
যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশি কর্মীদের স্থায়ী বসবাসের অনুমতি বা গ্রিন কার্ড পাওয়ার প্রক্রিয়ায় বড় বাধার মুখে পড়েছে বিশ্বের কয়েকটি বড় তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। দেশটির সরকার ইনফোসিস, টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস, কগনিজ্যান্ট, উইপ্রো, এইচসিএল, মাইক্রোসফট, ক্যাপজেমিনি ও অ্যাডোবিকে স্থায়ী শ্রম সনদ কর্মসূচি থেকে সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রে এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অধীনে কাজ করা ভারতীয় কর্মীদের স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার প্রক্রিয়া অনিশ্চয়তায় পড়েছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মী নিয়োগ ও আইনি শর্ত পূরণের ব্যয় বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকেরা।
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম দপ্তরের সচিব কিথ সন্ডারলিং এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। স্থগিতাদেশের ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর নতুন স্থায়ী শ্রম সনদের আবেদন গ্রহণ করা হবে না। আগে জমা দেওয়া আবেদনগুলোর প্রক্রিয়াও বন্ধ থাকবে। তবে এই পদক্ষেপের ফলে কর্মীদের বর্তমান অস্থায়ী কর্মভিসা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়েছে—এমন তথ্য প্রতিবেদনে নেই।
ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই সিদ্ধান্ত এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিদেশি দক্ষ কর্মী ও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগের মধ্যে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় শুক্রবার (৯ অক্টোবর) এ পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেছে, এতে দুই দেশের অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে সহায়তা হবে না।
স্থায়ী শ্রম সনদ কর্মসূচি কী
যুক্তরাষ্ট্রে চাকরির মাধ্যমে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার ক্ষেত্রে স্থায়ী শ্রম সনদ কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ। এ ব্যবস্থায় কোনো নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানকে প্রমাণ করতে হয়, বিদেশি কর্মী নিয়োগের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মীদের মজুরি বা চাকরির সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। সাধারণত এই প্রক্রিয়ায় নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানই আবেদন করে, কর্মী নিজে নয়।
অনেক দক্ষ বিদেশি কর্মী প্রথমে এইচ-১বি অস্থায়ী কর্মভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে যান। পরে তারা স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার জন্য আবেদন করেন। ফলে স্থায়ী শ্রম সনদ কর্মসূচিতে বাধা তৈরি হলে দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রে থাকার পরিকল্পনা করা কর্মীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে।
২০০৫ সালে চালু হওয়া এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল বিদেশি কর্মীদের স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার প্রক্রিয়া দ্রুত করা। তবে নতুন স্থগিতাদেশের কারণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো আপাতত নতুন আবেদন করতে পারবে না এবং আগের আবেদনগুলোর প্রক্রিয়াও এগোবে না।
মাইক্রোসফটকে নিয়ে ভ্যান্সের অভিযোগ
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের অভিযোগ, কিছু প্রতিষ্ঠান মার্কিন কর্মীদের ছাঁটাই করে তাদের জায়গায় বিদেশি কর্মী নিয়োগ করছে। তার দাবি, মাইক্রোসফট গত বছর ছয় হাজার মার্কিন কর্মী ছাঁটাই করলেও ছয় হাজার ৩০০টি এইচ-১বি ভিসা এবং প্রায় তিন হাজার গ্রিন কার্ডের সুবিধা পেয়েছে।
তবে এসব সংখ্যার ভিত্তিতে ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের প্রত্যেকের জায়গায় বিদেশি কর্মী নিয়োগ করা হয়েছে কি না, তা প্রতিবেদনে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। মাইক্রোসফট জানিয়েছে, গত অর্থবছরে তাদের করা এইচ-১বি ভিসার আবেদনের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিল আগে থেকে কর্মরত ব্যক্তিদের ভিসার মেয়াদ বাড়ানো বা তাদের অবস্থার পরিবর্তনের জন্য; নতুন কর্মী নিয়োগের জন্য নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, স্থায়ী শ্রম সনদ কর্মসূচিতে সবচেয়ে বেশি আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি মাইক্রোসফট।
