ঢাকা মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ২৮ আশ্বিন ১৪৩৩

বনে ছাড়ার পর ৯ লজ্জাবতী বানরের ৭টিই মারা গেল, কারণ কী

আরটিভি নিউজ

প্রকাশ : ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১১:৩৫ এএম
সিলেটের গোয়াইনঘাটের জাফলং থেকে উদ্ধার লজ্জাবতী বানর । ছবি: সংগৃহীত

উদ্ধার করা বন্য প্রাণী সংরক্ষিত বনে ছেড়ে দেওয়া হলে সাধারণত স্বস্তি ফেরে। কিন্তু উপযুক্ত আবাস, খাবার ও একই প্রজাতির প্রাণীর উপস্থিতি বিবেচনা না করে প্রাণী অবমুক্ত করা হলে সেই বনই হয়ে উঠতে পারে মৃত্যুফাঁদ। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে অবমুক্ত করা বেঙ্গল লজ্জাবতী বানর নিয়ে করা নতুন এক গবেষণায় এমনই উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে।

গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী গবেষণায় দেখা গেছে, বনে ছেড়ে দেওয়া নয়টি লজ্জাবতী বানরের মধ্যে ছয় মাসের বেশি বেঁচে ছিল মাত্র দুটি। মারা যাওয়া সাতটি বানরের মধ্যে চারটির দেহে একই প্রজাতির অন্য বানরের আক্রমণের চিহ্ন পাওয়া গেছে।

চলতি বছর আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘গ্লোবাল ইকোলজি অ্যান্ড কনজারভেশন’-এ গবেষণাটি প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশের গবেষক হাসান আল-রাজির নেতৃত্বে দেশি-বিদেশি আরও ১০ গবেষক এতে অংশ নেন। গবেষণায় বন বিভাগসহ বাংলাদেশ, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান যুক্ত ছিল।

যেভাবে করা হয় গবেষণা

বন বিভাগ বিভিন্ন সময় শিকারি, ব্যবসায়ী, পোষা প্রাণীর মালিক ও মানুষের বসতবাড়ির বাগান থেকে লজ্জাবতী বানর উদ্ধার করে। এসব প্রাণীকে বনে ছাড়ার আগে তাদের ওজন, আঘাত ও অসুস্থতার লক্ষণ পরীক্ষা করা হয়। কম ওজনের বানরগুলোকে সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত জানকিছড়া বন্য প্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসনকেন্দ্রে রাখা হয়।

পরে ক্যামেরার মাধ্যমে তাদের রাতের চলাফেরা, খাবার গ্রহণ ও আচরণ পর্যবেক্ষণ করা হয়। ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে নয়টি বানরকে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে ছেড়ে দেওয়া হয়।

এর মধ্যে পাঁচটিকে জানকিছড়া এলাকার কাছে এবং চারটিকে অন্য এলাকায় অবমুক্ত করা হয়। প্রতিটি বানরের গলায় বেতার সংকেত শনাক্তকারী কলার পরিয়ে আট মাসে মোট ১৩৮ রাত তাদের অবস্থান ও আচরণ পর্যবেক্ষণ করেন গবেষকেরা।

১০ দিনের মধ্যেই মারা যায় তিনটি

গবেষণায় দেখা যায়, নয়টি বানরের তিনটি বনে ছাড়ার ১০ দিনের মধ্যেই মারা যায়। আরও চারটি এক মাসের বেশি বেঁচে থাকলেও শেষ পর্যন্ত মারা যায়। ‘অনু’ নামের একটি পুরুষ বানর ১৭৯ দিন পর সংঘর্ষে মারা যায়।

