
যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির উচ্চমূল্য কমাতে রাশিয়ার কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ ডিজেল কেনার চুক্তি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ফোনালাপের পর এ ঘোষণা দেন তিনি। ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে মস্কোর ওপর চাপ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের নেওয়া দীর্ঘদিনের নীতির সঙ্গে এই সিদ্ধান্তের বড় ধরনের বিরোধ তৈরি হয়েছে। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমানোর চেষ্টা হিসেবেও দেখা হচ্ছে এ পদক্ষেপকে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প জানান, রাশিয়া অবিলম্বে ৩ লাখ টনের বেশি ডিজেল সরবরাহ করবে। এরপর নভেম্বরে আরও ৫ লাখ টন এবং তার পরপরই ১০ লাখ টন ডিজেল দেওয়া হবে। এর অল্প সময়ের মধ্যে আরও ৩০ লাখ টন ডিজেল সরবরাহ করা হবে বলেও জানান তিনি।
ট্রাম্পের এ ঘোষণা গত মাসে রাশিয়ার বিরুদ্ধে সই করা নতুন নিষেধাজ্ঞা আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ওই আইনের লক্ষ্য ছিল ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অর্থ জোগাতে রাশিয়ার তেল ও গ্যাস থেকে আয় কমিয়ে আনা।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে একে শক্তিশালী অংশীদারদের দুর্বল সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, এ পদক্ষেপ রাশিয়াকে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার সুযোগ দেবে।
ট্রাম্পের প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ ও তার জামাতা জ্যারেড কুশনার যখন ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধের প্রস্তাব নিয়ে মায়ামিতে বৈঠক করছিলেন, তখনই রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল সরবরাহের চুক্তির ঘোষণা আসে।
জেলেনস্কি বলেন, তাদের প্রতিনিধিদলকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে তার মনে হচ্ছে। অংশীদারদের সঙ্গে এমন আচরণ ন্যায্য নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন
ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্তের ফলে রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা কার্যকরের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কংগ্রেসে বিপুল সমর্থনে পাস হওয়া আইনে রাশিয়ার তেল ও গ্যাস কেনে এমন দেশগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ রয়েছে।
মার্কিন সিনেটের ডেমোক্র্যাট নেতা চাক শুমারসহ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ ডেমোক্র্যাট নেতা ট্রাম্পের ঘোষণাকে ইউক্রেন, ইউরোপের মিত্র দেশগুলো এবং যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা বলে অভিহিত করেছেন।
সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল বলেন, ট্রাম্পের এ সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রকে পুতিনের ইউক্রেনবিরোধী যুদ্ধে পরোক্ষভাবে জড়িয়ে ফেলছে। প্রতিনিধি পরিষদের জ্যেষ্ঠ ডেমোক্র্যাট সদস্য ডন বেয়ারও এ ঘোষণায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
গত মাসে সই করা নিষেধাজ্ঞা আইনে রাশিয়ার কর্মকর্তা, ব্যাংক ও তেল পরিবহনে ব্যবহৃত ছায়া নৌবহরের ওপর নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি রাশিয়ায় নতুন মার্কিন বিনিয়োগ এবং দেশটির সরকারি ঋণসংক্রান্ত লেনদেন নিষিদ্ধ করার বিধানও রয়েছে।
আইনে রাশিয়ার তেল বা প্রাকৃতিক গ্যাসের শীর্ষ পাঁচ আমদানিকারক দেশের ওপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। তবে রাশিয়ার গ্যাস আমদানি কমাতে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেওয়া কিছু দেশের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রাখা হয়েছে।
২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন রাশিয়ার তেল ও গ্যাস আমদানি নিষিদ্ধ করে। এরপর থেকে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া থেকে এসব জ্বালানি আমদানি করেনি বলে জানিয়েছে দেশটির জ্বালানি তথ্য প্রশাসন।
ছয় মাসের ছাড় দিল মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়
ট্রাম্পের ঘোষণার পরপরই মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় রাশিয়ার ডিজেল বিশ্ববাজারে সরবরাহের জন্য অস্থায়ী অনুমতিপত্র দেওয়ার কথা জানায়।
এই অনুমতির ফলে শুক্রবারের (৯ অক্টোবর) মধ্যে জাহাজে তোলা রাশিয়ার ডিজেল সরবরাহের ক্ষেত্রে ২০২৭ সালের এপ্রিল পর্যন্ত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে না। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে সাধারণত ৩০ দিনের জন্য ছাড় দেওয়া হলেও এবার ছয় মাসের সুযোগ দেওয়া হয়েছে।
চলতি বছরের শুরুতে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর বিশ্বজুড়ে জ্বালানি খাতে অস্থিরতা বেড়েছে। এর প্রভাবেই রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি থেকে আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ডিজেলের দাম কি কমবে?
