
যুক্তরাষ্ট্রে নিত্যপণ্যের বাড়তি দামে চাপে পড়েছে সাধারণ মানুষের সংসার খরচ। আয় দিয়ে ব্যয় সামলাতে না পেরে বাড়ছে ঋণনির্ভরতা। ফলে গাড়ি, গৃহঋণ, শিক্ষাঋণ ও ঋণপত্রের কিস্তি সময়মতো পরিশোধ করতে পারছেন না অনেক মার্কিন নাগরিক। সাম্প্রতিক আর্থিক তথ্যেও উঠে এসেছে ঋণ পরিশোধে পিছিয়ে পড়ার এই চিত্র।
নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর গাড়ির ঋণের কিস্তি দীর্ঘ সময় ধরে বকেয়া থাকার হার রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। ঋণপত্রের প্রায় ১৩ শতাংশ বকেয়া দীর্ঘ সময় ধরে অপরিশোধিত রয়েছে, যা ২০১০ সালের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি। ওই সময় আবাসন খাতের সংকটের পর যুক্তরাষ্ট্রে আর্থিক চাপ তীব্র হয়েছিল।
গৃহঋণের কিস্তি পরিশোধে পিছিয়ে পড়া পরিবারের হারও গত ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে ২০০৭-২০০৯ সালের মহামন্দার সময়ের সর্বোচ্চ হারের তুলনায় এটি এখনো অনেক কম।
গত এক বছরে শিক্ষাঋণের কিস্তি বকেয়া থাকার হারও বেড়েছে। মহামারির সময় দেওয়া ঋণ পরিশোধের বিশেষ সুবিধা শেষ হয়ে যাওয়া এবং বাইডেন প্রশাসনের একটি ঋণ পরিশোধ পরিকল্পনার সঙ্গে এই বৃদ্ধির সম্পর্ক রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঋণের কিস্তি দিতে হিমশিম খাচ্ছেন অনেকে
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভের পারিবারিক আর্থিক পরিস্থিতিবিষয়ক জরিপে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে দেশটির প্রায় ৯ শতাংশ পরিবার আয়ের ৪০ শতাংশের বেশি ঋণ পরিশোধে ব্যয় করেছে। ২০১০ সালের পর এটিই ছিল সর্বোচ্চ হার।
একই জরিপ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রায় ২০ শতাংশ পরিবার কোনো না কোনো ঋণের কিস্তি সময়মতো দিতে পারেনি। ২০২২ সালে এই হার ছিল প্রায় ১২ শতাংশ।
বয়স্কদের মধ্যেও ঋণ পরিশোধের সমস্যা বাড়ছে। ৭০ বছরের বেশি বয়সীদের গাড়ির ঋণের কিস্তি বকেয়া থাকার হার ২০০০ সালে তথ্য সংগ্রহ শুরুর পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই বয়সীদের মধ্যে ঋণপত্রের কিস্তি বকেয়া থাকার হারও ২০১১ সালের পর সর্বোচ্চ হয়েছে।
ঋণবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ডেট ডটকমের মার্চ মাসের এক জরিপে দেখা গেছে, অর্ধেকের বেশি মার্কিন নাগরিক খাবার, বাড়িভাড়া ও বিদ্যুৎ-গ্যাসের বিলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে ঋণপত্র ব্যবহার করেছেন। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, মূল্যস্ফীতির কারণে এক বছর আগের তুলনায় তাঁদের ঋণপত্রে বকেয়া অর্থের পরিমাণ বেড়েছে।
আয় বাড়ছে দামের তুলনায় কম
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ও বেকারত্বের মতো কিছু সূচক তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। টানা পাঁচ বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবের পর সাম্প্রতিক এক জরিপে ১০ জনের মধ্যে ৯ জন মার্কিন নাগরিক বলেছেন, অর্থনীতি নিয়ে তাঁদের ভবিষ্যৎ ভাবনায় পণ্যের দাম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আর্থিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান জিরার্ডের প্রত্যয়িত আর্থিক পরিকল্পনাবিদ কেলি রিগ্যানের মতে, মূল্যস্ফীতি মানুষের পারিবারিক অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে। জরুরি সঞ্চয় শেষ হয়ে গেলে অনেকেই ঋণপত্রের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন।
তিনি বলেন, মানুষের আয়ের তুলনায় পণ্যের দাম দ্রুত বাড়লে ব্যয় মেটাতে ঘাটতি তৈরি হয়। বাজেটে সাশ্রয় করার সুযোগ না থাকলে কিংবা জরুরি সঞ্চয় না থাকলে সেই ঘাটতি পূরণ করতে মানুষকে ঋণ নিতে হয়।
অর্থনীতিবিদদের মতে, মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পারায় লাখো পরিবার আগের তুলনায় কম পণ্য ও সেবা কিনতে পারছে। এতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে এবং অর্থনীতি নিয়ে হতাশাও বাড়ছে।
মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভোক্তা পরিস্থিতিবিষয়ক জরিপের গত সপ্তাহের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেকের বেশি ভোক্তা আগামী এক বছরে ব্যয় কমানোর পরিকল্পনা করছেন। তাদের মধ্যে খাবার ও নিত্যপণ্য, গৃহস্থালির সামগ্রী, গাড়ি, বাইরে খাওয়াদাওয়া এবং ছুটিতে বেড়াতে যাওয়ার খরচ কমানোর প্রবণতা বেশি।
জরিপটির পরিচালক জোয়ান সু বলেন, জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে মানুষের হতাশা বাড়ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের মানুষই মনে করছেন, বছরের শুরু থেকে অর্থনীতির গতিপথ দুর্বল হয়েছে।
সব মিলিয়ে, মূল্যস্ফীতির চাপ, মজুরি বৃদ্ধির ধীরগতি এবং সঞ্চয়ের ঘাটতি যুক্তরাষ্ট্রের পরিবারগুলোকে ঋণের ওপর আরও নির্ভরশীল করে তুলছে। এর ফলে ঋণের কিস্তি সময়মতো পরিশোধ করতে না পারা মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে।
সূত্র: সিবিএস নিউজ
আরটিভি/জেএমএ


