
বাইরে বের হওয়ার আগে পারফিউম ব্যবহার এখন অনেকের দৈনন্দিন সাজগোজের অংশ। কেউ কবজিতে, কেউ কানের পেছনে আবার কেউ সরাসরি ঘাড়ে সুগন্ধি স্প্রে করেন। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই দাবি করা হয়, ঘাড়ের মতো নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়মিত পারফিউম ব্যবহার করলে নাকি ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এমন দাবিতে অনেকের মধ্যেই উদ্বেগ তৈরি হয়। মূলত পারফিউমে থাকা বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান নিয়েই এই প্রশ্ন। তবে বর্তমান বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুযায়ী, ঘাড়ে পারফিউম স্প্রে করলেই ক্যানসার হয়—এমন প্রমাণ নেই।
আমেরিকান ক্যানসার সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, প্রসাধনী ও সুগন্ধি পণ্যের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়ে গবেষণায় কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে স্বাভাবিক ব্যবহারে এসব পণ্য ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়—এমন শক্ত প্রমাণ খুবই সীমিত।
পারফিউম নিয়ে এত আলোচনা কেন?
পারফিউমে বিভিন্ন ধরনের সুগন্ধি উপাদান, দ্রাবক ও অন্যান্য রাসায়নিক থাকতে পারে। এসব উপাদানের কিছু মানুষের ত্বকে অ্যালার্জি বা সংবেদনশীলতা তৈরি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সুগন্ধি উপাদান কিছু মানুষের অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া বা ত্বকের সংবেদনশীলতার কারণ হতে পারে। পারফিউম ব্যবহারের পর ত্বকে চুলকানি, লালচে ভাব, জ্বালাপোড়া বা ফুসকুড়ি দেখা দিলে ব্যবহার বন্ধ করা উচিত।
তবে ত্বকে অ্যালার্জি বা জ্বালাপোড়া হওয়া এবং ক্যানসারের ঝুঁকি এক বিষয় নয়। কোনো পণ্য ত্বকে জ্বালা সৃষ্টি করলেই সেটি ক্যানসার সৃষ্টি করে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।
ঘাড়ে পারফিউম দিলেই কি ক্যানসার হতে পারে?
বর্তমান বৈজ্ঞানিক তথ্য অনুযায়ী, ঘাড়ে পারফিউম স্প্রে করার সঙ্গে ক্যানসারের সরাসরি সম্পর্ক প্রমাণিত হয়নি।
প্রসাধনী ও সুগন্ধি পণ্যে ব্যবহৃত অনেক উপাদানের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে এখনও পর্যাপ্ত গবেষণা হয়নি। কিছু রাসায়নিক নিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকির প্রশ্ন থাকলেও বাস্তব জীবনে মানুষ যে মাত্রায় এসব উপাদানের সংস্পর্শে আসে, তা পরীক্ষাগারে ব্যবহৃত বেশি মাত্রার সংস্পর্শের সঙ্গে এক নয়।
তাই ঘাড়ে পারফিউম ব্যবহারকে সরাসরি ক্যানসারের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়।
ত্বকের অ্যালার্জির বিষয়টি মাথায় রাখুন
পারফিউম ব্যবহারে ক্যানসারের প্রমাণ না থাকলেও ত্বকের অ্যালার্জির বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়। বিশেষ করে যাদের ত্বক সংবেদনশীল, তাদের ক্ষেত্রে পারফিউম ব্যবহারের পর লালচে দাগ, চুলকানি বা জ্বালাপোড়া দেখা দিতে পারে।
নতুন কোনো পারফিউম ব্যবহারের পর এমন সমস্যা হলে সেটি নিয়মিত ব্যবহার না করাই ভালো।
সব উপাদান কি বোঝা যায়?
