
পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের বেঁচে থাকা নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠে গেছে। তার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কোনও নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই বলে দাবি করেছেন তার ছেলে কাসিম ও সুলাইমান।
তাদের দাবি, গত সাত মাস ধরে চিকিৎসক, পরিবারের সদস্য এবং আইনজীবীদের কেউই দেখা করতে পারছেন না ইমরান খানের সঙ্গে।
কাসিম ও সুলাইমান ইসা খান বলেন, আমাদের কাছে বাবার কোনো আপডেট নেই। কারণ, গত সাত মাস ধরে পরিবার, চিকিৎসক ও আইনজীবীদেরকে তার সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। খবর সিএনএনের
এ অবস্থায় ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ ও সমাবেশ করেছেন তার দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) হাজারো নেতাকর্মী। এসব কর্মসূচি থেকে সাবেক এই ক্রিকেটার ও রাজনীতিক এবং তার স্ত্রী বুশরা বিবির মুক্তির দাবি জানানো হয়েছে।
২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ইমরান খান। ২০২২ সালে পার্লামেন্টে অনাস্থা ভোটে পতন হয় তার সরকারের। এরপর ২০২৩ সালে দুর্নীতি এবং রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্য প্রকাশসহ বিভিন্ন অভিযোগে তার সাজা হয়। তবে, ইমরান খান ও তার সমর্থকেরা এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে আসছেন। তাদের মতে, বর্তমান সরকারের বিরোধিতা করার কারণেই এসব মামলা করা হয়েছে।
ইমরান খানের দুই ছেলে কাসিম ও সুলাইমান বর্তমানে যুক্তরাজ্যের লন্ডনে বসবাস করছেন। ২০০৪ সালে ইমরান খানের সঙ্গে তাদের মা জেমিমা গোল্ডস্মিথের বিবাহবিচ্ছেদ হওয়ার পর থেকে লন্ডনে আছেন তারা।
বাবার কারাবন্দিত্বের পর থেকেই তারা তার মুক্তির দাবিতে সোচ্চার। কাসিম ও সুলাইমান দাবি করেন, গণমাধ্যমে বাবার বিষয়ে কথা বলার পর পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ তাদের ইমরানের সঙ্গে দেখা করার ক্ষেত্রে নতুন নতুন বাধা তৈরি করে। কখনো তাদের ভিসা দিতে দেরি করা হয়েছে, আবার কখনো বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতায় তাদের আটকে রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
কাসিম বলেন, আমরা চেষ্টা করছি, আমরা যেতে চাই। কিন্তু কিছুই হচ্ছে না। আমাদের ভিসা না দেওয়ার কোনো কারণ নেই।
তবে, কাসিম ও সুলাইমানের এই অভিযোগকে বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেছে পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দুজনের কাছেই ওভারসিজ পাকিস্তানিজদের জন্য ন্যাশনাল আইডেন্টিটি কার্ড রয়েছে। এই কার্ড থাকলে পাকিস্তানে প্রবেশের জন্য তাদের ভিসার প্রয়োজন হওয়ার কথা নয়।
কিন্তু, কাসিম ও সুলাইমান জানিয়েছেন, তাদের ওই কার্ডের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে এবং সেগুলো নবায়ন করা হয়নি। পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় তাদের এই দাবি নিয়ে কোনো জবাব দেয়নি।
ইমরান খান ও তার স্ত্রী বুশরা বিবির পরিবারের সদস্য এবং আইনজীবীদের সঙ্গে দেখা করার অধিকার পুনর্বহালের দাবি জানিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও।
সম্প্রতি এক বিবৃতিতে অ্যামনেস্টি বলেছে, ইমরান খান ও তার স্ত্রী বুশরা বিবিকে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবা দিতে হবে। একইসঙ্গে তাদের একাকী বন্দিত্বও অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। সংস্থাটির মতে, এ ধরনের একাকী বন্দিত্ব আইনসম্মত নয়।
এদিকে, ইমরান খানকে সাত মাস ধরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় রাখা হয়েছে— এমন অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে পাকিস্তান সরকার।
পাকিস্তান সরকারের দাবি, ইমরান খান তার পরিবার ও অন্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের সুযোগ পাচ্ছেন। সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ২১ মার্চ ইমরান তার এক ছেলের সঙ্গে সর্বশেষ ফোনে কথা বলেছেন। এই ফোনকলই প্রমাণ করে যে ইমরানের সঙ্গে যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ করা হয়নি। বরং পাকিস্তানের কারাগারের নিয়ম, আদালতের নির্দেশ, অনুমোদিত সময়সূচি এবং একজন গুরুত্বপূর্ণ বন্দির নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনা করে তার যোগাযোগ নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে।
