
বিশ্বজুড়ে নারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হওয়া ক্যান্সারগুলোর একটি স্তন ক্যান্সার। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক নারী এই রোগে আক্রান্ত হন এবং অনেকেই মারা যান। আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বে প্রতিবছর নতুন স্তন ক্যান্সার রোগীর সংখ্যা ৩২ লাখ এবং মৃত্যুর সংখ্যা ১১ লাখে পৌঁছাতে পারে।
বাংলাদেশেও নারীদের জন্য স্তন ক্যান্সার একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি। আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর নারীদের মধ্যে সাড়ে নয় হাজারের বেশি নতুন স্তন ক্যান্সারের ঘটনা শনাক্ত হয়।
তবে স্তন ক্যান্সার ধরা পড়ার পর রোগটি শরীরের কতটা অংশে ছড়িয়েছে, তা জানা চিকিৎসার ধরন ঠিক করার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টিউমারের আকার, কাছাকাছি লসিকাগ্রন্থিতে ক্যান্সার ছড়িয়েছে কি না এবং শরীরের অন্য কোথাও ছড়িয়েছে কি না—এসব বিষয় বিবেচনা করে রোগের পর্যায় নির্ধারণ করা হয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে স্তন ক্যান্সারকে সাধারণত পাঁচটি পর্যায়ে ভাগ করা হয়—শূন্য থেকে চার। শূন্য পর্যায়ে ক্যান্সার কোষ নির্দিষ্ট জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকে। আর চতুর্থ পর্যায়ে তা শরীরের দূরবর্তী অংশেও ছড়িয়ে পড়ে।
যেভাবে স্তন ক্যান্সারের পর্যায় নির্ধারণ করা হয়
স্তন ক্যান্সারের পর্যায় নির্ধারণে টিউমার, লসিকাগ্রন্থি ও শরীরের অন্য অংশে ক্যান্সার ছড়িয়েছে কি না—এই তিনটি বিষয় বিশেষভাবে দেখা হয়।
এ ছাড়া ক্যান্সারের হরমোন গ্রহণকারী অংশের অবস্থা, এইচইআর২ নামের একটি বিশেষ প্রোটিনের উপস্থিতি, ক্যান্সারের প্রকৃতি এবং কিছু ক্ষেত্রে বংশগত বৈশিষ্ট্যভিত্তিক পরীক্ষার ফলও বিবেচনা করা হয়।
শূন্য পর্যায়: ক্যান্সার নির্দিষ্ট জায়গায় সীমাবদ্ধ
শূন্য পর্যায়ে ক্যান্সার কোষ সাধারণত স্তনের দুধ বহনকারী নালির মধ্যে থাকে। তবে তা আশপাশের স্তন টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়ে না। এই অবস্থাকে দুধনালির ভেতরে সীমাবদ্ধ ক্যান্সার বলা হয়।
প্রথম পর্যায়: ক্যান্সার ছড়ানো শুরু
প্রথম পর্যায় হলো আক্রমণাত্মক স্তন ক্যান্সারের শুরুর পর্যায়। এ সময় ক্যান্সার কোষ স্তনের স্বাভাবিক টিস্যুতে ছড়াতে শুরু করে।
প্রথম পর্যায় ক: টিউমারের আকার ২ সেন্টিমিটার বা তার কম থাকে। এ সময় স্তনের বাইরে বা কাছাকাছি লসিকাগ্রন্থিতে ক্যান্সার ছড়ায় না।
প্রথম পর্যায় খ: কখনো স্তনে স্পষ্ট কোনো টিউমার নাও থাকতে পারে। টিউমার থাকলে সেটি ২ সেন্টিমিটার বা তার কম হতে পারে। একই সঙ্গে কাছাকাছি লসিকাগ্রন্থিতে অল্প পরিমাণ ক্যান্সার কোষ পাওয়া যেতে পারে।
দ্বিতীয় পর্যায়: কাছাকাছি লসিকাগ্রন্থিতে ছড়াতে পারে
দ্বিতীয় পর্যায় ক: স্তনে টিউমার নাও থাকতে পারে। টিউমার থাকলে তা ২ সেন্টিমিটারের কম হতে পারে এবং বগলের নিচে বা স্তনবোনের কাছাকাছি সর্বোচ্চ তিনটি লসিকাগ্রন্থিতে ক্যান্সার ছড়াতে পারে।
আবার কিছু ক্ষেত্রে টিউমারের আকার ২ থেকে ৫ সেন্টিমিটার হতে পারে। তবে তখন কাছাকাছি লসিকাগ্রন্থিতে ক্যান্সার ছড়ানোর প্রমাণ থাকে না।
দ্বিতীয় পর্যায় খ: টিউমারের আকার ২ থেকে ৫ সেন্টিমিটার হতে পারে। এ সময় কাছাকাছি লসিকাগ্রন্থিতে অল্প পরিমাণ ক্যান্সার কোষ পাওয়া যেতে পারে। আবার বগলের নিচে বা স্তনবোনের কাছাকাছি সর্বোচ্চ তিনটি লসিকাগ্রন্থিতেও ক্যান্সার ছড়াতে পারে।
কিছু ক্ষেত্রে টিউমার ৫ সেন্টিমিটারের চেয়েও বড় হতে পারে। তবে তখন কাছাকাছি লসিকাগ্রন্থিতে ক্যান্সার ছড়ানোর প্রমাণ থাকে না।
তৃতীয় পর্যায়: স্তন ও আশপাশে বেশি ছড়িয়ে পড়ে
