
স্মার্টফোনে কয়েকটি আঙুলের ছোঁয়াতেই এখন ঘরে বসে ওষুধ কেনা যায়। চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র জমা দিয়ে প্রয়োজনীয় ওষুধ বেছে নেওয়া, দাম পরিশোধ করা এবং বাড়িতে বসেই তা হাতে পাওয়ার সুবিধা অনেকের সময় ও পরিশ্রম বাঁচিয়েছে। বিশেষ করে নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হয় এমন মানুষ বা বাইরে গিয়ে ওষুধ কেনা যাদের জন্য কঠিন, তাদের কাছে অনলাইনে ওষুধ কেনার সুবিধা বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ওষুধ অন্য সাধারণ পণ্যের মতো নয়। ভুল ওষুধ, ভুল মাত্রা, নকল ওষুধ কিংবা সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করা ওষুধ শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাই অনলাইনে ওষুধ কেনার সময় শুধু দাম বা ছাড় দেখলেই হবে না। ওষুধের নাম, মাত্রা, প্রস্তুতকারক, মেয়াদ, মোড়ক এবং সংরক্ষণের বিষয়ও ভালোভাবে যাচাই করতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, অননুমোদিত অনলাইন উৎস থেকে নিম্নমানের বা নকল চিকিৎসা পণ্য পাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। অনলাইনে ব্যবসার বিস্তারের কারণে এসব পণ্য মানুষের কাছে পৌঁছানোও সহজ হয়েছে।
তাই অনলাইনে ওষুধ কেনার আগে অন্তত এই পাঁচটি বিষয় অবশ্যই যাচাই করে নিন।
ব্যবস্থাপত্রের সঙ্গে ওষুধের নাম ও মাত্রা মিলিয়ে নিন
অনলাইনে ওষুধ কেনার সময় প্রথমেই চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রটি সামনে রাখুন। এরপর কেনাকাটার তালিকায় যোগ করা ওষুধের নাম, মাত্রা এবং পরিমাণ ব্যবস্থাপত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখুন।
বিশেষ করে ওষুধের প্রধান সক্রিয় উপাদান এবং তার মাত্রা ঠিক আছে কি না, তা খেয়াল করা জরুরি। অনলাইন ওষুধালয় কোনো বিকল্প ওষুধ দেখালে নিজের সিদ্ধান্তে সেটি নেওয়া উচিত নয়। চিকিৎসক বা ঔষধবিজ্ঞানীর পরামর্শ নিয়ে তবেই পরিবর্তন করা নিরাপদ।
ব্যবস্থাপত্র জমা দেওয়ার পর কেনাকাটার তালিকায় ওষুধের তথ্য পরিবর্তন হয়েছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা দরকার।
বিশেষ করে ব্যবস্থাপত্রনির্ভর ওষুধের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধের নাম বা মাত্রা পরিবর্তন করা ঠিক নয়। নিরাপদ অনলাইন ওষুধালয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো ব্যবস্থাপত্র চাওয়া।
বেশি ছাড় দেখেই ওষুধ কিনবেন না
অনলাইনে কোনো ওষুধের দাম বাজারের তুলনায় অনেক কম দেখলে সহজেই আকর্ষণ তৈরি হয়। কিন্তু অস্বাভাবিক কম দাম দেখলে সতর্ক হওয়া জরুরি।
কম দাম মানেই ওষুধ নকল—এমন নয়। বৈধ ওষুধালয়ও বিভিন্ন সময় ছাড় দিতে পারে। তবে খুব বেশি ছাড়ের সঙ্গে যদি বিক্রেতার পরিচয়, ওষুধের উৎস বা অনুমোদন নিয়ে সন্দেহ থাকে, তাহলে সেই ওষুধ না কেনাই ভালো।
কেনার আগে দেখে নিন—
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও অনলাইনে ওষুধ কেনার ক্ষেত্রে সন্দেহজনকভাবে কম দামকে সতর্ক হওয়ার একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। অস্বাভাবিক কম দামে বিক্রি হওয়া ওষুধ নকল, মেয়াদোত্তীর্ণ বা অননুমোদিত হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে।
