
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় সারোগেসি কাণ্ডে আলোচিত দম্পতি গুওজুন শুয়ান ও সিলভিয়া ঝাংকে শিশু নির্যাতনের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) তাদের বিরুদ্ধে শিশু নির্যাতনের ষড়যন্ত্র ও সাক্ষীকে ভয় দেখানোসহ একাধিক অভিযোগ আনা হয়।
লস অ্যাঞ্জেলেসের জেলা অ্যাটর্নি নাথান জে. হকম্যান জানান, দম্পতির বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সকালে লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টি শেরিফ বিভাগের গোয়েন্দারা আর্কাডিয়ার নিজ বাড়ি থেকে তাদের গ্রেপ্তার করেন। পরে তাদের পাসাডেনা আদালতে নেওয়া হয়। আদালতে দুজনই নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। প্রত্যেককে ২ কোটি মার্কিন ডলার করে জামিনে আটক রাখা হয়েছে।
গত বছরের জুলাইয়ে এই দম্পতির আর্কাডিয়ার প্রাসাদে অভিযান চালিয়ে ২১ শিশুকে হেফাজতে নেয় কর্তৃপক্ষ। এসব শিশুর বেশির ভাগই সারোগেসির মাধ্যমে জন্ম নেওয়া।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) প্রতিবেশীরা জানান, দম্পতির বাড়ির আশপাশে পুলিশের উপস্থিতি ও হেলিকপ্টার দেখা যায়। পুরো এলাকা ঘিরে ফেলা হয়েছিল।
জেলা অ্যাটর্নি নাথান হকম্যান বলেন, আদালতে দাখিল করা অভিযোগে ভয়াবহ শাস্তি, মারধর ও শিশু নির্যাতনের যেসব তথ্য উঠে এসেছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তিনি ওই বাড়িটিকে ‘ভয়ের বাড়ি’ হিসেবেও উল্লেখ করেন।
কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০২৫ সালের মে মাসে তদন্তের শুরু হয়। ওই সময় সিলভিয়া ঝাং মাথায় আঘাত পাওয়া দুই মাস বয়সী একটি শিশুকে হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালের কর্মীদের কাছে আঘাতের কারণ সম্পর্কে তিনি অসত্য তথ্য দিয়েছেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানায়।
লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টি শেরিফ রবার্ট লুনা জানান, আর্কাডিয়া পুলিশ ওই বাড়িতে গিয়ে এমন কিছু দেখতে পায়, যা আরও গুরুতর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, দম্পতির বাড়িতে থাকা ২১ শিশুকে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা করে তিনটি আলাদা কক্ষে বসিয়ে রাখা হতো। এসব কক্ষকে শিক্ষাকেন্দ্র বলা হতো। বিভিন্ন পরিচর্যাকারী সেখানে শিশুদের দেখভাল করতেন।
জেলা অ্যাটর্নি জানান, বাড়ির বিভিন্ন কক্ষে মোট ৩২টি নড়াচড়া শনাক্ত করতে পারে এমন ক্যামেরা বসানো ছিল। এসব ক্যামেরার দৃশ্য দম্পতির ডেস্কের কাছে থাকা একটি টেলিভিশনে দেখা যেত। সেখান থেকে তারা পরিচর্যাকারীদের দেওয়া শাস্তি পর্যবেক্ষণ করতেন বলে অভিযোগ।
হকম্যান বলেন, ক্যামেরার ফুটেজে পরিচর্যাকারীদের শিশুদের চড়, থাপ্পড় ও মারধর করতে দেখা গেছে। চুনমেই লি নামের এক পরিচর্যাকারী দুই মাস বয়সী ওই শিশুটির মাথায় আঘাত করেছিলেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। তার বিরুদ্ধে আগে ১ লাখ ৫ হাজার মার্কিন ডলারের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলেও তিনি এখনো পলাতক।
দম্পতির আইনজীবী মিচেল ক্রেমস বলেন, তার মক্কেল নির্দোষ। তার দাবি, পালিয়ে যাওয়া পরিচর্যাকারীর কর্মকাণ্ডের জন্য শুয়ানকে দায়ী করা হচ্ছে। বড় পরিবার রাখার সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করার কারণেই তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ঘটনায় জড়িত দুই সারোগেট মায়ের আইনজীবী মেলিসা ব্রিসম্যান বলেন, এই ঘটনায় যারা দায়ী তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা হচ্ছে—এটি ভালো খবর। সারোগেসি ব্যবস্থার অপব্যবহার করলে তার পরিণতি হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে ব্রিসম্যান বলেন, যারা সন্তান লাভের জন্য সারোগেসির সহায়তা প্রয়োজন মনে করেন, তাদের জন্য এই ব্যবস্থা চালু থাকা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সারোগেসি ব্যবস্থায় যুক্ত সবার জন্য পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কয়েকজনের অপকর্মের কারণে যেন পুরো ব্যবস্থাটি ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
কর্তৃপক্ষ জানায়, সেপ্টেম্বরের শুরুতে আর্কাডিয়া পুলিশ বিভাগ লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টি শেরিফ বিভাগের সহায়তা চায়। পরে এফবিআইও ওই বাড়িতে তল্লাশি চালানোর জন্য পরোয়ানা কার্যকর করে। শেরিফ বিভাগের তল্লাশি থেকে এটি আলাদা ছিল।
শেরিফ রবার্ট লুনা বলেন, এই ঘটনায় জড়িত ২১ শিশুর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলো একসঙ্গে কাজ করে যাবে।
দম্পতির হয়ে সারোগেসির মাধ্যমে দুটি সন্তানের জন্ম দেওয়া মারিয়া কাস্তেলানোস তাদের গ্রেপ্তারের খবর শুনে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, যা কিছু ঘটেছে, তা বন্ধ করার সুযোগ সবার ছিল, যাতে শিশুদের এত কিছু সহ্য করতে না হতো। পুরো প্রক্রিয়া ও ঘটনার জন্যই তিনি ক্ষুব্ধ বলে জানান।
কাস্তেলানোস বলেন, তিনি সিলভিয়া ঝাংকে বিশ্বাস করেছিলেন।
সূত্র: সিবিএস নিউজ
আরটিভি/জেএমএ


