
বাংলাদেশের পরবর্তী প্রজন্মের বোলার খুঁজে বের করার উদ্যোগে নতুন গতি এনেছে ‘রবি বোলার হান্ট ২০২৬’। দেশজুড়ে প্রতিভাবান বোলারদের খুঁজে বের করার পাশাপাশি এ আয়োজন তুলে এনেছে তাদের অদম্য ইচ্ছাশক্তি ও স্বপ্নপূরণের অনুপ্রেরণামূলক গল্প।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ও রবি আজিয়াটা পিএলসির যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে ক্রিকেটের প্রতি দেশের মানুষের আবেগ ও ভালোবাসার প্রতিফলন ঘটেছে। নিজেদের স্বপ্ন পূরণের সুযোগ কাজে লাগাতে এগিয়ে এসেছেন সম্ভাবনাময় বোলাররা।
বিসিবি সূত্রে জানা গেছে, এ কর্মসূচির মাধ্যমে ১৪৩ জন সম্ভাবনাময় বোলারকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ৫৬ জন পেসার বিশেষায়িত ক্যাম্প ও বাছাইয়ের পরবর্তী ধাপে জায়গা পেয়েছেন।
এই দলে রয়েছেন ৫১ জন পুরুষ বোলার, তিনজন নারী বোলার এবং শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা দুজন অংশগ্রহণকারী। চূড়ান্ত বাছাইয়ে ১২ জন বোলারকে নির্বাচন করার কথা রয়েছে। তাঁরা বিসিবির হাই পারফরম্যান্স (এইচপি) কর্মসূচির অধীনে পরবর্তী প্রশিক্ষণ ও উন্নয়নের সুযোগ পাবেন।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর মিরপুর শেরেবাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে এ কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়। তৃণমূল পর্যায় থেকে সম্ভাবনাময় বোলার খুঁজে বের করাই এর মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে যেসব এলাকায় বিশেষায়িত কোচিং ও আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা সীমিত, সেসব অঞ্চলের প্রতিভাবানদের সামনে সুযোগ তৈরিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কর্মসূচিটির স্লোগান ‘পারবে তুমিও’।
দেশজুড়ে ২৫ হাজারের বেশি তরুণ এ কর্মসূচিতে নিবন্ধন করেছেন। পেশাদার ক্রিকেটার হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে তরুণদের বিপুল আগ্রহেরই প্রতিফলন এই সংখ্যা।
বাসসের এক প্রশ্নের জবাবে রবি জানায়, “আমাদের সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছে অসাধারণ সহজাত প্রতিভা ও অটল সংকল্পের সমন্বয়। এই সুযোগকে ঘিরে অংশগ্রহণকারীদের উৎসাহ রবি বোলার হান্টের মতো উদ্যোগের গুরুত্ব আবারও প্রমাণ করেছে। সারা দেশ থেকে ২৫ হাজারের বেশি নিবন্ধন পেয়েছি আমরা, যা বাংলাদেশের তরুণদের ক্রিকেটের প্রতি গভীর আবেগের প্রমাণ।”
এর আগের আয়োজনগুলো থেকে রুবেল হোসেন, এবাদত হোসেন ও রিশাদ হোসেনের মতো বোলার উঠে এসেছেন, যাঁরা পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তাঁদের সাফল্য দেশের বোলিং শক্তি বাড়াতে তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিভা অন্বেষণের গুরুত্ব আরও জোরালো করেছে।
দেশের আট বিভাগের নয়টি ভেন্যুতে প্রাথমিক বাছাই অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন বিভিন্ন পর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও আনুষ্ঠানিক কোচিংয়ের সুযোগ পাওয়া কিংবা না-পাওয়া সম্ভাবনাময় বোলাররা।
