ঢাকা বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

মগজখেকো অ্যামিবা যেভাবে মগজ খায় মানুষের

লাইফস্টাইল ডেস্ক, আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ০৩:৫০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানায় আট বছর বয়সী এক শিশুর মৃত্যু আবারও সামনে এনেছে অত্যন্ত বিরল কিন্তু ভয়ংকর এক সংক্রমণের কথা। রোগটির নাম প্রাইমারি অ্যামিবিক মেনিনগোএনসেফালাইটিস (পিএএম)। এর জন্য দায়ী ক্ষুদ্র এক অ্যামিবা নেগলেরিয়া ফাওলেরি, যা সাধারণভাবে ‘মগজখেকো’ বা ‘মস্তিষ্কখেকো অ্যামিবা’ নামে পরিচিত।

লুইজিয়ানার আট বছর বয়সী লিলিয়ান স্মার্ট স্থানীয় একটি হ্রদে সাঁতার কাটার পর এই অ্যামিবায় আক্রান্ত হয়েছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা সত্ত্বেও মস্তিষ্কের ব্যাপক ক্ষতির কারণে তাকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।

তবে এই রোগ শুধু দূর দেশের কোনো আতঙ্ক নয়। বাংলাদেশেও নেগলেরিয়া ফাওলেরি সংক্রমণের একটি প্রমাণিত ঘটনা রয়েছে।

বাংলাদেশেও মিলেছিল ‘মগজখেকো’ অ্যামিবা

২০১৪ সালে নীলফামারীর ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর জ্বর, প্রচণ্ড মাথাব্যথা ও বমিসহ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। কয়েক দিনের মধ্যেই তার অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। খিঁচুনি, অচেতনতা ও ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দেয়। জ্বর ও মাথাব্যথা শুরুর মাত্র ছয় দিনের মধ্যে তার মৃত্যু হয়।

সে সময় বাংলাদেশে নেগলেরিয়া ফাওলেরি শনাক্তের প্রয়োজনীয় পরীক্ষার সুযোগ ছিল না। পরে সংরক্ষিত সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইডের ডিএনএ পরীক্ষা করে ২০১৭ সালে নিশ্চিত হওয়া যায়, কিশোরটি প্রাইমারি অ্যামিবিক মেনিনগোএনসেফালাইটিসে আক্রান্ত হয়েছিল।

গবেষণায় দেখা যায়, মৃত্যুর আগে কিশোরটির একাধিক সম্ভাব্য ঝুঁকি ছিল। সে অপরিশোধিত গভীর নলকূপের পানি ব্যবহার করত, নদীতে গোসল করত এবং অজুর সময় নাকে পানি দিত। তবে ঠিক কোন পানির উৎস থেকে তার শরীরে অ্যামিবাটি প্রবেশ করেছিল, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

কীভাবে মস্তিষ্কে পৌঁছে এই অ্যামিবা?

নেগলেরিয়া ফাওলেরি সাধারণত উষ্ণ মিঠা পানিতে বসবাস করে। পুকুর, হ্রদ, নদী কিংবা অন্যান্য উষ্ণ মিঠা পানির উৎসে এটি থাকতে পারে।

তবে এই অ্যামিবা পানি পান করার মাধ্যমে মানুষের শরীরে সংক্রমণ ঘটায় না। মূল ঝুঁকি তৈরি হয় যখন অ্যামিবাযুক্ত পানি নাক দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে।

নাকের ভেতর প্রবেশ করার পর অ্যামিবাটি ঘ্রাণ-সংশ্লিষ্ট স্নায়ুর পথ ধরে মস্তিষ্কের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। মস্তিষ্কে পৌঁছানোর পর এটি তীব্র প্রদাহ ও টিস্যুর ক্ষতি ঘটায়। এ থেকেই সৃষ্টি হয় প্রাণঘাতী পিএএম।

‘মগজখেকো’ নামটি ভয়ংকর হলেও বিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের মস্তিষ্কে পৌঁছানো এই অ্যামিবার কোনো উদ্দেশ্যপূর্ণ আচরণ নয়। প্রকৃতিতে এটি মূলত ব্যাকটেরিয়া খেয়ে বেঁচে থাকে।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় নেগলেরিয়া প্রজাতির অ্যামিবার চলাফেরা নিয়ে নতুন তথ্য পাওয়া গেছে। গবেষকেরা দেখেছেন, এই অ্যামিবা খোলা জায়গার তুলনায় সরু ও সংকীর্ণ জায়গার দিকে যেতে আগ্রহ দেখাতে পারে।

