
তীব্র গরমে ব্যায়াম বা শরীরচর্চা করা বেশ কষ্টকর হয়ে ওঠে। প্রচণ্ড গরমে দৌড়ানো, হাঁটা কিংবা খেলাধুলা করলে শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়তে পারে। এমনকি অতিরিক্ত গরমে শরীরের তাপমাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে গিয়ে গুরুতর অসুস্থতাও দেখা দিতে পারে।
তবে গরমের কারণে একেবারে শরীরচর্চা বন্ধ করে দেওয়াও দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ যদি শারীরিকভাবে কম সক্রিয় হয়ে পড়ে, তাহলে ভবিষ্যতে নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই গরমের সময়ে কখন, কীভাবে এবং কতক্ষণ ব্যায়াম করা নিরাপদ—তা জানা জরুরি।
গরমে শরীর দ্রুত ক্লান্ত হয় কেন?
শরীরচর্চার সময় পেশি কাজ করে এবং শরীরে তাপ তৈরি হয়। শরীর তখন ঘাম ও ত্বকের দিকে বেশি রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে নিজেকে ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করে।
কিন্তু ত্বকে রক্তপ্রবাহ বাড়লে একই রক্ত পেশিতে অক্সিজেন পৌঁছানোর কাজেও কম পাওয়া যায়। ফলে গরমের মধ্যে শরীরচর্চা করলে দ্রুত ক্লান্তি আসতে পারে। একই সঙ্গে শরীরের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে এবং হৃদ্যন্ত্রকেও বেশি কাজ করতে হয়।
তাই প্রচণ্ড গরমে স্বাভাবিক সময়ের মতো একই মাত্রায় শরীরচর্চা চালিয়ে যাওয়া সব সময় নিরাপদ নয়।
সম্ভব হলে সকাল বা সন্ধ্যায় ব্যায়াম করুন
গরমের মধ্যে নিরাপদে শরীরচর্চার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো সময় পরিবর্তন করা। সম্ভব হলে ভোর বা সকালে, কিংবা সন্ধ্যার পর ব্যায়াম করা ভালো।
সরাসরি রোদে শরীরচর্চা না করে ছায়াযুক্ত জায়গা বেছে নেওয়াও জরুরি। একই জায়গায় ছায়া ও রোদের তাপমাত্রার মধ্যে বড় পার্থক্য থাকতে পারে। তাই গরমের দিনে ছায়াযুক্ত স্থান শরীরচর্চার জন্য তুলনামূলক নিরাপদ।
শুধু তাপমাত্রা নয়, বাতাসের আর্দ্রতাও দেখুন
গরমে শরীর ঘামের মাধ্যমে নিজেকে ঠান্ডা রাখে। ঘাম ত্বক থেকে বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়ার সময় শরীরের তাপ কমে।
কিন্তু বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকলে ঘাম সহজে শুকাতে পারে না। ফলে শরীরের তাপ কমানোর স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। বাতাস চলাচল কম এমন জায়গায় শরীরচর্চা করলেও গরমের চাপ আরও বেড়ে যেতে পারে।
তাই ব্যায়ামের আগে শুধু তাপমাত্রা নয়, বাতাসের আর্দ্রতা ও চলাচলের বিষয়টিও বিবেচনা করা ভালো।
গরমে ব্যায়ামের সময় কমিয়ে দিন
যেদিন গরম বেশি, সেদিন প্রতিদিনের মতো দীর্ঘ সময় শরীরচর্চা করার প্রয়োজন নেই। ব্যায়ামের সময় কমিয়ে আনা এবং মাঝেমধ্যে বিরতি নেওয়া নিরাপদ।
প্রয়োজনে সকালে অল্প সময় হাঁটা কিংবা ঘরের ভেতরে হালকা শরীরচর্চা করা যেতে পারে। গরমের দিনে নিজের স্বাভাবিক গতির চেয়ে ধীরে চলাই ভালো।
বিরতির সময় সম্ভব হলে ঠান্ডা জায়গায় যান। ছায়ায় বসুন, ঠান্ডা পানি ব্যবহার করুন এবং শরীরকে স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ফিরতে সময় দিন।
শরীর ঠান্ডা রাখবেন যেভাবে
