
ঘুম শুধু ক্লান্তি দূর করার উপায় নয়, শরীর ও মস্তিষ্ক সুস্থ রাখার জন্যও এটি অত্যন্ত জরুরি। আমরা ঘুমিয়ে থাকলেও শরীর তখন নানা গুরুত্বপূর্ণ কাজ চালিয়ে যায়। মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম ঠিক রাখা, শরীরের সুস্থতা বজায় রাখা এবং শিশু-কিশোরদের বেড়ে ওঠায় ঘুমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শুধু দিনের বেলায় ক্লান্তি বা ঘুমঘুম ভাবই হয় না, বরং হৃদ্যন্ত্র, রক্তচাপ, শরীরের ওজন, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং স্মৃতিশক্তিতেও এর প্রভাব পড়তে পারে। তাই প্রতিদিন পর্যাপ্ত ও ভালো মানের ঘুম নিশ্চিত করা জরুরি।
হৃদ্যন্ত্রের ওপর প্রভাব পড়ে
ঘুমের সময় শরীর কিছুটা বিশ্রামের অবস্থায় থাকে। এ সময় রক্তচাপ ও হৃদ্স্পন্দন কমে যায়। ফলে জেগে থাকার সময়ের তুলনায় হৃদ্যন্ত্রকে কম পরিশ্রম করতে হয়।
কিন্তু পর্যাপ্ত ঘুম না হলে বা রাতে বারবার ঘুম ভেঙে গেলে হৃদ্যন্ত্র ও রক্তনালির ওপর চাপ বাড়তে পারে। দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, স্থূলতা ও মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বন্ধ হওয়ার মতো সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ক্ষুধা ও ওজন নিয়ন্ত্রণে সমস্যা হয়
ঘুমের সঙ্গে শরীরের ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনেরও সম্পর্ক রয়েছে। পর্যাপ্ত ঘুম না হলে এসব হরমোনের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।
এর ফলে বেশি খাবার খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে অতিরিক্ত মিষ্টি, চর্বিযুক্ত ও লবণাক্ত খাবারের প্রতি আগ্রহ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে শরীরচর্চার আগ্রহ ও শারীরিক সক্রিয়তাও কমে যেতে পারে।
দীর্ঘদিন এমন চললে শরীরে অতিরিক্ত ওজন জমা এবং বিপাকীয় নানা সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে ব্যাঘাত ঘটে
ঘুমের অভাব শরীরের ইনসুলিনের প্রতি স্বাভাবিক সাড়া দেওয়ার ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। ফলে শরীরে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়ায় সমস্যা তৈরি হতে পারে।
দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ও মানসম্মত ঘুম না হলে বিপাকীয় সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এর সঙ্গে অতিরিক্ত খাবার খাওয়া ও শারীরিক সক্রিয়তা কমে যাওয়াও যুক্ত হয়ে শরীরের ওজন বাড়াতে পারে।
রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হতে পারে
ঘুমের সময় শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থার বিভিন্ন অংশ সক্রিয় থাকে। শরীরের কিছু রোগ প্রতিরোধকারী কোষ ঘুমের সময় আরও সক্রিয়ভাবে কাজ করে।
তাই নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুম না হলে সর্দি-কাশি ও অন্যান্য সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। অর্থাৎ শরীরকে রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে সাহায্য করার ক্ষেত্রেও ঘুম গুরুত্বপূর্ণ।
স্মৃতি ও চিন্তাশক্তিতে প্রভাব পড়ে
ঘুম শেখা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্মৃতি তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পর্যাপ্ত বা ভালো মানের ঘুম না হলে কোনো কাজে মনোযোগ দেওয়া এবং পরিষ্কারভাবে চিন্তা করা কঠিন হতে পারে।
এর ফলে দৈনন্দিন কাজ, পড়াশোনা কিংবা অন্য গুরুত্বপূর্ণ কাজে মনোযোগ ও কর্মক্ষমতা কমে যেতে পারে।
শ্বাসকষ্টের সমস্যাও বাড়তে পারে
ঘুমের সময় শ্বাস নেওয়ার গতি ও গভীরতা কিছুটা কমে যায়। ফলে হাঁপানি বা দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের সমস্যায় ভুগছেন এমন ব্যক্তিদের শ্বাসকষ্টের সমস্যা বাড়তে পারে।
হাঁপানির উপসর্গ বিশেষ করে ভোরের দিকে বেশি দেখা দিতে পারে। একইভাবে দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগ থাকলেও ঘুমের সময় শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা বাড়তে পারে।
কত ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি রাতে সাধারণত ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমানো উচিত। যারা নিয়মিত ৭ ঘণ্টার কম ঘুমান, তাদের বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
তবে ৯ ঘণ্টার বেশি ঘুম সবসময় ক্ষতিকর নয়। তরুণদের, দীর্ঘদিনের ঘুমের ঘাটতি পূরণ করছেন এমন ব্যক্তিদের কিংবা অসুস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বেশি ঘুমের প্রয়োজন হতে পারে।
শিশুদের প্রয়োজনীয় ঘুমের সময় বয়স অনুযায়ী ভিন্ন হয়। ৪ মাস থেকে ১ বছর বয়সী শিশুর ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা, ১ থেকে ২ বছর বয়সী শিশুর ১১ থেকে ১৪ ঘণ্টা, ৩ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুর ১০ থেকে ১৩ ঘণ্টা এবং ৬ থেকে ১২ বছর বয়সী শিশুর ৯ থেকে ১২ ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুমের পরামর্শ দেওয়া হয়।
ঘুম খুব কম হচ্ছে বা অতিরিক্ত হচ্ছে বলে মনে হলে নিজের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের সঙ্গে এবং শিশুর ক্ষেত্রে শিশুর চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করা উচিত।
সূত্র: ন্যাশনাল হার্ট, লাং এন্ড ব্লাড ইনস্টিটিউট, ইউএসএ
আরটিভি/জেএমএ


