
১ বছর নয়, টানা ১১ বছর ক্যানসারের চিকিৎসা নিয়েছেন যুক্তরাজ্যের বেকি জোন্স। কিন্তু ৩৪ বছর বয়সে এসে জানতে পারেন, তার শরীরে কখনোই ক্যানসার ছিল না। ভুল রোগ নির্ণয়ের কারণে বছরের পর বছর তাকে অপ্রয়োজনীয় কেমোথেরাপি নিতে হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। খবর বিবিসির।
২০১২ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে তীব্র মাইগ্রেনের কারণে চিকিৎসকের কাছে যান বেকি। পরে তার মস্তিষ্কে প্রাণঘাতী গ্রেড-৪ গ্লিওব্লাস্টোমা টিউমার রয়েছে বলে তাকে জানানো হয়। বলা হয়, চিকিৎসা না নিলে কয়েক মাসের মধ্যেই তার মৃত্যু হতে পারে।
এরপর বেকিকে টেমোজোলোমাইড (টিএমজেড) নামের কেমোথেরাপির ওষুধ দেওয়া শুরু হয়। তার দাবি, চিকিৎসক তাকে বলেছিলেন, জীবনের বাকি সময়ই এই ওষুধ নিতে হবে। অথচ সাধারণ চিকিৎসা নির্দেশিকায় এ ধরনের কেমোথেরাপি সাধারণত ছয় মাসে ছয়টি সাইকেলের মতো দেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
বেকি জানান, একাধিক স্ক্যানে মস্তিষ্কে টিউমারের স্পষ্ট কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় তিনি চিকিৎসা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। তবে তাকে বলা হয়েছিল, টিউমারটি স্ক্যানে দৃশ্যমান নাও হতে পারে।
বছরের পর বছর কেমোথেরাপির কারণে বমি বমি ভাব, পেটব্যথা, মুখে ঘা ও চরম ক্লান্তিতে ভুগেছেন বেকি। সংক্রমণের আশঙ্কায় সামাজিক অনুষ্ঠান ও পারিবারিক জমায়েত এড়িয়ে চলতে হতো তাকে। চিকিৎসার কারণে তার কর্মজীবনও বাধাগ্রস্ত হয়। এমনকি চিকিৎসকেরা তাকে জানিয়েছিলেন, তিনি সন্তান ধারণ করতে পারবেন না। পরে অবশ্য তার দুটি সন্তান হয়।
২০২৪ সালে হঠাৎ তার কেমোথেরাপি বন্ধ করে দেওয়া হয়। তখন তাকে জানানো হয়, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক অবসরে গেছেন। এরপর নতুন করে বিষয়টি পর্যালোচনা শুরু হলে ২০২৫ সালে বেকি জানতে পারেন, তার মূল রোগ নির্ণয়ই ভুল ছিল।
স্বাধীন নিউরোসার্জন ও রেডিওলজিস্টদের বিশ্লেষণে জানা যায়, বেকির কখনোই মস্তিষ্কে ক্যানসার ছিল না। তিনি আসলে ‘টিউমেফ্যাকটিভ ডিমাইলিনেশন’ নামের এক ধরনের প্রদাহজনিত রোগে আক্রান্ত ছিলেন। এ রোগ সাধারণত নিউরোলজিস্টরা চিকিৎসা করেন এবং শক্তিশালী স্টেরয়েড দিয়ে এর চিকিৎসা করা যায়।
বেকির অভিযোগ, ভুল রোগ নির্ণয়ের কারণে তার প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ১১ বছর অপ্রয়োজনীয় ক্যানসার চিকিৎসার মধ্যে কেটেছে। তিনি বলেন, তাকে বারবার বলা হয়েছিল কেমোথেরাপি না নিলে তিনি মারা যাবেন।
বেকির মতো ৪০ জনের বেশি রোগী ইউনিভার্সিটি হসপিটালস কভেন্ট্রি অ্যান্ড ওয়ারউইকশায়ার (ইউএইচডব্লিউ) এনএইচএস ট্রাস্টের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, প্রয়োজনের তুলনায় দীর্ঘ সময় বা অপ্রয়োজনীয়ভাবে তাদের ক্যানসারের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
রয়্যাল কলেজ অব ফিজিশিয়ানসের প্রাথমিক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ওই হাসপাতালে কিছু রোগীকে দীর্ঘ সময় টিএমজেড দেওয়া হয়েছে, অথচ এর উপকারিতার পক্ষে সামান্য বা কোনো প্রমাণ ছিল না। পর্যালোচনা করা ২০টি মামলার মধ্যে ১৫টিকে সামগ্রিকভাবে ‘অসন্তোষজনক’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে রোগীদের টিএমজেড ব্যবহারের ঝুঁকি যথাযথভাবে বোঝানো ও নথিভুক্ত না করা, চিকিৎসকদের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি এবং কিছু ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ‘ক্লিনিক্যাল কৌতূহলের’ অভাবের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে ইউনিভার্সিটি হসপিটালস কভেন্ট্রি অ্যান্ড ওয়ারউইকশায়ার এনএইচএস ট্রাস্ট জানিয়েছে, তারা ব্যক্তিগত রোগীর বিষয়ে মন্তব্য করবে না। তবে টিএমজেড প্রেসক্রিপশন ও ব্যবহারের ওপর আরও শক্তিশালী তদারকি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আক্রান্ত রোগীদের জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের মাধ্যমে পুনর্মূল্যায়ন করে উপযুক্ত চিকিৎসা পরিকল্পনাও করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ট্রাস্ট।
বেকির ভাষায়, ঘটনাটি শুধু একজন চিকিৎসকের ভুলের বিষয় নয়; বরং এত দীর্ঘ সময় ধরে সেই ভুল কীভাবে নজরদারির বাইরে থাকল, সেটিও বড় প্রশ্ন।
আরটিভি/এসকে