শরীর ঠান্ডা করার জন্য শুধু বরফের প্যাক ব্যবহার করলেই সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায় না। কারণ বরফের প্যাক সাধারণত শরীরের অল্প একটি অংশে ঠান্ডা পৌঁছায়।
এর বদলে হাত ও বাহুর কিছু অংশ ঠান্ডা পানিতে ডুবিয়ে রাখা যেতে পারে। শরীরের ত্বকে পানি ঢাললেও উপকার পাওয়া যায়। পানি ত্বক থেকে বাষ্প হয়ে উড়ে যাওয়ার সময় শরীরের তাপ কমাতে সাহায্য করে।
ভেজা ঠান্ডা তোয়ালে হাত, পা ও শরীরের বিভিন্ন অংশে বারবার ব্যবহার করেও শরীর ঠান্ডা রাখা যায়।
ব্যায়ামের আগেই শরীর ঠান্ডা করে নিন
গরমের মধ্যে বের হওয়ার আগে শরীরের তাপমাত্রা কিছুটা কমিয়ে নেওয়াও উপকারী হতে পারে। এতে শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে বিপজ্জনক অবস্থায় পৌঁছাতে তুলনামূলক বেশি সময় লাগে।
ঠান্ডা পানি বা বরফ মেশানো পানি শরীর ঠান্ডা রাখতে সাহায্য করতে পারে। তবে নিজের শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে এসব পদ্ধতি ব্যবহার করা উচিত।
ধীরে ধীরে গরমের সঙ্গে অভ্যস্ত হোন
গরমে হঠাৎ করে বেশি সময় শরীরচর্চা না করে ধীরে ধীরে সময় ও পরিমাণ বাড়ানো ভালো। নিয়মিতভাবে প্রায় এক থেকে দুই সপ্তাহ গরমের মধ্যে শরীরচর্চা করলে শরীর ধীরে ধীরে তাপের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শুরু করে।
এ সময় শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা বাড়ে, ঘাম হওয়ার হার বাড়ে এবং রক্তের তরল অংশের পরিমাণও বাড়তে পারে। ফলে শরীর গরমের চাপ তুলনামূলক ভালোভাবে সামলাতে পারে।
তবে এই অভ্যাস স্থায়ী নয়। নিয়মিত গরমের সঙ্গে শরীরকে মানিয়ে নেওয়ার সুযোগ না দিলে কিছুদিন পর সেই অভিযোজন কমে যেতে পারে।
শরীরের সংকেতকে অবহেলা করবেন না
গরমে শরীরচর্চার সময় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিজের শরীরের সংকেত বোঝা। শুধু অভ্যাস আছে বা নিয়মিত ব্যায়াম করেন বলে শরীরের ওপর অতিরিক্ত চাপ দেওয়া ঠিক নয়।
মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, অতিরিক্ত ক্লান্তি কিংবা হৃদ্স্পন্দন বেড়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যায়াম বন্ধ করতে হবে। এরপর দ্রুত ঠান্ডা জায়গায় গিয়ে শরীর ঠান্ডা করার ব্যবস্থা নিতে হবে।
গরমে শরীরচর্চা করার সময় নিজের গতি কমিয়ে আনা দুর্বলতার লক্ষণ নয়। বরং অতিরিক্ত গরমে নিজের শরীরকে নিরাপদ রাখার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায়গুলোর একটি হলো প্রয়োজন বুঝে থেমে যাওয়া।
তাপমাত্রা বাড়লেও শরীরচর্চা পুরোপুরি বন্ধ করার প্রয়োজন নেই। তবে গরমের দিনে কখন ব্যায়াম করবেন, কোথায় করবেন, কতক্ষণ করবেন এবং কীভাবে শরীর ঠান্ডা রাখবেন—এসব বিষয়ে সচেতন হতে হবে।
সকালে বা সন্ধ্যায় ব্যায়াম করা, ছায়াযুক্ত জায়গা বেছে নেওয়া, সময় ও পরিশ্রম কমানো, নিয়মিত বিরতি নেওয়া এবং শরীরের সংকেত বুঝে প্রয়োজন হলে থেমে যাওয়া—এই অভ্যাসগুলো গরমে নিরাপদে সক্রিয় থাকতে সাহায্য করতে পারে।
তাপপ্রবাহ যত বাড়বে, ততই শুধু কতটা শরীরচর্চা করছি তা নয়—কখন, কোথায় এবং কীভাবে করছি, সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
সূত্র: বিবিসি
আরটিভি/জেএমএ


