
সন্তান বড় হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছে কিংবা একা অন্য শহরে থাকছে—এমন পরিস্থিতিতে অনেক বাবা-মায়ের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। এই দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পেতে বর্তমানে অনেক অভিভাবকই আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিচ্ছেন, যার মধ্যে অন্যতম হলো সন্তানের স্মার্টফোনে ‘ট্র্যাকিং অ্যাপ’ ব্যবহার। তবে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের ওপর এমন নজরদারি কতটা যুক্তিযুক্ত এবং তরুণরাই বা এটি কীভাবে দেখছেন, তা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক।
কেউ এটিকে নিরাপত্তার কবচ মনে করছেন, আবার কেউ দেখছেন ব্যক্তি স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে।
যুক্তরাজ্যের ‘ইউনাইট স্টুডেন্টস’-এর একটি সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে পড়ুয়া ১০২৭ জন শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের মধ্যে প্রায় ৬৭ শতাংশই সন্তানের অবস্থান জানতে ট্র্যাকিং অ্যাপ ব্যবহার করেন।
এদের মধ্যে বাবারা (৭১ শতাংশ) মায়েদের (৫৯ শতাংশ) তুলনায় ট্র্যাকিং অ্যাপ ব্যবহারে বেশি আগ্রহী।
৫৩ বছর বয়সী স্টিভেন মেডওয়ের মতো অনেক অভিভাবকই মনে করেন, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে সন্তানের অবস্থান জানা থাকলে দুশ্চিন্তা কমে। স্টিভেনের ১৯ বছর বয়সী মেয়ে মার্থা যখন গভীর রাতে পার্টি থেকে হলে ফিরতে দেরি করে, তখন স্টিভেন ফোন করে বিরক্ত না করে অ্যাপের মাধ্যমেই নিশ্চিত হন মেয়ে নিরাপদে ফিরেছে কি না।
তার মতে, এটি অবিশ্বাসের বিষয় নয়, বরং পরিবারকে নিরাপদ রাখার একটি আধুনিক উপায়।
তবে সব ক্ষেত্রে এই ট্র্যাকিংয়ের প্রক্রিয়াটি মসৃণ নয়। ৫৬ বছর বয়সী মারিয়া কনলি তার অটিস্টিক ছেলে ওয়েইনকে এই অ্যাপ ব্যবহারে অনেকটা বাধ্য করেছেন মোবাইল ফোনের বিল দেওয়ার শর্তে।
মারিয়া মনে করেন, তার ছেলের নিরাপত্তার জন্য এটি জরুরি। যদিও মারিয়া বিষয়টিকে মজার ছলে রাখার চেষ্টা করেন, তবুও তিনি স্বীকার করেন যে এটি মূলত একটি ‘নিরাপত্তার জাল’।
অন্যদিকে লিয়ান হ্যানাম নামের আরেক অভিভাবক মনে করেন, আজকের এই অনিরাপদ পৃথিবীতে সন্তানরা কোথায় আছে তা জানা থাকলে মানসিক শান্তি পাওয়া যায়। বিশেষ করে মেয়েরা যখন রাতে কাজ সেরে ফেরে বা নতুন গাড়ি চালানো শেখে, তখন ট্র্যাকিং অ্যাপ অভিভাবকদের অনেক দুশ্চিন্তা লাঘব করে।
বিশেষজ্ঞরা অবশ্য এই প্রবণতা নিয়ে কিছুটা সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন।
চিকিৎসক ও লেখক ডা. মার্টিন ব্রুনেট বলেন, অভিভাবকদের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো সন্তানকে স্বাধীনভাবে চলতে দেওয়া। আধুনিক প্রযুক্তি এই কাজটি আরও কঠিন করে তুলেছে।
তিনি মনে করেন, ঘরে বাতাসহীন পরিবেশে বড় হওয়া গাছ যেমন শক্ত হয় না, তেমনি সারাক্ষণ বাবা-মায়ের ডিজিটাল নজরদারিতে থাকা সন্তানেরাও জীবনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পিছিয়ে পড়তে পারে।
ট্র্যাকিং কোম্পানিগুলো ‘ভালবাসা ও নিরাপত্তার’ অজুহাতে এই আসক্তি তৈরি করছে বলে তিনি মত দেন। দীর্ঘমেয়াদে সন্তানের মানসিক বিকাশ এবং স্বাবলম্বী হওয়ার জন্য এই নজরদারি বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে কি না, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আরটিভি/এএইচ