ওষুধ কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, জানুন
ওষুধের ক্ষেত্রে শুধু উৎপাদন ও মেয়াদ গুরুত্বপূর্ণ নয়, কীভাবে সেটি সংরক্ষণ করা হয়েছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
কিছু ওষুধ তাপমাত্রার প্রতি সংবেদনশীল। যেমন ইনসুলিন নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ করতে হয়। প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা বজায় না থাকলে ওষুধের কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তাই তাপমাত্রা সংবেদনশীল ওষুধ কেনার আগে বিক্রেতা কীভাবে তা সংরক্ষণ করছে এবং বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার সময় প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা বজায় রাখছে কি না, তা জেনে নেওয়া ভালো।
অননুমোদিত অনলাইন উৎস থেকে ওষুধ কিনলে সেটি কোথায় তৈরি হয়েছে বা কীভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে, তা নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।
সংকেত থাকলে যাচাই করে নিন
অনেক ওষুধের মোড়কে দ্রুত প্রতিক্রিয়া সংকেত বা রেখা সংকেত থাকতে পারে। প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান যদি এমন কোনো যাচাই ব্যবস্থা দিয়ে থাকে, তাহলে সেটি ব্যবহার করে ওষুধের তথ্য পরীক্ষা করা যেতে পারে।
এর মাধ্যমে প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান, দলীয় নম্বর, উৎপাদনের তারিখ এবং মেয়াদের তারিখ যাচাই করার সুযোগ থাকতে পারে।
তবে মোড়কে সংকেত থাকলেই ওষুধ আসল—এমন নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না। সংকেতের পাশাপাশি মোড়কের অন্যান্য তথ্যও মিলিয়ে দেখতে হবে।
ওষুধ হাতে পাওয়ার পর মোড়কের অবস্থা, বানান, উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদের তারিখ, ওষুধের চেহারা এবং নিরাপত্তা ছাপও পরীক্ষা করা উচিত।
ওষুধ হাতে পাওয়ার পরও সতর্ক থাকুন
অনলাইনে ওষুধের বায়না দেওয়ার পর কাজ শেষ নয়। ওষুধ হাতে পাওয়ার পরও কয়েকটি বিষয় পরীক্ষা করতে হবে।
প্রথমে অনলাইনের চালান বা বিলটি সামনে রাখুন। এরপর ওষুধের মোড়কের সঙ্গে চালানের তথ্য মিলিয়ে দেখুন।
বিশেষ করে খেয়াল করুন—
শুধু বাইরের বাক্স দেখে নিশ্চিত হওয়া যাবে না। ভেতরের পাতায় থাকা তথ্যও ভালোভাবে পরীক্ষা করতে হবে। বাইরের ও ভেতরের মোড়কে দলীয় নম্বর ও মেয়াদের তারিখ মিলছে কি না, সেটিও দেখা জরুরি।
নিরাপদ অনলাইন ওষুধালয় চিনবেন যেভাবে
শুধু সুন্দরভাবে তৈরি করা জালক্ষেত্র বা বড় ছাড় দেখে কোনো অনলাইন ওষুধালয়কে বিশ্বাস করা উচিত নয়।
নিরাপদ অনলাইন ওষুধালয়ের কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। ব্যবস্থাপত্রনির্ভর ওষুধের জন্য ব্যবস্থাপত্র চাওয়া, বিক্রেতার বাস্তব ঠিকানা ও যোগাযোগের তথ্য থাকা এবং প্রয়োজন হলে যোগ্য ঔষধবিজ্ঞানীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ থাকা—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে কিছু সতর্কসংকেতও রয়েছে। যেমন—