বিসিবির এইচপি সহকারী মহাব্যবস্থাপক রাবীদ ইমাম বলেন, বিপুলসংখ্যক প্রতিভাবান অংশগ্রহণকারীর মধ্য থেকে বিশেষ গুণসম্পন্ন বোলারদের খুঁজে বের করা নির্বাচকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।
তিনি বলেন, “অধিকাংশ পেসারই নিজেদের প্রতিভার প্রমাণ দিয়েছে এবং দেখিয়েছে যে তারা সত্যিই সহজাত গুণের অধিকারী। কিন্তু আমরা সবাইকে নির্বাচন করতে পারি না। তাই যাদের মধ্যে কিছু অসাধারণ গুণ রয়েছে, তাদেরই বেছে নিয়েছি।”
বাছাই প্রক্রিয়ায় কোচিং প্যানেলে রয়েছেন বিসিবির এইচপি প্রধান কোচ মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন, পাকিস্তানের সাবেক লেগ স্পিনার মুশতাক আহমেদ, পেস বোলিং কোচ কোরি কলিমোর এবং কোচ সোহেল ইসলাম।
তারা অংশগ্রহণকারীদের কারিগরি দক্ষতা, কৌশলগত সক্ষমতা, শারীরিক সামর্থ্য ও ভবিষ্যতে উন্নতির সম্ভাবনা মূল্যায়ন করেছেন।
যেসব বোলার এখনো পদ্ধতিগত কারিগরি প্রশিক্ষণ পাননি, তাঁদের সহজাত দক্ষতা দেখে মুগ্ধ হয়েছেন সালাহউদ্দিন। তাঁর বিশ্বাস, যথাযথ প্রশিক্ষণ পেলে এসব বোলারকে আরও পরিপূর্ণ পারফরমারে পরিণত করা সম্ভব।
বাছাইয়ে উঠে এসেছে অধ্যবসায় ও স্বপ্নপূরণের বেশ কিছু অনুপ্রেরণামূলক গল্পও। জীবিকার সন্ধানে বিদেশে যাওয়া পেসার সাজিদুল ক্রিকেটের স্বপ্ন পূরণে বাংলাদেশে ফিরে এসে চূড়ান্ত বাছাইয়ে জায়গা করে নিয়েছেন।
রাজশাহীর বাছাইয়ে এক তরুণী হাত ভাঙা অবস্থায় অংশ নিয়েও অদম্য মনোবলের জোরে চূড়ান্ত পর্বে জায়গা করে নিয়েছেন। অন্যদিকে, চট্টগ্রামে নির্বাচকদের নজর কেড়েছে নয় বছর বয়সী প্রতিশ্রুতিশীল বোলার সাইফ।
পেস বোলারদের মধ্যে আবির বিশেষভাবে নজর কেড়েছেন। প্রাথমিক বাছাইয়ে তার বলের গতি ঘণ্টায় ১৩৮ কিলোমিটার পর্যন্ত উঠেছিল বলে জানা গেছে। সিলেটের বাছাইয়ে ঘণ্টায় ১৩২ কিলোমিটার গতিতে বল করে নির্বাচকদের মুগ্ধ করেছেন জুবায়েরও। তার গতি ও বোলিং অ্যাপ্রোচের কারণে দক্ষিণ আফ্রিকার ফাস্ট বোলার কাগিসো রাবাদার নামানুসারে তাকে ‘রাবাদা’ ডাকনাম দেওয়া হয়েছে।
তবে উচ্চপর্যায়ের ক্রিকেটে টিকে থাকার ক্ষেত্রে শুধু গতিই বিবেচ্য হবে না বলে সতর্ক করেছেন সালাহউদ্দিন।
কার্যকর বোলার হয়ে উঠতে লাইন-লেংথের নিয়ন্ত্রণ, বলের মুভমেন্ট এবং কৌশলগত সচেতনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।
স্পিন বিভাগেও সম্ভাবনাময় কয়েকজন বোলার নজরে এসেছেন। বাছাই নিয়ে আলোচনায় রয়েছেন রাতুল ও শোয়েব। তরুণ বাঁহাতি রিস্ট স্পিনার মোহাম্মদ সাইফও নজর কেড়েছেন। তার লক্ষ্য, বোলিংয়ে আরও বৈচিত্র্য আনা এবং বিভিন্ন ধরনের ডেলিভারি রপ্ত করা।
বাংলাদেশের লেগ স্পিনার রিশাদ হোসেনের সাফল্য তাকে অনুপ্রাণিত করেছে বলে জানিয়েছেন সাইফ। তার বক্তব্যে স্পষ্ট, প্রতিষ্ঠিত ক্রিকেটারদের সাফল্য পরবর্তী প্রজন্মের স্বপ্ন ও আকাঙ্খা গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এইচপি কর্মসূচির জন্য ১২ জন বোলার নির্বাচন হবে এ উদ্যোগের পরবর্তী ধাপ। নির্বাচিত ক্রিকেটাররা বিসিবির হাই পারফরম্যান্স কাঠামোর অধীনে বিশেষায়িত কোচিং ও নিজেদের দক্ষতা বিকাশের সুযোগ পাবেন।
আরটিভি/এসকে




