এপি নিউজ।
একসময় বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাত ও সংকট সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত জাতিসংঘ। কিন্তু ইরান, ইউক্রেন ও গাজায় চলমান যুদ্ধ বন্ধের প্রচেষ্টায় গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে সংস্থাটির ভূমিকা অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পাওনা কয়েক শ কোটি ডলারসহ আর্থিক সংকটের কারণে জাতিসংঘকে মানবিক সহায়তা ও উন্নয়ন কর্মসূচিতে বড় ধরনের কাটছাঁট করতে হয়েছে।
গত সপ্তাহে শেষ হওয়া জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতাদের বক্তব্যে পরবর্তী মহাসচিবের সামনে থাকা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো স্পষ্ট হয়েছে।
বিদায়ী মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সাধারণ পরিষদে দেওয়া বিদায়ী ভাষণে বলেন, বিশ্বের এখন দুর্বল জাতিসংঘের প্রয়োজন নেই। এমন একটি জাতিসংঘ প্রয়োজন, যা বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতার মোকাবিলা করতে যথেষ্ট শক্তিশালী এবং ভবিষ্যৎ বিশ্বকে আরও ভালোভাবে গড়ে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
১০ বছর জাতিসংঘের নেতৃত্ব দেওয়ার পর গুতেরেস বলেন, সবার জন্য কার্যকর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলাই সংস্থাটির সবচেয়ে বড় শক্তি।
তিনি বলেন, মানবতা ক্ষমতাকে কতটা বিচক্ষণতার সঙ্গে পরিচালনা করতে পারে, তার ওপরই যৌথ ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে।
গুতেরেস জাতিসংঘের পরবর্তী নেতৃত্ব ও বিশ্বের ১৯৩টি সদস্যরাষ্ট্রের সামনে কয়েকটি বড় প্রশ্নও রাখেন। আইনের শাসনকে দায়মুক্তির স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার আগেই রক্ষা করা যাবে কি না, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আগে যুদ্ধ বন্ধ করা যাবে কি না, সমাজ ভেঙে পড়ার আগে বৈষম্য কমানো যাবে কি না—এসব প্রশ্ন তোলেন তিনি।
একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের বিপজ্জনক সীমা অতিক্রমের আগেই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া এবং এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার আগেই তা পরিচালনার ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান গুতেরেস।
২১ শতকের উপযোগী করতে হবে জাতিসংঘকে
জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়া এখনো চলছে। তবে তার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের কাঠামোর পরিবর্তে ২১ শতকের বাস্তবতা অনুযায়ী জাতিসংঘকে নতুনভাবে সাজানো।
উন্মুক্ত সমাজ ইনস্টিটিউটের প্রচার বিভাগের পরিচালক কিজিতো বিয়েঙ্কিয়া বলেন, কয়েক দশকের মধ্যে জাতিসংঘের সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব অপেক্ষা করছে নতুন মহাসচিবের জন্য।
তার মতে, দীর্ঘদিন পর জাতিসংঘ এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে আর্থিক সংকটের কারণে বাজেট কমানো, বিভিন্ন কর্মসূচি ও সংস্থাকে একীভূত করা এবং শত শত পুরোনো নির্দেশনা বাতিলের চেষ্টা চলছে।
তবে একই সময়ে নতুন মহাসচিবের ওপর বিশ্বজুড়ে সংঘাত নিরসনে আরও সক্রিয় হওয়ার চাপও থাকবে বলে জানান তিনি।
বিয়েঙ্কিয়া প্রয়াত মহাসচিব কফি আনানের উদাহরণ দিয়ে বলেন, তিনি বিভিন্ন সংঘাতে সরাসরি যুক্ত হয়েছিলেন এবং দক্ষ মধ্যস্থতাকারী ও আলোচক হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
গাজা, সুদান ও ইউক্রেনসহ সাম্প্রতিক বিভিন্ন সংঘাতের দিকে তাকিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন—এসব সংকটে জাতিসংঘের ভূমিকা কোথায়? তার মতে, কফি আনানের সময় জাতিসংঘ সংঘাত নিরসনের কেন্দ্রীয় ভূমিকায় ছিল।
সংস্কারের কথা সহজ, বাস্তবায়ন কঠিন
জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে একের পর এক বিশ্বনেতা সংস্থাটির সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। কিন্তু বাস্তবে সংস্কারের উদ্যোগ নিতে গেলেই বিভিন্ন দেশের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য দেখা দেয়।
বিশেষ করে জাতিসংঘের সবচেয়ে ক্ষমতাধর সংস্থা নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অচলাবস্থা চলছে।
জাতিসংঘের সব সদস্যদেশই চায় নিরাপত্তা পরিষদে বর্তমান বিশ্বের বাস্তব প্রতিফলন থাকুক। কিন্তু পরিষদে নতুন সদস্য যুক্ত করার পদ্ধতি নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে ব্যাপক মতবিরোধ রয়েছে।
নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স—ভেটো ক্ষমতা ধরে রেখেছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাদের প্রভাব সবচেয়ে বেশি।
অন্যদিকে প্রায় দেড়শ কোটি মানুষের মহাদেশ আফ্রিকার কোনো স্থায়ী আসন নেই। লাতিন আমেরিকারও কোনো স্থায়ী আসন নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অস্তিত্বের হুমকিতে থাকা দ্বীপরাষ্ট্রগুলোরও নেই স্থায়ী প্রতিনিধিত্ব।
ঘানার প্রেসিডেন্ট জন মাহামা গত সপ্তাহে বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে বলেন, নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার আফ্রিকার প্রতি কোনো দয়া নয়; বরং জাতিসংঘের বৈধতা, বিশ্বাসযোগ্যতা ও টিকে থাকার জন্য এটি অপরিহার্য।
নতুন মহাসচিবের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
ঘানার প্রেসিডেন্ট জন মাহামা বলেন, বিশ্ব এখন তীব্র বিভক্তি, বাড়তে থাকা বৈষম্য এবং বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি কমে যাওয়া আস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্বব্যবস্থার বিপজ্জনক ভাঙন ঠেকানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি একতরফাভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা বাড়ার বিষয়েও সতর্ক করেন।
তিনি জাতিসংঘ সনদের কথা স্মরণ করিয়ে বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধসহ বিংশ শতাব্দীর দুটি বিশ্বযুদ্ধের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতেই জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। তাই ‘শক্তিই ন্যায়’—এমন ধারণার পরিবর্তে জাতিসংঘ সনদের মূলনীতি প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত।
সূত্র: এপি
আরটিভি/জেএমএ