অন্যদিকে ডারউইন ও নিশাত নামের দুটি বানর ছয় মাসের বেশি সময় বেঁচে ছিল।

মারা যাওয়া সাতটি বানরের মধ্যে চারটির দেহ পরীক্ষার উপযোগী অবস্থায় পাওয়া যায়। তাদের মাথা, মুখ অথবা আঙুলে অন্য লজ্জাবতী বানরের আক্রমণের চিহ্ন ছিল। বাকি তিনটির দেহ পচে যাওয়ায় মৃত্যুর কারণ শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তাই সাতটি বানরই অন্য লজ্জাবতী বানরের আক্রমণে মারা গেছে—এমন দাবি করেননি গবেষকেরা।

গবেষণায় আরও দেখা যায়, জানকিছড়া কেন্দ্রের কাছে ছাড়া পাঁচটি বানরের একটিও বেঁচে থাকেনি। বন বিভাগের নথি অনুযায়ী, ২০২০ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের মার্চ পর্যন্ত ওই এলাকায় মোট ১৯টি লজ্জাবতী বানর ছাড়া হয়েছিল।

গবেষকদের ধারণা, একই এলাকায় বারবার বানর ছেড়ে দেওয়ার কারণে সেখানে প্রাণীর ঘনত্ব বেড়ে গিয়ে খাবার ও বসবাসের এলাকা নিয়ে প্রতিযোগিতা তৈরি হয়ে থাকতে পারে।

লজ্জাবতী বানরও এলাকা নিয়ে সংঘর্ষে জড়ায়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ ফিরোজ জামান গণমাধ্যমকে বলেন, লজ্জাবতী বানর দেখতে শান্ত হলেও তারা নিজেদের এলাকা নিয়ে অত্যন্ত সচেতন। আগে থেকেই কোনো এলাকা দখল করে থাকা প্রাণীর মুখোমুখি হলে নতুন বানর সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়তে পারে।

গবেষণায় দেখা গেছে, মারা যাওয়া কয়েকটি প্রাণী তুলনামূলকভাবে বেশি সতর্ক ও আক্রমণাত্মক আচরণ করেছিল। গবেষকদের মতে, এ ধরনের আচরণ দীর্ঘস্থায়ী চাপ ও নতুন পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারার ইঙ্গিত হতে পারে।

গবেষক হাসান আল-রাজি গণমাধ্যমকে বলেন, বন্য প্রাণী উদ্ধার অনেক ক্ষেত্রে শুধু লোকদেখানো কর্মকাণ্ডে পরিণত হয়েছে। যে যার মতো প্রাণী অবমুক্ত করেন। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন করাই তাঁদের গবেষণার অন্যতম লক্ষ্য।

বন হলেই উপযুক্ত আবাস নয়

গবেষকেরা বলছেন, কোনো প্রাণীকে বনে ছেড়ে দেওয়ার জন্য শুধু বনটি ঘন বা সবুজ হলেই হবে না। সেখানে একই প্রজাতির কতগুলো প্রাণী রয়েছে, খালি এলাকা আছে কি না, পর্যাপ্ত খাবার ও নিরাপদ চলাচলের সুযোগ রয়েছে কি না—এসব বিষয়ও আগে জানতে হবে।

গবেষকেরা প্রাণী অবমুক্তির আগে সম্ভাব্য এলাকায় প্রাণীর সংখ্যা ও চলাচল জরিপ, পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষা, প্রাণীটির উৎস শনাক্তকরণ, প্রজাতিভিত্তিক পুনর্বাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের সুপারিশ করেছেন।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক হাবিবুন নাহার গণমাধ্যমকে বলেন, প্রাণীকে বনে ছাড়ার আগে আধা প্রাকৃতিক বেষ্টনীতে রেখে তার আচরণ পর্যবেক্ষণ করা দরকার। এতে সময় ও অর্থ লাগলেও দেশে এ ধরনের চর্চা প্রায় নেই।

বন বিভাগের বন সংরক্ষক (বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চল) মো. ছানাউল্যা পাটওয়ারী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থায় ঘাটতির কথা গণমাধ্যমের কাছে স্বীকার করেছেন। তবে তিনি গণমাধ্যমকে জানান, এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় জনবল ও সম্পদের ঘাটতি রয়েছে।