গবেষণায় সরাসরি রোগসৃষ্টিকারী নেগলেরিয়া ফাওলেরির পরিবর্তে এর কাছাকাছি ও অরোগসৃষ্টিকারী প্রজাতি Naegleria gruberi ব্যবহার করা হয়।

মাইক্রোস্কোপের নিচে বিশেষভাবে তৈরি ২ থেকে ৮ মাইক্রোমিটার প্রশস্ত চ্যানেলে অ্যামিবাগুলোর চলাচল পর্যবেক্ষণ করা হয়। দেখা যায়, খোলা জায়গা থেকে সরে গিয়ে তারা বারবার সরু চ্যানেলে প্রবেশের চেষ্টা করছে।

৮ মাইক্রোমিটার প্রশস্ত চ্যানেলে থাকা অ্যামিবাগুলো খোলা জায়গায় থাকা অ্যামিবার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ দ্রুত চলছিল। তাদের গতি ছিল প্রতি মিনিটে প্রায় ৪০ মাইক্রোমিটার।

গবেষকদের ধারণা, প্রকৃতিতে সরু ফাঁক বা গর্তে ব্যাকটেরিয়া জমে থাকার কারণে এমন পরিবেশের প্রতি এই অ্যামিবার স্বাভাবিক আকর্ষণ তৈরি হয়ে থাকতে পারে।

অর্থাৎ মানুষের নাকের ভেতরে ঢুকে সরু পথ ধরে এগিয়ে যাওয়া সম্ভবত অ্যামিবার স্বাভাবিক আচরণেরই অংশ। তবে গবেষণাটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং নেগলেরিয়া ফাওলেরি ঠিক একইভাবে আচরণ করে কি না, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

কী কী লক্ষণ দেখা দেয়?

নেগলেরিয়া ফাওলেরি সংক্রমণের শুরুতে লক্ষণগুলো অনেকটা সাধারণ মেনিনজাইটিস বা অন্যান্য মস্তিষ্কের সংক্রমণের মতো হতে পারে। যেমন- তীব্র মাথাব্যথা, জ্বর, বমি বমি ভাব ও বমি। পরবর্তীতে দ্রুত গুরুতর লক্ষণ দেখা দিতে পারে। যেমন- ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, বিভ্রান্তি, খিঁচুনি, হ্যালুসিনেশন ও অচেতনতা বা কোমা।

সাধারণত সংক্রমণের কয়েক দিনের মধ্যে লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে এবং এরপর খুব দ্রুত রোগীর অবস্থার অবনতি ঘটতে পারে।

নেগলেরিয়া ফাওলেরি সংক্রমণ অত্যন্ত বিরল। যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৩৭ সাল থেকে এখন পর্যন্ত মাত্র কয়েক শ ঘটনারও কম নথিভুক্ত হয়েছে। সাধারণত উষ্ণ আবহাওয়ায় এবং গরমের সময় উষ্ণ মিঠা পানির সংস্পর্শে আসা শিশু ও তরুণদের মধ্যে তুলনামূলক বেশি ঘটনা দেখা যায়।

বাংলাদেশের এক গবেষণায় ২০১০ থেকে ২০১৪ সালের মধ্যে এনসেফালাইটিসে আক্রান্ত রোগীদের ৩০০টি সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইডের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল। এর মধ্যে মাত্র একটিতে নেগলেরিয়া ফাওলেরি শনাক্ত হয়।

এটি রোগটির বিরলতা তুলে ধরলেও গবেষকদের আশঙ্কা, সচেতনতা ও পরীক্ষার সীমাবদ্ধতার কারণে অতীতে কিছু ঘটনা হয়তো অন্য ধরনের মস্তিষ্কের সংক্রমণ হিসেবে শনাক্ত হয়েছে।

সব পানিতেই কি থাকে এই অ্যামিবা?

না। সব পানিতে নেগলেরিয়া ফাওলেরি থাকে না। এটি সাধারণত উষ্ণ মিঠা পানির পরিবেশে পাওয়া যায়। সমুদ্রের লবণাক্ত পানি এর স্বাভাবিক পরিবেশ নয়। যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ ও সঠিকভাবে ক্লোরিনযুক্ত সুইমিং পুলেও এটির ঝুঁকি অনেক কম।

এ ছাড়া দূষিত পানি পান করলেই পিএএম হয় না এবং আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির শরীরেও রোগটি ছড়ায় না।

কীভাবে সতর্ক থাকবেন?

