
সবুজে ঘেরা উঠান, পুকুরপাড়ের পথ আর গাছপালায় ঢাকা দেয়াল—এমন নান্দনিক নকশার জন্য বিশ্বের সেরা নতুন স্থাপনার স্বীকৃতি পেয়েছে বাংলাদেশের একটি কারখানা। রংপুরের সাততলা গালিচা তৈরির কারখানা গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি জিতেছে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব ব্রিটিশ আর্কিটেক্টসের (রিবা-RIBA) আন্তর্জাতিক স্থাপত্য পুরস্কার।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) ঘোষিত এ পুরস্কারের বিচারকেরা কারখানাটির নকশাকে ‘নীরব নম্রতার কাজ’ (work of quiet humility) প্রকাশকারী স্থাপত্য হিসেবে বর্ণনা করেন। তাদের মতে, কর্মীদের জীবনমান ও প্রকৃতির সঙ্গে কাজের পরিবেশের সংযোগ তৈরির বিষয়টি এ স্থাপনাকে বিশেষ করে তুলেছে।

১ লাখ ৪৪ হাজার বর্গফুটেরও বেশি জায়গাজুড়ে নির্মিত কারখানাটির নকশা করেছে বাংলাদেশের স্থাপত্য প্রতিষ্ঠান নকশাবিদ আর্কিটেক্টস। স্থপতিরা বাংলার ঐতিহ্যবাহী বাড়ির নকশা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছেন। এসব বাড়িতে সাধারণত উঠান ও পুকুর থাকে। সেই ভাবনা থেকেই কারখানাটিতে রাখা হয়েছে সবুজ বাগান, গাছপালায় ঘেরা বারান্দা, পুকুরপাড়ের পথ এবং গাছে ঢাকা দেয়াল।
তবে শুধু নান্দনিক নকশাই নয়, প্রায় ৫ হাজার কর্মীর জন্য সুযোগ-সুবিধা রাখার বিষয়টিও বিচারকদের প্রশংসা পেয়েছে। কারখানাটির অধিকাংশ কর্মী নারী।
কর্মীদের জন্য ছাদে শিশুদের যত্ন নেওয়ার কেন্দ্র, চিকিৎসাসেবা এবং অবসর সময়ে একসঙ্গে বসার ছায়াঘেরা জায়গা রয়েছে। প্রবেশপথে স্থাপন করা হয়েছে এক নারীর বড় ভাস্কর্য। স্থপতিদের ভাষ্য, এটি নারীর ক্ষমতায়ন ও শক্তির প্রতীক।
রিবার বিচারক দল গত সেপ্টেম্বর কারখানাটি পরিদর্শন করে। সংস্থাটি জানিয়েছে, কর্মীরা কাজের সময়ের বাইরেও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কারখানার বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ব্যবহার করেন। বিচারকদের মতে, এই প্রকল্প কারখানার নকশা ও পরিচালনার ক্ষেত্রে একটি বিকল্প দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।

নকশাবিদ আর্কিটেক্টসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান স্থপতি বায়েজিদ এম. খন্দকার পুরস্কার ঘোষণার আগে এক বিবৃতিতে বলেন, তিনি দেখাতে চেয়েছেন, শিল্পকারখানাও মানুষের যত্ন নিতে পারে, অনুপ্রেরণা জোগাতে পারে এবং প্রাণবন্ত পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
তিনি বলেন, যারা একটি কারখানায় কাজ করেন, তাদের জন্য কারখানাটিকে প্রথমে একটি বাড়ি হিসেবে নকশা করা হলে কেমন হয়—আমরা এই সহজ প্রশ্নটি সামনে রেখেছিলাম। প্রতিটি উঠান, বাগান, জলাধার ও ছায়াঘেরা বারান্দা সেই ভাবনা থেকেই তৈরি হয়েছে।

কারখানাটি পরিচালনা করে কারুপণ্য রংপুর লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি হাতে তৈরি গালিচার পাশাপাশি দরজার সামনে ও গোসলখানায় ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন ধরনের মাদুরও তৈরি করে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই স্বীকৃতি?
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বস্ত্রপণ্য উৎপাদনকারী দেশ। তবে দেশের কারখানাগুলোর কর্মপরিবেশ ও শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে।
২০১৩ সালে ঢাকার কাছে সাভারে রানা প্লাজা ধসে প্রায় ১ হাজার ১০০ মানুষ নিহত হন। ভবনটিতে পোশাক কারখানা ছিল। ভবনে ফাটল দেখা দেওয়ার পরও শ্রমিকদের কাজে ফিরতে বাধ্য করার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনা কারখানার নিরাপত্তা ও শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা তৈরি করে।

রিবার মতে, গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরির নকশায় কর্মীদের সুস্থতা ও মর্যাদাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কারখানাটিতে শ্রমিক, ব্যবস্থাপক ও মালিকদের জন্য একই প্রধান প্রবেশপথ রাখা হয়েছে। বাংলাদেশে অনেক বড় কারখানায় শ্রমিক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জন্য আলাদা প্রবেশপথ থাকার প্রচলন রয়েছে। পুরস্কারের বিচারক দলের প্রধান বিজয় জেয়েন (jury chair, Bijoy Jain) একই প্রবেশপথকে সবার জন্য সমান মর্যাদার প্রতীক হিসেবে উল্লেখ করেন।
২০১৬ সালে চালু হওয়া রিবার আন্তর্জাতিক পুরস্কার সাধারণত দুই বছর পরপর দেওয়া হয়। স্থাপত্যে নতুন চিন্তা, উদ্ভাবনী নকশা ও উৎকর্ষের স্বীকৃতি হিসেবে এই পুরস্কার দেওয়া হয়।
এবার চারটি স্থাপনা চূড়ান্ত তালিকায় ছিল। বাংলাদেশের গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরির পাশাপাশি ঢাকার জলবায়ু উপযোগী ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ও তালিকায় জায়গা পেয়েছিল। বাকি দুটি স্থাপনা বেলজিয়ামে অবস্থিত—একটি ষাটের দশকের একটি দপ্তর ভবন সংস্কার করে তৈরি করা হয়েছে, অন্যটি একটি শিল্পকলা প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারিত ভবন।
২০২৪ সালে স্পেনের বার্সেলোনায় ছয়তলা কাঠের সামাজিক আবাসন প্রকল্প এ পুরস্কার জিতেছিল। এর আগের বিজয়ীদের মধ্যে রয়েছে ব্রাজিলের গ্রামীণ এলাকার একটি বিদ্যালয়, পেরুর একটি বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাংলাদেশের বন্যাপ্রবণ প্রত্যন্ত অঞ্চলে নির্মিত একটি হাসপাতাল।
সূত্র: সিএনএন
আরটিভি/জেএমএ


