
বয়স মাত্র ১২ বছর। অথচ এই বয়সেই ১০০টির বেশি পাখির ডাক হুবহু নকল করতে পারেন যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমার স্যামুয়েল হেন্ডারসন। নিজের কণ্ঠ, জিহ্বা ও শ্বাসের নিয়ন্ত্রণ কাজে লাগিয়ে পাখির মতো শব্দ তৈরি করে ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছেন তিনি।
২০২৪ সালে স্কুলের একটি প্রতিভা প্রদর্শনীতে স্যামুয়েলের পাখির ডাক নকল করার ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি আলোচনায় আসেন। তখন তার বয়স ছিল ১০ বছর এবং প্রায় ৫০ ধরনের পাখির ডাক নকল করতে পারতেন। বর্তমানে তাঁর সংগ্রহে ১০০টির বেশি পাখির ডাক রয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে তাঁর নকল করতে পারা পাখির ডাকের সংখ্যা ১২০ থেকে ১৩০টির বেশি বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
স্যামুয়েলের পাখির প্রতি আগ্রহ অবশ্য আরও ছোটবেলা থেকেই। চার বছর বয়সে চিড়িয়াখানায় একটি গ্রেট-টেইলড গ্র্যাকলের ডাক নকল করেছিলেন তিনি। এরপর পাখিটি পাল্টা সাড়া দিলে পাখির ডাক শেখার প্রতি তাঁর আগ্রহ আরও বেড়ে যায়।
পরে বাইরে পাখির ডাক শোনা, বিভিন্ন ভিডিও দেখা এবং পাখি শনাক্ত করার নানা উপকরণ ব্যবহার করে একের পর এক পাখির ডাক নকল করতে শেখেন স্যামুয়েল। তার নকল করা পাখির মধ্যে রয়েছে নর্দার্ন কার্ডিনাল, আমেরিকান রবিন, মর্নিং ডাভ, রেড-টেইলড হক, ব্যার্ড আউল ও বাল্ড ঈগলসহ বিভিন্ন প্রজাতি।
স্যামুয়েলের বিশেষত্ব শুধু অনেক পাখির ডাক নকল করতে পারার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। তার তৈরি শব্দ অনেক সময় আসল পাখির ডাকের এতটাই কাছাকাছি হয় যে আশপাশের বন্য পাখিও সাড়া দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে তাকে পাখির ডাক দেওয়ার পর কাছাকাছি থাকা পাখির প্রতিক্রিয়া পেতে দেখা গেছে।
এমনকি তার কিছু নকল করা ডাক পাখি শনাক্ত করার বিভিন্ন যন্ত্র ও ব্যবস্থায় আসল পাখির ডাক হিসেবে শনাক্ত হয়েছে বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নতুন কোনো পাখির ডাক শেখার পদ্ধতিও বেশ চমকপ্রদ। স্যামুয়েল প্রথমে ডাকটি বারবার শোনেন। এরপর শব্দটির বিভিন্ন অংশ আলাদা করে বোঝার চেষ্টা করেন। পরে নিজের গলা, জিহ্বা ও শ্বাসের ব্যবহার পরিবর্তন করে সেই শব্দ তৈরির অনুশীলন করেন।
তবে সব পাখির ডাক নকল করা তার পক্ষেও সম্ভব হয় না। কিছু পাখির ডাক অত্যন্ত জটিল বা খুব বেশি উচ্চস্বরের হওয়ায় সেগুলো অনুকরণ করা কঠিন বলে জানিয়েছেন তিনি।
পাখির প্রতি স্যামুয়েলের আগ্রহ শুধু ডাক নকলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পাখি দেখার সময় তিনি বিভিন্ন প্রজাতির আচরণ, আবাসস্থল ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কেও জানার চেষ্টা করেন। তাঁর পছন্দের পাখির মধ্যে রয়েছে রেজপ্লেনডেন্ট কুয়েটজাল ও অস্ট্রেলিয়ান ম্যাগপাই।
২০২৪ সালের স্কুলের প্রতিভা প্রদর্শনীতে গ্রেট হর্নড আউল, ওয়াইল্ড টার্কি, কানাডা গুজ ও রেড-টেইলড হকের ডাক নকল করে সহপাঠীদের চমকে দিয়েছিলেন স্যামুয়েল। তাঁর মায়ের প্রকাশ করা সেই ভিডিও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
এরপর দ্রুত বাড়তে থাকে তার পরিচিতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার অনুসারীর সংখ্যা কয়েক লাখে পৌঁছেছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেওয়ার পাশাপাশি স্কুল, স্থানীয় অনুষ্ঠান ও প্রকৃতিবিষয়ক আয়োজনে নিজের প্রতিভা প্রদর্শন করেছেন তিনি।
চলতি বছরের আগস্টে আরকানসাসের হট স্প্রিংস কর্তৃপক্ষ জানায়, অক্টোবরে একটি পাখি পর্যবেক্ষণ উৎসবে অংশ নেবেন স্যামুয়েল। আয়োজকদের পক্ষ থেকে তাকে ১২০টির বেশি পাখির ডাক নকল করতে সক্ষম এক তরুণ পাখিপ্রেমী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে ফিলাডেলফিয়া ঈগলসও তাকে দলের প্রশিক্ষণ শিবিরে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। সেখানে খেলোয়াড়দের সামনে পাখির ডাক নকল করে দেখান তিনি।
মানুষের পক্ষে পাখির ডাক হুবহু নকল করা সহজ নয়। পাখির শব্দ তৈরির বিশেষ অঙ্গের নাম সিরিংক্স, যা শ্বাসনালির গোড়ায় থাকে। এর মাধ্যমে তারা অত্যন্ত জটিল ও বৈচিত্র্যময় শব্দ তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে মানুষের রয়েছে স্বরযন্ত্র। তাই পাখির ডাকের কাছাকাছি শব্দ তৈরি করতে মানুষের কণ্ঠ, জিহ্বা, মুখ ও শ্বাসের ওপর অসাধারণ নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন।
স্যামুয়েলের এই প্রতিভা তাকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচিত করে তোলার পাশাপাশি পাখি ও প্রকৃতি সংরক্ষণ নিয়েও মানুষের আগ্রহ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছে। ভবিষ্যতে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও পরিবেশবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনার আগ্রহ রয়েছে তার। নিজের এই আগ্রহের মাধ্যমে অন্য শিশুদেরও প্রকৃতির কাছে যেতে এবং পাখি সম্পর্কে জানতে উৎসাহ দিতে চান তিনি।
ছোটবেলার একটি শখ থেকে শুরু হয়েছিল যাত্রা। কয়েক বছর ধরে পাখির ডাক শোনা, পর্যবেক্ষণ ও নিয়মিত অনুশীলনের মাধ্যমে সেই শখই এখন অসাধারণ দক্ষতায় পরিণত হয়েছে। মাত্র ১২ বছর বয়সেই ১০০টির বেশি পাখির ডাক নকল করার ক্ষমতা দিয়ে স্যামুয়েল এখন যুক্তরাষ্ট্রের পরিচিত তরুণ পাখিপ্রেমীদের একজন।
সূত্র: ইয়াহু নিউজ, এবিসি নিউজ ও ন্যাশনাল অডুবন সোসাইটি।
আরটিভি/জেএমএ