পারফিউমে থাকা সব উপাদানের নাম সবসময় আলাদাভাবে লেখা নাও থাকতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, অনেক প্রসাধনীতে সুগন্ধি তৈরিতে ব্যবহৃত একাধিক উপাদান আলাদাভাবে উল্লেখ না করে সামগ্রিকভাবে ‘সুগন্ধি’ হিসেবে লেখা হতে পারে।
ফলে শুধু পণ্যের গায়ে লেখা তথ্য দেখে সুগন্ধি মিশ্রণের প্রতিটি উপাদান জানা সবসময় সম্ভব হয় না। যাদের নির্দিষ্ট কোনো সুগন্ধি উপাদানে অ্যালার্জি রয়েছে, তাদের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ফথালেট নিয়ে কী জানা যায়?
পারফিউম নিয়ে ক্যানসারের আলোচনা হলে ফথালেটের নামও প্রায়ই আসে। বিভিন্ন প্রসাধনী ও সুগন্ধি পণ্যে ফথালেট ব্যবহার করা হয়েছে। এর মধ্যে ডাইইথাইল ফথালেট অন্যতম।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, প্রসাধনী ও সুগন্ধিতে বর্তমানে যেভাবে ডাইইথাইল ফথালেট ব্যবহার করা হয়, তা নিয়ে তাদের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ নেই।
তাই শুধু পারফিউমে ফথালেটের উপস্থিতির কথা শুনেই ক্যানসারের ঝুঁকি নিশ্চিত ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
সূর্যের আলোতেও হতে পারে সমস্যা
পারফিউমের কিছু উপাদান ত্বকে সংবেদনশীলতা তৈরি করতে পারে। আবার কিছু অপরিহার্য তেল সূর্যের আলোতে ত্বকের সংবেদনশীলতা বাড়াতে পারে।
জাতীয় ক্যানসার ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, কিছু সাইট্রাসজাতীয় অপরিহার্য তেল ত্বকে লাগিয়ে সূর্যের আলোতে গেলে সূর্যালোকজনিত সংবেদনশীলতা দেখা দিতে পারে।
তাই কোনো পারফিউম বা সুগন্ধি পণ্যের গায়ে ব্যবহারের বিশেষ সতর্কতা লেখা থাকলে তা মেনে চলা উচিত।
পারফিউম ব্যবহারে কী কী সতর্কতা নেবেন?
পারফিউম পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকা ভালো।
১. নতুন পারফিউম ব্যবহারের আগে পণ্যের গায়ে থাকা উপাদানের তালিকা দেখে নিন।
২. ত্বক সংবেদনশীল হলে সুগন্ধিবিহীন পণ্য বেছে নিতে পারেন।
৩. পারফিউম ব্যবহারের পর চুলকানি, জ্বালাপোড়া বা ফুসকুড়ি হলে ব্যবহার বন্ধ করুন।
৪. চোখ, কাটা বা ক্ষতস্থান এবং জ্বালাপোড়া করা ত্বকে পারফিউম ব্যবহার করবেন না।
৫. কোনো নির্দিষ্ট উপাদানে আগে থেকেই অ্যালার্জি থাকলে সেটি এড়িয়ে চলুন।
৬. পারফিউম ব্যবহারের পর ত্বকের সমস্যা বারবার হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
তাহলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দাবিটি কতটা সত্য?
ঘাড়ে পারফিউম স্প্রে করলেই ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে—এমন দাবির পক্ষে বর্তমানে শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। তবে এর অর্থ এই নয় যে পারফিউমের প্রতিটি উপাদান নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা সম্পূর্ণ হয়ে গেছে। প্রসাধনী উপাদানের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যপ্রভাব নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
তাই পারফিউম নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই। আবার ত্বকে কোনো অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখা দিলে সেটিকেও অবহেলা করা উচিত নয়। পণ্যের মান, উপাদানের তালিকা এবং নিজের ত্বকের সংবেদনশীলতা বিবেচনা করে পারফিউম ব্যবহার করাই সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি।
আরটিভি/জেএমএ