তৃতীয় পর্যায়ে ক্যান্সার স্তনের আশপাশের টিস্যু ও লসিকাগ্রন্থিতে আরও বেশি ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তৃতীয় পর্যায় ক: টিউমার দৃশ্যমান নাও হতে পারে। টিউমার থাকলে সেটি যেকোনো আকারের হতে পারে এবং বগলের নিচে বা স্তনবোনের কাছাকাছি চার থেকে নয়টি লসিকাগ্রন্থিতে ক্যান্সার ছড়াতে পারে।
অন্য ক্ষেত্রে টিউমার ৫ সেন্টিমিটারের বেশি হতে পারে এবং সর্বোচ্চ তিনটি কাছাকাছি লসিকাগ্রন্থিতে ক্যান্সার ছড়াতে পারে।
তৃতীয় পর্যায় খ: টিউমার যেকোনো আকারের হতে পারে। এ সময় ক্যান্সার স্তনের বুকের দেয়াল, ত্বক অথবা উভয় জায়গায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। বগলের নিচে সর্বোচ্চ নয়টি লসিকাগ্রন্থি বা কলারবোনের আশপাশের লসিকাগ্রন্থিতেও ক্যান্সার ছড়াতে পারে।
তৃতীয় পর্যায় গ: টিউমার যেকোনো আকারের হতে পারে এবং বুকের দেয়াল বা স্তনের ত্বকে ছড়িয়ে পড়তে পারে। একই সঙ্গে বগলের নিচে বা স্তনবোনের কাছাকাছি লসিকাগ্রন্থি, কলারবোনের আশপাশের লসিকাগ্রন্থি কিংবা বগলের নিচে ১০ বা তার বেশি লসিকাগ্রন্থিতে ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়তে পারে।
চতুর্থ পর্যায়: শরীরের দূরবর্তী অংশে ছড়িয়ে পড়ে
চতুর্থ পর্যায়কে ছড়িয়ে পড়া স্তন ক্যান্সারও বলা হয়। এ পর্যায়ে ক্যান্সার স্তন ও কাছাকাছি লসিকাগ্রন্থির বাইরে শরীরের দূরবর্তী অংশে ছড়িয়ে পড়ে।
স্তন ক্যান্সার সাধারণত হাড়, মস্তিষ্ক, যকৃৎ ও ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ক্যান্সার শরীরের কোন অংশে ছড়িয়েছে, তার ওপর উপসর্গও নির্ভর করতে পারে।
সাধারণভাবে অতিরিক্ত ক্লান্তি, দুর্বলতা, অনিচ্ছাকৃত ওজন কমে যাওয়া এবং ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়া জায়গার আশপাশে ব্যথা দেখা দিতে পারে।
যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে
স্তন ক্যান্সারের লক্ষণ ব্যক্তি ও রোগের ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে। কারও আবার শুরুতে কোনো স্পষ্ট উপসর্গ নাও থাকতে পারে।
তবে সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণগুলোর একটি হলো স্তনে ব্যথাহীন গাঁট। এ ছাড়া বগলের নিচে বা কলারবোনের কাছে লসিকাগ্রন্থি ফুলে যেতে পারে। স্তন বা বোঁটায় ব্যথা, স্তনের কোনো অংশ ফুলে যাওয়া, ত্বকে গর্তের মতো হয়ে যাওয়া, ত্বক মোটা বা লালচে হওয়া এবং খসখসে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
বোঁটা দিয়ে রক্তমিশ্রিত তরল বের হওয়া কিংবা বোঁটা ভেতরের দিকে ঢুকে যাওয়াও স্তন ক্যান্সারের সম্ভাব্য লক্ষণ হতে পারে।
কোন পর্যায়ে বেঁচে থাকার হার কত
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের তথ্যভান্ডারে স্তন ক্যান্সার শরীরে কতটা ছড়িয়েছে, তার ভিত্তিতে তিনটি ভাগ করা হয়—স্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ, কাছাকাছি অংশে ছড়ানো এবং শরীরের দূরবর্তী অংশে ছড়ানো।
তথ্য অনুযায়ী, স্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা ক্যান্সারের ক্ষেত্রে পাঁচ বছর পর বেঁচে থাকার হার ৯৯ দশমিক ৩ শতাংশ। কাছাকাছি লসিকাগ্রন্থি বা টিস্যুতে ছড়িয়ে পড়লে এই হার ৮৬ দশমিক ৩ শতাংশ। আর শরীরের দূরবর্তী অংশে ছড়িয়ে পড়লে পাঁচ বছর পর বেঁচে থাকার হার ৩১ শতাংশ।
সব ধরনের স্তন ক্যান্সার মিলিয়ে পাঁচ বছর পর বেঁচে থাকার গড় হার ৯০ দশমিক ৮ শতাংশ।
তবে এসব পরিসংখ্যান বড় জনগোষ্ঠীর ওপর ভিত্তি করে তৈরি। একজন নির্দিষ্ট রোগীর ক্ষেত্রে বয়স, সামগ্রিক স্বাস্থ্য, ক্যান্সারের ধরন এবং চিকিৎসায় সাড়া দেওয়ার মতো বিভিন্ন বিষয় ফলাফলে প্রভাব ফেলতে পারে।
স্তন ক্যান্সারের পর্যায় জানা রোগটি কতটা ছড়িয়েছে এবং চিকিৎসার ধরন সম্পর্কে ধারণা পেতে সাহায্য করে। তবে একই পর্যায়ের সব রোগীর অবস্থা এক রকম নয়। তাই স্তনে অস্বাভাবিক কোনো পরিবর্তন দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানো জরুরি।
সূত্র: হেলথলাইন
আরটিভি/জেএমএ