কতটা প্রভাব পড়তে পারে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানে
বিশ্লেষকদের মতে, স্বল্প মেয়াদে ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর বড় ধরনের প্রভাব নাও পড়তে পারে। তবে দীর্ঘ সময় ধরে অনিশ্চয়তা চললে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মী নিয়োগ, স্থানীয় কর্মী দিয়ে কাজ করানো এবং আইনি শর্ত পূরণের ব্যয় বাড়তে পারে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফার ওপর চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আইসিআইসিআই সিকিউরিটিজের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে জমা দেওয়া স্থায়ী শ্রম সনদের আবেদনের দুই শতাংশেরও কম ছিল ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর। তবে স্থায়ী বসবাসের সুযোগ অনিশ্চিত হয়ে পড়লে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত কর্মীদের প্রতিষ্ঠান ছেড়ে যাওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে।
ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি শিল্পের সংগঠন ন্যাসকম জানিয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রতিষ্ঠানগুলো এইচ-১বি ভিসার ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রে স্থানীয় কর্মী নিয়োগ বাড়িয়েছে। তাদের মতে, এইচ-১বি ভিসা থেকে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়ার জন্য স্থায়ী শ্রম সনদ কর্মসূচি ব্যবহার করেন তুলনামূলক কমসংখ্যক কর্মী।
ভারতের বৃহত্তম তথ্যপ্রযুক্তি সেবা রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস জানিয়েছে, এই স্থগিতাদেশে তাদের কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা বা গ্রাহকদের সেবা দেওয়ার কাজে প্রভাব পড়বে বলে তারা মনে করছে না। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, গত দুই বছরে স্থায়ী শ্রম সনদের জন্য তাদের আবেদন ছিল খুবই কম।
ট্রাম্প প্রশাসনের কঠোর অবস্থান
ট্রাম্প প্রশাসন এইচ-১বি ভিসা ও স্থায়ী শ্রম সনদ কর্মসূচির অপব্যবহার, মজুরি কম দেওয়া এবং ভুয়া আবেদনসংক্রান্ত অভিযোগ খতিয়ে দেখার উদ্যোগ জোরদার করেছে। গত বছরের সেপ্টেম্বরে শ্রম দপ্তর ‘প্রজেক্ট ফায়ারওয়াল’ নামে একটি তদারকি কার্যক্রম শুরু করে। একই বছরের সেপ্টেম্বরে বিদেশ থেকে নিয়োগ করা কর্মীদের জন্য নতুন এইচ-১বি আবেদনে এককালীন এক লাখ ডলারের ফি আরোপের ঘোষণাও আসে।
এর আগে গত মাসে কগনিজ্যান্টের গ্রিন কার্ডসংক্রান্ত আবেদন স্থগিত করা হয়। পাশাপাশি এইচ-১বি ভিসা ও স্থায়ী শ্রম সনদ ব্যবস্থায় সম্ভাব্য জালিয়াতি এবং মানব পাচারের অভিযোগ নিয়ে তদন্ত শুরু করেন কর্মকর্তারা।
যুক্তরাষ্ট্রের শ্রম দপ্তরের দাবি, ২০০৯ সাল থেকে সংশ্লিষ্ট ছয়টি প্রতিষ্ঠান প্রায় ৩০ লাখ বিদেশি কর্মীর জন্য আবেদন করেছে। এর মধ্যে দুই লাখ ৩০ হাজারের বেশি এইচ-১বি ভিসার অনুমোদন এবং এক লাখের বেশি স্থায়ী শ্রম সনদ পেয়েছে বলে জানিয়েছে দপ্তর।
যুক্তরাষ্ট্রে দক্ষ বিদেশি কর্মী নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক দীর্ঘদিনের। সমালোচকদের অভিযোগ, কিছু প্রতিষ্ঠান তুলনামূলক কম মজুরিতে বিদেশি কর্মী নিয়োগ করে মার্কিন কর্মীদের চাকরির সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য ও খাতসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর দাবি, বিদেশি দক্ষ কর্মী নিয়োগের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে স্থানীয় কর্মী নিয়োগও বাড়ানো হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, নতুন স্থগিতাদেশে ভারতীয় কর্মীদের স্থায়ী বসবাসের পথ আরও অনিশ্চিত হতে পারে। তবে ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কতটা হবে, তা নির্ভর করবে স্থগিতাদেশ কত দিন বহাল থাকে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরকার পরবর্তী সময়ে কী পদক্ষেপ নেয় তার ওপর।
সূত্র: দ্য ইন্ডিপ্যান্ডেন্ট
আরটিভি/জেএমএ