যেসব অনলাইন ওষুধালয় নিজেদের বাস্তব ঠিকানা বা দূরভাষ নম্বর প্রকাশ করে না কিংবা ব্যবস্থাপত্র ছাড়াই ব্যবস্থাপত্রনির্ভর ওষুধ বিক্রি করে, সেসব উৎস থেকেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
মোড়ক অস্বাভাবিক হলে ওষুধ খাবেন না
ওষুধ হাতে পাওয়ার পর যদি মনে হয় মোড়কটি আগের পরিচিত মোড়কের মতো নয়, তাহলে সেটিকে স্বাভাবিক ধরে নিয়ে খাওয়া উচিত নয়।
যেমন—
এ ধরনের কোনো বিষয় চোখে পড়লে ওষুধটি না খেয়ে চিকিৎসক বা ঔষধবিজ্ঞানীর পরামর্শ নেওয়া ভালো।
নকল ও নিম্নমানের ওষুধ কেন বিপজ্জনক
নকল বা নিম্নমানের ওষুধের ক্ষতি শুধু ওষুধ কাজ না করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এতে প্রয়োজনীয় সক্রিয় উপাদান কম বা বেশি থাকতে পারে। আবার ভুল সক্রিয় উপাদান কিংবা ক্ষতিকর কোনো উপাদানও থাকতে পারে।
ফলে রোগের চিকিৎসা ঠিকভাবে নাও হতে পারে। ভুল উপাদান থাকলে শরীরে ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কিংবা অন্য ওষুধের সঙ্গে ক্ষতিকর বিক্রিয়াও হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে অন্তত প্রতি ১০টি ওষুধের মধ্যে একটি নিম্নমানের বা নকল হতে পারে বলে অনুমান করা হয়। এসব চিকিৎসা পণ্য অনলাইন ও অনানুষ্ঠানিক বাজারেও পাওয়া যেতে পারে।
অনলাইনে ওষুধ কেনার আগে মনে রাখুন ৫ কথা
অনলাইনে ওষুধ কেনার সময় দ্রুত একবার দেখে নিন—
প্রথমত: ব্যবস্থাপত্রের সঙ্গে ওষুধের নাম, মূল উপাদান, মাত্রা ও পরিমাণ মিলছে কি না।
দ্বিতীয়ত: শুধু ছাড় দেখে সিদ্ধান্ত না নিয়ে বিক্রেতার নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করেছেন কি না।
তৃতীয়ত: তাপমাত্রা সংবেদনশীল ওষুধ হলে সংরক্ষণ ও পৌঁছে দেওয়ার সময় প্রয়োজনীয় তাপমাত্রা বজায় রাখা হয়েছে কি না।
চতুর্থত: মোড়কে থাকা যাচাই সংকেত থাকলে প্রস্তুতকারকের দেওয়া ব্যবস্থা ব্যবহার করে দলীয় নম্বর ও মেয়াদের তথ্য পরীক্ষা করেছেন কি না।
পঞ্চমত: ওষুধ হাতে পাওয়ার পর চালান, মোড়ক, ভেতরের পাতা, দলীয় নম্বর ও মেয়াদের তারিখ মিলিয়ে নিয়েছেন কি না।
অনলাইনে ওষুধ কেনা সময় ও পরিশ্রম বাঁচায়। তবে সামান্য অসতর্কতাও বড় সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই ওষুধ কেনার সময় শুধু দাম বা দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি না দেখে বিক্রেতার নির্ভরযোগ্যতা এবং ওষুধের গুণমানকে গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশেষ করে ব্যবস্থাপত্রনির্ভর ওষুধের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্র্যান্ড বা মাত্রা পরিবর্তন করা উচিত নয়। ওষুধ হাতে পাওয়ার পর মোড়ক, দলীয় নম্বর, মেয়াদের তারিখ এবং চালান মিলিয়ে নিতে হবে। কোনো অস্বাভাবিকতা চোখে পড়লে বা ওষুধটি নিয়ে সন্দেহ হলে সেটি খাওয়ার আগে চিকিৎসক বা ঔষধবিজ্ঞানীর পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
আরটিভি/জেএমএ