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, উষ্ণ মিঠা পানিতে সাঁতার বা গোসলের সময় নাকে পানি ঢোকা এড়িয়ে চলুন।

পুকুর, নদী বা হ্রদে ডুব দেওয়ার সময় সতর্ক থাকুন।

নাক পরিষ্কার বা নাকে পানি দেওয়ার ক্ষেত্রে নিরাপদ ও উপযুক্ত পানি ব্যবহার করুন।

উষ্ণ মিঠা পানির সংস্পর্শের পর জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, বমি, ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া, বিভ্রান্তি বা খিঁচুনির মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিন এবং চিকিৎসককে পানির সংস্পর্শের তথ্য জানান।

আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা

নেগলেরিয়া ফাওলেরি অত্যন্ত বিরল হলেও এটি যে প্রাণঘাতী, তা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। লুইজিয়ানার শিশু লিলিয়ানের মৃত্যু এবং বাংলাদেশের নীলফামারীর কিশোরের ঘটনা দেখিয়েছে, সংক্রমণটি কত দ্রুত ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।

তবে এর অর্থ এই নয় যে সব পুকুর, নদী বা হ্রদের পানি নিয়ে আতঙ্কিত হতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ঝুঁকির বিষয়টি জানা, নাকে অপরিষ্কার বা অনিরাপদ পানি ঢোকা এড়িয়ে চলা এবং সন্দেহজনক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া।

বাংলাদেশে ২০১৪ সালের ঘটনাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা হয়ে আছে। কারণ রোগী মারা যাওয়ার প্রায় তিন বছর পর নিশ্চিত হওয়া গিয়েছিল তার মৃত্যুর প্রকৃত কারণ। তাই চিকিৎসকদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এবং সন্দেহজনক ক্ষেত্রে দ্রুত রোগ শনাক্তের সক্ষমতা তৈরি করা জরুরি।

আরও পড়ুন

‘মগজখেকো’ অ্যামিবা মানুষের বিরুদ্ধে কোনো পরিকল্পিত আক্রমণ চালায় না। প্রকৃতিতে নিজের স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে গিয়েই দুর্ঘটনাক্রমে এটি মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু একবার নাক দিয়ে ঢুকে মস্তিষ্কে পৌঁছালে এর পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ।

তাই আতঙ্ক নয় সচেতনতা, নিরাপদ পানির ব্যবহার এবং দ্রুত রোগ শনাক্ত করাই হতে পারে এই বিরল কিন্তু ভয়ংকর সংক্রমণের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা।

আরটিভি/এসকে

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
জেনে নিন দীর্ঘদিন সুগন্ধি ভালো রাখার সহজ উপায়
প্রিয় পারফিউমটি কিছুদিন ব্যবহারের পর আগের মতো ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে না এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই রয়েছে। এর জন্য সবসময় সুগন্ধির মান বা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করা যায় না।
জেনে নিন দীর্ঘদিন সুগন্ধি ভালো রাখার সহজ উপায়
আজ নুডলস দিবস
আজ ৬ অক্টোবর নুডলস দিবস। প্রতি বছর এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রে নুডলস দিবস পালন করা হয়।
আজ নুডলস দিবস
খাবারেই কমাতে পারেন কোলেস্টেরল
রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি থাকলে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে অনেকের ক্ষেত্রে খাবারের ধরন ও অভ্যাসে পরিবর্তন এনে কোলেস্টেরল কমানো সম্ভব।
খাবারেই কমাতে পারেন কোলেস্টেরল
রোজ এক কাপ চায়ে কমতে পারে হৃদরোগের ঝুঁকি, বলছে গবেষণা
প্রতিদিন অন্তত এক কাপ চা পান করেন এমন মানুষের হৃদস্বাস্থ্যে কিছুটা ভালো প্রভাব দেখা যেতে পারে।
রোজ এক কাপ চায়ে কমতে পারে হৃদরোগের ঝুঁকি, বলছে গবেষণা
লবণ কম খাওয়ার ৬ সহজ কৌশল
প্রতিদিন শরীরের জন্য অল্প পরিমাণ লবণ প্রয়োজন। কারণ লবণে থাকা সোডিয়াম শরীরের বিভিন্ন কাজে ভূমিকা রাখে।
লবণ কম খাওয়ার ৬ সহজ কৌশল
আরও পড়ুন
করমুক্ত ডিজেল ব্যবহারের সুযোগ দিতে ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ
সমালোচনার মুখে নিজের প্রশংসার টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে সরকারি অর্থ ব্যয় বন্ধ করলেন ট্রাম্প
হাম ছড়াতেই নিউইয়র্কে জরুরি অবস্থা ঘোষণা
তাইওয়ান প্রেসিডেন্টের ছেলেকে নজরদারি, চীনা এজেন্ট সন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে নারী