রাশিয়ার কাছ থেকে ডিজেল কেনার ফলে যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে বিশেষজ্ঞদের।
কৌশলগত ও আন্তর্জাতিক অধ্যয়নবিষয়ক কেন্দ্রের জ্বালানি বিশ্লেষক ক্লেটন সিগল মনে করেন, এ চুক্তির কারণে দামে খুব বেশি পরিবর্তন নাও আসতে পারে। তবে রাশিয়া ও পুতিনের জন্য এটি বড় সুবিধা হতে পারে।
জ্বালানি ও অর্থনীতি নিয়ে গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান এনার্জি পলিসি রিসার্চ ফাউন্ডেশনের মাইকেল লিঞ্চের মতে, যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার কাছ থেকে ডিজেল কিনলে রাশিয়ার বর্তমান ক্রেতারা হয়তো সেই জ্বালানি পাবেন না। তখন তাদের অন্য দেশ থেকে ডিজেল কিনতে হবে। ফলে বিশ্ববাজারে দাম খুব বেশি কমার সম্ভাবনা নেই।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেলের দাম এখনো অনেক বেশি। মার্কিন অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার (৯ অক্টোবর) প্রতি গ্যালন ডিজেলের গড় দাম ছিল ৬ দশমিক ২৮ ডলার। গত ২২ সেপ্টেম্বর তা রেকর্ড ৬ দশমিক ৫২ ডলারে পৌঁছেছিল।
ট্রাম্প অবশ্য বলেছেন, আমেরিকানদের, বিশেষ করে কৃষক, খামারি ও পণ্যবাহী গাড়িচালকদের জন্য জ্বালানির দাম কমানো তার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। হোয়াইট হাউস ছাড়ার সময়ও রাশিয়ার কাছ থেকে ডিজেল পাওয়ার চুক্তির জন্য পুতিনকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
তবে চুক্তির অর্থ কে পরিশোধ করবে কিংবা ডিজেল ঠিক কবে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাবে, সে বিষয়ে হোয়াইট হাউস বিস্তারিত জানায়নি। পুতিনের সহকারী ইউরি উশাকভও এ সরবরাহের বিনিময়ে রাশিয়া কোনো ছাড় পেয়েছে কি না, সে বিষয়ে কিছু জানাননি।
রাশিয়ায় ডিজেল রপ্তানির নিষেধাজ্ঞা শিথিল
রাশিয়া একসময় বিশ্বের অন্যতম বড় ডিজেল রপ্তানিকারক ছিল। তবে নিজেদের বাজারে চাহিদা পূরণে সমস্যার কারণে গত জুলাই থেকে দেশটি ডিজেল রপ্তানি বন্ধ রেখেছে। ইউক্রেনের বারবার হামলায় রাশিয়ার তেল শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় উৎপাদনও কমেছে।
আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাবে, রাশিয়ায় ডিজেল উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে।
রাশিয়ার উপপ্রধানমন্ত্রী আলেকজান্ডার নোভাক রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসকে জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়ের আগেই ডিজেল রপ্তানির ওপর বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার কাজ শুরু হয়েছে। চলতি মাসেই যুক্তরাষ্ট্রে সরবরাহ শুরু হতে পারে বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ বাজারেও ডিজেলের চাহিদা পূরণ করা হবে বলে আশ্বাস দেন নোভাক।
সূত্র: এপি
আরটিভি/জেএমএ