ইমরান খানের শারীরিক অবস্থা নিয়েও নিজেদের অবস্থান জানিয়েছে পাকিস্তান সরকার। ইসলামাবাদের দাবি, ইমরান খান বর্তমানে সচেতন ও স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছেন। তার শারীরিক অবস্থায় কোনো গুরুতর বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা অবনতি হয়নি।
সরকার আরও জানিয়েছে, ইমরান নিয়মিত চিকিৎসা, ওষুধ এবং চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা ও ফলোআপ পাচ্ছেন। কারাগারের নিয়ম ও আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী তার চিকিৎসা চলছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
ইমরান কারাগারে কী ধরনের পরিবেশে থাকছেন, তারও বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছে পাকিস্তান সরকার। বলা হচ্ছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে একটি বিশেষ সাত কক্ষের কমপ্লেক্সে রাখা হয়েছে। ওই স্থাপনাটি প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন বন্দির জন্য তৈরি করা হয়েছে। সেখানে ৫৭ ফুট বাই ১৪ ফুটের একটি করিডর এবং ৩৫ ফুট বাই ৩৭ ফুটের একটি লন রয়েছে। এছাড়া, সেখানে একটি বিছানা, গদি, চারটি বালিশ, কম্বল, টেবিল, চেয়ার, স্যানিটেশন সুবিধা এবং ব্যায়ামের সরঞ্জামও রয়েছে।
পাকিস্তান সরকারের দাবি, ইমরানের থাকার এই ব্যবস্থা তাকে বিচ্ছিন্ন, অবহেলিত বা শাস্তিমূলকভাবে রাখা হয়েছে—এমন অভিযোগের সঙ্গে কোনোভাবেই মেলে না।
তবে, মানবাধিকার সংস্থাগুলো পাকিস্তান সরকারের এই বক্তব্যে সন্তুষ্ট হবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এর আগে ইমরানের দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও সমর্থকদের ব্যাপক গ্রেপ্তারকে ইচ্ছামতো আটক হিসেবে বর্ণনা করেছে।
অ্যামনেস্টির তথ্য অনুযায়ী, ইমরান খানের দলের অনেক নেতাকর্মী এখনও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আটক রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৮৫ জনকে সামরিক আদালতে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
পাকিস্তান সরকারের বক্তব্য নিয়ে সন্তুষ্ট নন ইমরান খানের দুই ছেলেও। কাসিম জানান, তাদের বাবার কোনো স্বাস্থ্য প্রতিবেদন তাদের দেখানো হচ্ছে না। ফলে কারাগারে থাকার সময় ইমরানের শারীরিক অবস্থার কতটা অবনতি হয়েছে, সে বিষয়ে তারা নিশ্চিত হতে পারছেন না।
তিনি বলেন, তারা আমাদের কোনো ধরনের স্বাস্থ্য প্রতিবেদন দেখাতে অস্বীকার করছে। তাই তার স্বাস্থ্য এর মধ্যে উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ হয়ে থাকতে পারে।
ইমরানের দলের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তারের বিষয়টিও তুলে ধরেন কাসিম। তার দাবি, পিটিআইয়ের অনেক নেতা-কর্মী এখনো সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আটক রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৮৫ জনকে সামরিক আদালতে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
ইমরান খান পাকিস্তান সরকারের সঙ্গে কোনো ধরনের রাজনৈতিক সমঝোতায় যাবেন কি না—এমন প্রশ্নেরও জবাব দিয়েছেন তার দুই ছেলে।
সুলাইমান বলেন, তার বাবা এমন কোনো সমঝোতায় রাজি হবেন না, যার ফলে অন্য রাজনৈতিক বন্দিরা কারাগারেই থেকে যাবেন। অন্য রাজনৈতিক বন্দিদের ক্ষেত্রেও কোনো ধরনের সমাধান না হলে ইমরান এককভাবে সরকারের সঙ্গে কোনো চুক্তিতে যাবেন না বলেই মনে করেন তিনি।
কাসিমও মনে করেন, ইমরানের সঙ্গে সরকারের সমঝোতার সম্ভাবনা কম। তবে তিনি বলেন, বিষয়টি নিশ্চিত করে বলা কঠিন।
ইমরানের দুই ছেলে শুধু তাদের বাবার মুক্তি নয়, পাকিস্তানের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। কাসিম বলেন, আমি জানি, অনেক কিছুই ঘটছে। কিন্তু এটি সবচেয়ে হতাশাজনক বিষয়গুলোর একটি। শুধু ছেলে হিসেবে নয়, পুরো দেশের জন্যই এটি খুবই হতাশাজনক।
কাসিম আরও বলেন, ৩৫ কোটি মানুষ ইমরান খানকে ভোট দিয়েছে, তাকে সমর্থন করে এবং চায় তিনি দেশ পরিচালনা করুন। অথচ তাদের পছন্দের সেই ব্যক্তিকে দূরে সরিয়ে রাখা হয়েছে এবং তিনি কোনো ভালো কারণ ছাড়াই কারাগারের পেছনে রয়েছেন।
ইমরান খানের দুই ছেলের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর শারীরিক অবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে তার কারাবন্দিত্ব, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ এবং পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
আরটিভি/এসএইচএম


