
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে থাকাকালীন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ফিটনেস ও দলের প্রতি নিবেদন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাবেক কোচ এরিক টেন হ্যাগ। তার দাবি, জুভেন্টাস ছাড়ার পর থেকেই রোনালদো আর আগের মতো পারফর্ম করতে পারছিলেন না। এমনকি গত সাত-আট বছর ধরেই নিজের সেরা ছন্দে ছিলেন না পর্তুগিজ মহাতারকা।
সম্প্রতি ইএসপিএন নেদারল্যান্ডসের ‘গুড মর্নিং এরেডিভিসি’ অনুষ্ঠানে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে নিজের সময়ের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা বলেন বর্তমানে এফসি টোয়েন্টির টেকনিক্যাল ডিরেক্টরের দায়িত্বে থাকা টেন হ্যাগ। সেখানেই রোনালদোর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এই ডাচ কোচ।
টেন হ্যাগের মতে, রোনালদো নিঃসন্দেহে সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার। তবে দলের সেরা খেলোয়াড় হওয়ার পাশাপাশি দলের জন্য নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার মানসিকতাও থাকতে হয়। রোনালদোর ক্ষেত্রে সেই জায়গাতেই সমস্যা ছিল।
তিনি বলেন, ‘সে নিঃসন্দেহে অসাধারণ একজন খেলোয়াড়, সর্বকালের অন্যতম সেরা। কিন্তু গত সাত-আট বছরের বাস্তবতা হলো, সে আর আগের মতো পারফর্ম করতে পারছিল না। জুভেন্টাস ছাড়ার সময় থেকেই যেন তার সেই অধ্যায় শেষ হয়ে গিয়েছিল।’
২০২১ সালে জুভেন্টাস ছেড়ে দ্বিতীয় মেয়াদে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে যোগ দেন রোনালদো। ওলে গুনার সুলশার ও টেন হ্যাগের অধীনে ক্লাবটির হয়ে ৫৪ ম্যাচে ২৭ গোল করেন তিনি। তবে টেন হ্যাগের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হওয়ায় ২০২২ সালের নভেম্বরে পিয়ার্স মরগানকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কোচের বিরুদ্ধে ‘বিশ্বাসঘাতকতার’ অভিযোগ তোলেন পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই তারকা। এরপরই দুই পক্ষের সম্পর্কের ইতি ঘটে।
টেন হ্যাগের দাবি, রোনালদোর ফিটনেস নিয়ে প্রচলিত ধারণার সবটুকু সত্য নয়। বয়সের পাশাপাশি কঠোর পরিশ্রমের মানসিকতা হারিয়ে ফেলাও তার পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলেছিল।
ডাচ কোচ বলেন, ‘ব্যথা উপেক্ষা করে নিজেকে নিংড়ে দেওয়া, প্রতিদিন সর্বোচ্চ পরিশ্রম করা এবং ফিট থাকার জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ে অনুশীলন করার মানসিকতা তার আর ছিল না। প্রিমিয়ার লিগ, চ্যাম্পিয়নস লিগ কিংবা পর্তুগাল জাতীয় দলের হয়ে খেলতে হলে ফিট না থাকলে আপনার কোনো সুযোগ নেই।’
রোনালদোর ফিটনেস নিয়ে মানুষের মধ্যে যে ধারণা রয়েছে, সেটিও পুরোপুরি সত্য নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। টেন হ্যাগের ভাষায়, ‘বিষয়টি পুরোপুরি সত্য নয়, তবে মানুষের মধ্যে এমন ধারণাই রয়েছে। আর এভাবেই সে এত ভালো খেলোয়াড় হয়ে উঠেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে আর সেই পরিশ্রমটা করতে পারছিল না।’
রিয়াল মাদ্রিদের উদাহরণ টেনে টেন হ্যাগ বলেন, কোনো খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স কমতে শুরু করলে সঠিক সময়ে তাকে বিদায় জানাতে জানে স্প্যানিশ ক্লাবটি। বাইরের মানুষের কাছে একজন খেলোয়াড়কে সেরা মনে হলেও বাস্তবে তার পারফরম্যান্স যে আগের জায়গায় নেই, সেটি রিয়াল বুঝতে পারে।
নিজের অধীনে রোনালদোকে শুরু থেকেই বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন বলেও জানান টেন হ্যাগ। দায়িত্ব নেওয়ার আগেই পর্তুগিজ তারকার সঙ্গে কথা বলে দলের কৌশল, তার ভূমিকা এবং পারস্পরিক প্রত্যাশা পরিষ্কার করেছিলেন তিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রোনালদো নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেননি বলে মনে করেন এই কোচ।
তিনি বলেন, ‘আমি স্বাভাবিকভাবেই তাকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছিলাম। দায়িত্ব নেওয়ার আগেই তার সঙ্গে কথা বলেছিলাম। আমরা কীভাবে খেলব, সেখানে তার ভূমিকা কী হবে, তার কাছ থেকে আমার প্রত্যাশা কী এবং আমার ও দলের কাছ থেকে সে কী আশা করতে পারে সবকিছুই ব্যাখ্যা করেছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিজের দায়িত্বটাও পালন করতে হয়। আর সে নিজেকে আর সর্বোচ্চ সীমায় নিয়ে যেতে পারছিল না।’
তবে রোনালদোর ব্যক্তিগত অর্জন ও ফুটবলে অবদানকে ছোট করে দেখেননি টেন হ্যাগ। তার মতে, কোনো খেলোয়াড়ই ক্লাব কিংবা দেশের চেয়ে বড় হতে পারেন না। এমনকি রোনালদো বা লিওনেল মেসিও নন।
মেসির উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘কোনো খেলোয়াড়ই ক্লাব বা দেশের চেয়ে বড় নয়। ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোও নয়, লিওনেল মেসিও নয়। শেষ পর্যন্ত দলই সবার আগে। প্রতিটি বড় দলকে তার সেরা খেলোয়াড়কে আপন করে নিতে হবে। কিন্তু সেই সেরা খেলোয়াড়কেও দলের সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে।’
আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির সাফল্যের প্রশংসা করে টেন হ্যাগ আরও বলেন, মেসিকে দলের সবাই সহযোগিতা করলেও তিনিও দলকে অনেক কিছু ফিরিয়ে দিয়েছেন। সাফল্যের জন্য দুই পক্ষের মধ্যে এই সমন্বয় জরুরি।
উল্লেখ্য, ইউনাইটেড ছাড়ার পর রোনালদো সৌদি আরবের ক্লাব আল নাসরে যোগ দেন। অন্যদিকে টেন হ্যাগও পরবর্তী সময়ে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের দায়িত্ব হারান। সম্প্রতি দ্য অ্যাথলেটিককে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও রোনালদোর সঙ্গে তার সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে কথা বলেছেন সাবেক এই ইউনাইটেড কোচ।
আরটিভি/এসকে