বন্য প্রাণী গবেষকদের মতে, কোনো প্রাণীকে বনে ছেড়ে দেওয়ার ছবি দিয়ে সংরক্ষণ কার্যক্রম শেষ হয় না। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করে প্রাণীটি নতুন পরিবেশে বেঁচে থাকতে ও মানিয়ে নিতে পারছে কি না, তার ওপর।


আরটিভি/জেএমএ

আরটিভি অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন
মানুষের যন্ত্রণায় নিজেকে বদলে ফেলছে হিমালয়ের এই পাখি
মানুষের কর্মকাণ্ডের বিস্তারে বদলে যাচ্ছে হিমালয়ের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন পাখি মোনালের জীবনযাপন। অবকাঠামো উন্নয়ন, পর্যটন ও শব্দদূষণের কারণে পাখিটি তার স্বাভাবিক আবাসস্থল ছেড়ে আরও উঁচু এলাকায় সরে যাচ্ছে। একই সঙ্গে কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে যোগাযোগ বজায় রাখতে ডাকের ধরনও বদলাচ্ছে মোনাল।
মানুষের যন্ত্রণায় নিজেকে বদলে ফেলছে হিমালয়ের এই পাখি
মানুষের যন্ত্রণায় নিজেকে বদলে ফেলছে হিমালয়ের এই পাখি
মানুষের কর্মকাণ্ডের বিস্তারে বদলে যাচ্ছে হিমালয়ের অন্যতম দৃষ্টিনন্দন পাখি মোনালের জীবনযাপন। অবকাঠামো উন্নয়ন, পর্যটন ও শব্দদূষণের কারণে পাখিটি তার স্বাভাবিক আবাসস্থল ছেড়ে আরও উঁচু এলাকায় সরে যাচ্ছে। একই সঙ্গে কোলাহলপূর্ণ পরিবেশে যোগাযোগ বজায় রাখতে ডাকের ধরনও বদলাচ্ছে মোনাল।
মানুষের যন্ত্রণায় নিজেকে বদলে ফেলছে হিমালয়ের এই পাখি
বন্যপ্রাণীর গায়ে মাইক্রোচিপ বসাবে বন বিভাগ, কিন্তু কেন?
দেশের বন্যপ্রাণীর পাচার ঠেকাতে এবং সুরক্ষিত রাখতে এবার জন্তুদের গায়ে মাইক্রোচিপ বসানোর কথা ভাবছে বাংলাদেশ বন বিভাগ।
বন্যপ্রাণীর গায়ে মাইক্রোচিপ বসাবে বন বিভাগ, কিন্তু কেন?
আজ ‘রিমেম্বার মি থার্সডে’, ঘরহীন প্রাণীদের পাশে দাঁড়ানোর দিন 
সেপ্টেম্বরের চতুর্থ বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে রিমেম্বার মি থার্সডে।
আজ ‘রিমেম্বার মি থার্সডে’, ঘরহীন প্রাণীদের পাশে দাঁড়ানোর দিন 
ছয় মাসে সাড়ে ৪ লাখ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা
চলতি বছরের শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বজুড়ে রেকর্ড দাবদাহ, তীব্র খরা, দাবানল ও পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এর প্রভাবে আগামী ছয় মাসে বিশ্ব জুড়ে অতিরিক্ত প্রায় সাড়ে ৪ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে বলে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট ল্যাবের প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
ছয় মাসে সাড়ে ৪ লাখ মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা
আরও পড়ুন
পর্যটনের জন্য আবারও খুলে দেওয়া হচ্ছে সুন্দরবন
বিষ প্রয়োগে বন্য পাখি হত্যা, বন বিভাগের মামলা
গহিন সুন্দরবনে মিলল ৩ আস্তানা, উদ্ধারকৃত চিংড়িতে বিষের উৎকট গন্ধ
পসরা সাজিয়ে বাজারে বিক্রি হচ্ছিল হরিণের মাংস, এরপর যা ঘটল